জাফর ইকবালের উপর হামলা - একজনকে হামলা নয়

Sun, Mar 4, 2018 10:16 PM

জাফর ইকবালের উপর হামলা - একজনকে হামলা নয়

খুরশীদ শাম্মী: গত ৩রা মার্চ, ২০১৮, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলা প্রাঙ্গণে একটি অনুষ্ঠান চলাকালীন সময় মঞ্চের পেছন থেকে ফয়জু নামের এক যুবক, ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মুক্তচিন্তক লেখক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এর উপর হামলা করে। ফয়জু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়। তার সত্যিকার পরিচয়, এখনও পরিস্কার নয়। যদিও সে নিজেকে একজন মাদ্রাসার ছাত্র বলে পরিচয় দিয়ে আসছিল সবসময়, কিন্তু এখনও এর সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। তবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ দ্বারা এটা পরিস্কার হয় যে ফয়জু’র বাবা মাদ্রাসার একজন শিক্ষকফয়জুর বাড়িতে তল্লাশি করে পাওয়া গেছে একাধিক ইসলামীক জিহাদি বই, পরিচয় পত্র ও সেলফোন সহ একটি ল্যাপটপ এছাড়াও ফয়জু নিজেই র‍্যাবের কাছে স্বীকার করেছে,- মুহম্মদ জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু, তাই তাকে হত্যা করার জন্য হামলা করেছি। উনি নিজেও নাস্তিক এবং অন্য সবাইকেও নাস্তিক বানানোর জন্য প্রচার করে বেড়াচ্ছে

অথচ, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল কখনোই ধর্মে আঘাত দিয়ে কিছু লিখেন নাই। তিনি সহজ করে বিজ্ঞানকে সবার কাজে কেবল বোধগম্য করে তুলেছেন।

ফয়জুর স্বীকারোক্তি দ্বারা পরিস্কার বোঝা যায়, ফয়জু জিহাদে বিশ্বাসী ইসলামি কোনো দলের একজন সদস্য, কিংবা জিহাদের মূল উদ্দেশ্য দ্বারা প্ররোচিত। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে ফয়জুর মামা, চাচা, বাবা ও মাকে। ফয়জুর মামা তার স্বীকারোক্তিতে বলেছে যে ফয়জুর সেলফোনের দোকান আছে, তাদের আত্মীয়রা থাকে লন্ডনে। হয়তো আরো কিছু তথ্য বেরিয়ে আসবে মামা, চাচা, বাবা ও মার স্বীকারোক্তিতে। তবে আরও একজন হামলাকারী, যে হামলার পরপরই মটর সাইকেল নিয়ে পালিয়ে গেলো, সেটা নিয়ে কিন্তু কেউ কথা বলছে না। এ বিষয়ে সবাই চুপচাপ।   

 

বাংলাদেশে একের পর এক লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও মুক্তচিন্তক ব্যক্তিত্ব মৌলবাদীদের বিষাক্ত ছোবলের শিকার হচ্ছেন ওদের আক্রমণে তাঁরা প্রাণও দিয়েছেনকিন্তু বিচার বিভাগ এখনও ঐ সকল হামলার অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারে নাইসেই সুযোগ ব্যবহার করে অপরাধীরা বারবার একই কাণ্ড করে যাচ্ছে আর আমরা প্রতিবার বিচারের দাবী জানাই নানান ভাবে। কিন্তু প্রশাসন প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে অপরাধের বিচার করে দেখাতে। কারণ প্রশাসনে যারা আছেন, তারাও তো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং ক্ষমতা লোভী, যারা নির্বাচনে বিজয়ী হতে ইসলামী দলগুলোকে ট্রম্পকার্ড হিসেবে হাতে রাখেন

   

তবে এবার যেহেতু হামলাকারী হাতেনাতে ধরা পড়েছে এবং কোনো ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী এখনও নিজেদের থেকে এর দায় স্বীকার করেনি, সেহেতু আমরা ধরে নিতে পারি, এই হামলার পেছনে যারা কালো নকশা এঁকেছে, তা সম্পূর্ণভাবে বেড়িয়ে না আসলেও, বিচার বিভাগ অন্তত একজন হামলাকারীর বিচার করে দেখাবেসেটা হতে পারে, নির্বাচনে জেতার আর একটি রাজনৈতিক চাল।

মুক্তচিন্তকদের উপর হামলা, এবারই তো প্রথম নয়। এখন প্রশ্ন হলো, এই ধরণের হামলা ও মৌলবাদ থেকে দেশকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করতে, আমাদের সরকার ব্যবস্থা নিতে কী প্রস্তুত?

দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারের মন্ত্রী মহোদয়গন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাগণ সর্বদাই বলে থাকেন যে তারা এই ধরণের অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে সর্বদাই সোচ্চার।   

এবার প্রশ্ন আসে, তবে কেন একের পর এক, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে? এবং এর থেকে মুক্তির উপায় কী?

আমাদের সাধারণ চোখে দেখা কয়েকটি কারণ নিন্মে ব্যাখ্যা করা হলোঃ

১) ধর্ম ভীরুতাঃ আমাদের দেশের অধিকাংশ সাধারণ জনগণই ধর্ম ভীরু। তারা প্রতিদিনের কর্ম তালিকায় মন্দির, মসজিদ, গীর্জা, এগুলো রেখেই জীবন সাজায়। তারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাসী। তাই পাপের ভয়ে, মনের মধ্যে জন্ম নেয়া প্রশ্নগুলোকে মাটিচাঁপা দে শুরুতেই। সাধারণ জনগণের এই বিশ্বাসটির সুযোগ নিয়ে এর অপব্যবহার করে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো। তারা মুক্তচিন্তকদের নাস্তিক বলে সমাজে পরিচিত করে এবং পুণ্যের লোভ দেখিয়ে যুবকদের অপকর্ম করতে প্রলোভিত করে খুব সহজে। এই ধর্ম ভীরুতার কারণে প্রশাসনের অনেক উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও তাদের বিচার-বোধ থেকে পালিয়ে বেড়ায়। এছাড়াও, ধর্মের দোহাই দিয়ে মুক্তচিন্তার বই নিষিদ্ধ করা হয়, কিন্তু ইসলামী জেহাদী বইগুলো যে ভয়াবহ সন্ত্রাসের বার্তা বহন করে, সেটা বিচারের আওতায় আনতে দেয়া হয় না। ভালো করে পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত কোনো একজন মুক্তচিন্তক কারো উপর হামলা করে নাই। কিন্তু মৌলবাদীরা সবকিছুতেই অনর্থক কোলাহল সৃষ্টি করে সমাজে এক প্রকার ত্রাস সৃষ্টি করে রাখছে এবং সেগুলোকে কেন্দ্র করে একের পর এক হামলা, হত্যা, চলিয়ে যাচ্ছে। আর সাধারণ জনগণ ধর্মের ভয়ে, পুণ্যের আশায় চুপ করে থাকছে ধীরে ধীরে ধর্ম ভীরুতা আমাদের সমাজের মজ্জায় মিশে গেছে এখান থেকে বের হওয়ার পথ একটাই; আমাদের সদিচ্ছা। অর্থাৎ আমাদের নিজেদেরই বের করতে হবে। এটা হতে পারে, আমাদের দেশের প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থান, পাড়া, মহল্লা এমন কি বাড়িতে মুক্তচিন্তার অনুশীলনের মাধ্যমে। কারো ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাসকে তার সামাজিক পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত না করে।       

 

২) রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতাঃ  নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতা লাভই যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মূল উদ্দেশ্য, তখন ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কিছুটা হলেও লোপ পায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু ধর্ম ভীরু, সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মের নেতিবাচক বিষয়গুলোর প্রতিবাদ করে না, নীতি বিসর্জন দিয়ে হলেও তারা এড়িয়ে যায়। মিথ্যার বিপক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে না পারাটাই বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতা। তবে গর্ব করে বলতে হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু স্বাধীনতার পরই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন জামাতে ইসলাম দলকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের বর্তমান মৌলবাদীরা জামাতে ইসলামী দলের দোসর। শুধু লোক চোখে এরা বিভিন্ন নামে থাকলেও, এরা মূলতঃ জামাতে ইসলামের শাখা প্রশাখা হয়ে ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশে। জিয়াউর রহমান তার শাসন আমলে জামাতী ইসলামের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাদের পূনরায় দল গঠনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন এরপর ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তারা আওয়ামীলীগের সাথে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। যেহেতু বাংলাদেশের দু’টো প্রধান রাজনৈতিক দল, আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি জামাতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পূনরায় আসতে সুযোগ করে দিয়েছিল, সুতরাং এখন দুই দলের কেউই জামাতের অন্যায়গুলোকে আঙ্গুল তুলে দেখাতে পারছে না। জামাতের দোষগুলো যে দলই সাদাকালো করে তুলে ধরবে, জনগণ তখনই প্রশ্ন করবে, এ কথা তাদের বৈধতা দেয়ার আগে মনে ছিলো না?

সুতরাং একদিনে এই সকল অন্যায় দূর করা সম্ভব হবে না। মৌলবাদীদের দ্বারা সৃষ্টি অপরাধ দূর করতে প্রথমেই সকল অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে উল্লেখিত ধর্মনিরপেক্ষতাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এবং এই ধরণের অপরাধগুলো রোধ করতে খুঁজে বেড় করতে হবে অপরাধের উৎস, মদ দাতাদের পরিচয় এবং কীভাবে ও কোন পথে অপরাধটা যাত্রা শুরু করে তা নির্নয় করা     

৩) শুরুতেই অপরাধ রোধের ব্যবস্থা নেয়াঃ  একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাকের উপর হামলার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রের বিভিন্ন সংবাদের লিংকগুলোর নিচে অসংখ্য নেতিবাচক, ঘৃণা জরজরিত, উসকানিমূলক মন্তব্য, যেগুলো দ্বারা স্যারের মৃত্যু কামনা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো হামলার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছেএই সকল মন্তব্য যারা করছে, তারাও কিন্তু অপরাধীদের দলের লোক। ভবিষ্যতে এমন আরও হামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এখনই যদি, ঐ সকল ফেসবুক আইডিগুলোকে সনাক্ত করা হয় এবং  তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যায়, তবে হয়তো ভবিষ্যতে এই ধরণের অপরাধ হ্রাস পাবে। বিষয়টা কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখার অনুরোধ রইল।

 

৪) দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করাঃ  রাজনীতিরও নীতি আছে। কিন্তু কোনো কারণে নীতিটা বিলুপ্ত হয়ে গেলে, তখন সেটা আর রাজনীতি থাকে না; হয়ে যায় ব্যাক্তিস্বার্থের নীতি। এবং সেই নীতিতে কল্যাণকর কিছু হয় না। হয় কেবল মানুষে মানুষে ঝগড়া, মারামারি, কাটাকাটিযা আমাদের দেশে হচ্ছে এখননেতা-নেত্রীদের কলহের প্রভাব এসে পড়ছে জনগণের মধ্যে। তার প্রমাণ, স্বৈরাচারী সরকার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের তার স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছিলেনসেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আজ চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে দেশের মুক্তমনের সন্তানদের বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের একমাত্র দল আওয়ামীলীগ দেশ শাসন করছে; অথচ এখনও প্রশাসন ক্কা-দোক্কা খেলার আঁকা কোর্টের মতো ডান-বাম খেলায় বোকা বানিয়ে রেখেছে আমাদের সাধারণ জনগণকে এই দুঃখ কোথায় রাখি? আমাদের বিশ্বাস স্বাধীনতার পক্ষের দলটি, নিজেদের স্বার্থ ভুলে দেশের সাধারণ ও মুক্তচিন্তার জনগণের কথা ভেবে সঠিক এবং সময়যোগী সিদ্ধান্ত  নেবে।

অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা কিন্তু একজনকে হামলা করা নয়, এই হামলা গোটা মুক্তচিন্তকের উপর হামলাএই হামলা স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের উপর হামলা। এই হামলা মৌলবাদীদের কালো হাতের ক্ষমতা দেখাবার হামলা। আমরা প্রতিবাদ জানাই। আমরা অপরাধীর শাস্তি চাই। অপরাধী যারা-ই হোক, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। অপরাধ নির্মূল করা হোক।                                          

৪ মার্চ, ২০১৮


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান