বীথির কাছে চিঠি-৪৪

Mon, Feb 19, 2018 8:07 PM

বীথির কাছে চিঠি-৪৪

লুনা শিরীন : আফিস  শেষ হয় ৪,৩০ মিনিটে । ঘড়ির কাটা  ধরে আমি পর পর দুইবাস বদলে যখন ইনেদের বাসায় ঢুকি তখন  বিকেল ৫ টা  ৩ মিনিট। গত চার সপ্তাহে এর কোন বদল হয়নি, কোথাও বাস দেরী করেনি ,কোথাও দু-মিনিট লেট হয়নি, বাস যাত্রীরা এক, ড্রাইভার এক, যেন ঘড়ি  ধরে একটা দেশ চলছে । আমি দশ বছর ধরেই ভাবছি,  হয়তো যতদিন থাকবো, ভাবতেই থাকবো কি করে এটা হয় ? আমার ভাবনার  জাল জুড়ে যেহেতু আমার নিজের দেশ আমাকে আছন্ন করে রাখে তাই হয়তো বাকী জীবনে আর কোনদিন এই ভাবনার  প্যাটার্ন থেকে বেড়োতে পারবো না ।

 এই প্রসঙ্গে মনে পরে আমার ইরানী সহকর্মী নিসার এর কথা । কষ্টির কাজের সুত্রেই ওর সাথে পরিচয় , খুব মিশুক মানুষ বলে বন্ধুত্ব হতে  সময় লাগেনি। সেও প্রায় ৬ বছর আগের কথা –আমার বাসায় ওর বান্ধবী নিয়ে বেড়াতে এসছিলো। আমাকে বলে- আমি বুঝিনা  লুনা, তুমি কাজ করছো কানাডায় , থাকছো কানাডায় ,কিন্তু প্রিয় মানুষ খুজছো বাংলাদেশে । আবার বলছো বাংলায় কথা বলতে হবে , কেন ? ইংলিশে কথা বললে প্রেম করা যায় না? তাহলে তুমি অফিস করো কি করে ? অনেক তর্কের পরে আমি নিসার এর কাছে হাতজোড় করে বলি এটা আমার লিমিটেশন প্লীজ আমাকে আর কিছু বলো না ।

 ঠিক তেমনি  বীথি, এই দেশে  যখন চলাফেরা করি, জীবন/যাপন  করি , বছরেরে পর বছর থাকি, আমি কিন্তু  পরিষ্কার জানি এবং মানি যে এটা কানাডা । এই দেশের কোন কিছুর সাথেই  বাংলাদেশের তুলনা চলে না, চলা উচিত না, কখনই চলবে না,  চলতে পারে না , কিন্তু তবুও  আমাকে দ্যাখ, আমার মতো লক্ষ  লক্ষ প্রবাসীকে দ্যাখ , সবাই এক  ধ্যনে জীবন পার করছে---ওই বাংলাদেশ । ওখানেই সব তুলনা, ওখানেই সব ক্ষোভ, ওখানেই সব প্রতারনা ,ওখানেই সব অভিযোগ, ওখানেই শেষ অব্ধি সব ভালোবাসার আঁকর । কি করে পার করবো এই দূরত্ব ?

গতকাল  সোমবার  ভোরে নিজের বাসার সামনে থেকে যে বাস ধরি আমি, সেখানে মীট করি গায়ানীজ মহিলা রোলার সাথে, মধ্য বয়স্ক মহিলা, কিন্তু সেদিন আমার সামনে উচ্ছল বালিকার মতো নেচে উঠলো, বলে আমি ব্যাক হোমে  যাচ্ছি । এই বাসার মালকিন, বন্ধু ইনেদ  যাচ্ছে  ত্রিনিদাদে, ওর ব্যাক হোমে, সামনের  সপ্তাহে , ইনেদ নিজেও  খুশিতে আত্মহারা । অথচ ইনেদ এই দেশে আছে আজ প্রায় ৩৫ বছর , কিন্তু ওই যে শিকড় ফেলে এসছে নিজের দেশে, এর শেষ  কোথায় ? সারাজীবন বাবাকে দেখেছি , কয়েকমাস  পরেই বলতেন ,বাড়ি যাবো, মানে কি ? ঢাকায় বাবা আমাদের নিয়ে যে বাসায় থাকেন সেটা বাড়ি না ? এই পড়ন্ত বিকেলে বসে তোকে লিখতে গিয়ে বার বার চোখ মুছি বীথি, কোথায় আমার বাড়ি ? সেই মাগুরা জেলার বরিশাট গ্রামে, সেখানে আমার চাচা / ফুফুরা থাকেন সেটা আমার বাড়ি ? আমি  যদি কোনদিন সব ফেলে দিয়ে সেখানে চলে যাই, গ্রামের মানুষের সাথে মিশে থাকবো বলে  মনস্থির করি, কেউ কি বাধা দিতে পারবে আমাকে ? ছোটবেলায় আমরা ছিলাম নানা বাড়িতে, আমি জন্ম হবার পরে নাকি  আম্মা নানাকে বলেছিলো –এই পাগোল মেয়ে আপনি মানুষ করবেন। নানা কথা রেখেছিলেন, নানা/নানী দুজনই আমাকে বেশী আদর করতেন , যদি ফিরে যাই সেখানে ? সেই রংপুরের রবার্টসগজ্ঞ এলাকায় ? আমার দুরন্ত  শৈশব  যেখানে ফেলে এসছি , প্রথম আম বাগান, সেই স্কুল মাঠ, মেয়ে হয়ে উঠার দুরন্ত স্বপ্ন যেখানে বপন করা আছে, নানাবাড়ির বিশাল একতালা বাড়িতে যদি ফিরে যাই ? কে বাধা দেবে বীথি আমাকে ? ছোট মামা এখোনো আছেন সেখানে, জানি মামা বুকে করে রাখবেনগ্রামের মানুষের সুখ/দুখের সাথে কাজ করার মানসিক গড়ন সেই ছোটবেলা থেকেই , সেই  শিক্ষার উপরে ভর করেই আজো বেতন পাচ্ছি , ভয় কিসের বল ? জীবনে কি নিয়ে ভয় করবো ? ভয় করবো কিসের জন্য ? ভালোবাসা হারাবার ভয় ছাড়া তো হারাবার আর কিচ্ছু দেখিনা বীথি । দূরত্ব ভীষন কষ্টের, সারাক্ষন ফিরে ফিরে অতীত দেখা ভীষন রকম যন্ত্রনার , কিন্তু বেচে থাকার দায়ে মানুষ বেছে নেয় কত কত পথ ,আমার পথও তেমনি অনেক পথের একটা, সুদুই রাতের অন্ধকারে সৃতি হাতড়ে ফেরা । আদর।

২২ /০৭/২০১৪

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিঠি- ৪৩


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান