কোথাও থামেনি তোমার পথচলা , আনিস ভাই

Tue, Feb 13, 2018 8:42 PM

কোথাও থামেনি তোমার পথচলা , আনিস ভাই

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

 

নীলিমা আখতার বানী: আনিস ভাইয়ের ছিল আবৃত্তির ভরাট গলা, শ্যামলা বরণ ,দীর্ঘদেহী  মুখাবয়বেমিষ্টি কঠোরের অদ্ভুত  একটা মিশেল..।মাইকের সামনে দাঁড়ালে সবাই চুপ হয়ে যেত ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলে আমরা একসাথে কাজ করতাম ।ওনার একটা বড়ভাই বড়ভাই ইমেজ ছিল সবার কাছে।

তখন আবৃত্তির স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে।ভাস্বর বন্দোপাধ্যায় , বিপ্লববালা, নরেন বিশ্বাস, জয়ন্তচট্টোপাধ্যায় , কাজী আরিফ ,প্রজ্ঞা লাবনি...আমরাও সেই স্বর্ণইতিহাসে শামিল হতে চাই।

আমরা মানে আহকামউল্লাহ, মাহি,মেহেদী হাসান ,সাজু শিল্পী আহসান, মেয়ে শিল্পি আরও অনেকে। দিলদরাজ কণ্ঠের আহমেদ ভাই ছিলেন আমাদের কাতারের উপরে।কি তুমুল উৎসব সে।আবৃত্তিরওয়ার্কশপ হচ্ছে।লীডার আনিস ভাই ।আমি তার অধম চামচা ।

ভেতরে ভেতরে  আনিস ভাইয়ের উপরে রাগই  হত একটু একটু।বেশীই নিয়ম পালন করতে বলে শুধু। সবাই হল্লা করে, আনিস ভাইয়ের এক ধমকে সবাই চুপ।আনিস ভাই যেভাবে বলে সেভাবে উচ্চারণ করতে হয়।নিজের ঢংএকটু ও দেখানো সম্ভব হয়না। এর মধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশনে লাকী ভাইয়ের একটা  বৃন্দআবৃত্তির  অনুষ্ঠান ও করেছি  আমরা তারপর সময় যায় , ম হামিদ ভাইয়ের কল্যানে ছোটখাট ২/১টা অনুষ্ঠানে  ৩/৪মিনট অংশ নেয়ার সুযোগ  পেতে থাকি আমরা দুএকজন।

আনিস ভাই আমাকে কিছু  দায়িত্ব দিয়ে দেন।মাতব্বরি করবার কিছু সুযোগ পাই।আবৃত্তিরওয়ার্কশপে আসাদ চৌধুরী থেকে শুরু  করে  আরিফ ভাই, লাবণী আপাকে  বাসা  থেকে  নিয়ে আসা , কাঠদুপুরে রিক্সা করে এখানে সেখানে যেয়ে আবোল তাবোল দরকারি অদরকারি কত কাজ যেআমরা করি ।টিএসসির দোতলার রংচটা কার্পেটে ,তবলারবোলে আমাদের তরুন স্বপ্ন রচনা হতে থাকে। সন্জীব দা (সন্জু দা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মানতে পারিনা।) মাথা নীচু করে হারমোনিয়ামে সুর ভাঁজতে থাকেন ...অামাদের আবৃত্তি আমার কাছে ভীষন নীরস মনে হতে থাকে।আমি সন্জীব'দার সাথে সুর মেলাতে থাকি,,,,এএকোন সুরে গান শোনালে..ভিনদেশী .. অমনি আনিসভাইয়ের ধমক ....এই কি হচ্ছে ? রিহার্সেল বাকী তো !

তো এই হচ্ছে আনিসভাই ।

এর মধ্যে আবৃত্তি জগতে একটা বিপ্লব ঘটে গেল ।মহান পূণের্ন্দুপত্রী মহোদয়ের  আগমন।যেকোন কবিতার অনুষ্ঠানে এরই মধ্যে কথোপকথন একটা কম্পালসারি জায়গা করে নিল।

আমরাও পিছিয়ে রইলামনা ।দেখা গেল একদিন আমিওআনিস ভাইয়ের সাথে দাড়িয়ে পড়েছি ..

কি হচ্ছে কি শুভংকর?...কেন এমন পাগলামি..

বড় ভাইয়ের প্রতি নিদারুন  শ্রদ্ধাবহাল  রেখে ,আর মনে দারুণ দুরুদুর ভয় নিয়ে ঐরকম মহামারী প্রেমের কবিতা কিভাবে  পড়া যায় তা এখন আমার কাছে  বোধগম্য  নয়।

ওটা দু:স্বপ্নই হবে ।কারণ দেখা গেল আমি হাল ছেড়ে  দিয়েছি কিন্তু কবিতা তো , কিছুটা সংক্রামক ব্যাধি ও বটে ।খাতারবুকে আকিবুকি আকতে শুরু করে দিলাম। একটু অপুষ্ট  বীজ তো মাথার  ভেতরে রোপণ করা ছিলই । এবার  ভীষণ গভীর গোপন সংকল্প ...পত্রীর মত লিখবো!

একদিন আমার খাতাটা দেখে ফেললো আনিস ভাই । কিন্তু কি আশ্চর্য আনিস ভাই একটু রাগও হলোনা । বরং খাতাটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে,তার মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।বললেন এদিকে আয়..এই যে তুই লিখেছিস

হৃদয়ের জমিনে , আশেপাশে কোথাও থামেনি তোমার পথচলা,

বাতাসে জলের শব্দ নিয়ে আসছি আমি ,

গভীর সমুদ্র মেঘে ভাসাব তোমায়

 

তোর এই ৪ লাইনের পর যদি লেখা যায় -

 

থাকে পীচ গলানো গনগনে রোদ্দুরের যন্ত্রণায় নিবদ্ধ

বুকের ভেতরের একরোখা স্মৃতি

(সম্পূর্ণ কবিতা দেয়া হলনা সংগত কারণে)।

সবাই হাততালি দিয়ে ফেললো। আরে হবে হবে, দারুণ হবে।

পুর্ণেন্দু তো একা লিখেছে , আপনারা দুইজন লিখেন আনিসভাই।মেয়েটার টা মেয়ে , ছেলেটারটা  ছেলে লিখলে পারফেক্ট হবে।

এখানে মার কোনো মতামত নেয়ার প্রশ্ন নেই। আনিস ভাই বলে কথা ।

 

বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার ।তবু শুরু হলো আমি লিখে আনতাম।উল্টো পিঠে উনি লিখতেন। আমি অধরা, উনি অরণ্য

অধরার অনেক কথাই তার পছন্দ হতো না ।অধরা অরণ্যের সবকথা মেনে নিত।

এর মধ্যে খেয়াল করলাম না কেউ আমরা ,,আনিস ভাই নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিয়েছে। অনুষ্ঠানেও তেমন অংশ নেয়না ।শরীরের অবস্থাও তেমন ভালো না ।

বেশ খানিকটা যখন লেখা হয়েছে। দুজনে ২০+২০ মিলে ৪০ টার মত ছোট ছোট কবিতা

 

অনেকদিন তার কোনো খবর নেই। আবৃত্তির উৎসাহে ভাটা পড়েছে আমারো ।কিন্ত আমি অপেক্ষা করি কোনো একদিন আনিস ভাই আসবে , আমরা আবার শুরু করবো লেখা একদিন আসে আনিস ভাই । কেমন যেন অসুস্থ । কাপড়চোপড় কেমন মলিন।

 

বলে কবিতা গুলো কই রে ? আমি নির্বিবাদে ওনার হাতে তুলে দেই।

 

পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেন অধরা অরণ্য ।

 

উনি বলেন , এগুলা আমি নিয়ে যাই ।পরে যখন  লিখবো  তখন আবার নিয়ে আসবো।

কিন্তু আনিসভাই আমার অংশ ও তো এখানে।আমি সরাসরি লিখেছি , অনেক গুলারই রাফ নাই..

বললাম তো আবার যখন লিখবো , আমি নিয়ে আসবো ।

 

আর কোনদিন আসেননি আনিসভাই। কোনদিন দেখাও হয়নি।শুনেছি তার পড়াশুনাও শেষ হয়নি।একটা হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ঢাকা শহরে কিভাবে খুঁজে বের করতে  হয় ঐ অপরিণত বয়সে আমার  মাথায় আসেনি।আমি শুধু দেখতাম সবাই আনিস  ভাইয়ের  হারিয়ে যাওয়াটাকে  কেমন সুন্দর মেনে নিয়েছে।আনিস ভাইকে ছাড়াই হয়ে যাচ্ছে বড় বড় কবিতার অনুষ্ঠান। আর কখনও শুনতে পাইনি তার  ভরাট কন্ঠস্বর-

" এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। "

 

পুনশ্চ:এই নোট লেখার পর সূবর্ণার কাছে জানতে পারি  আনিস ভাই চলে গেছেন সব চাওয়া পাওয়ার ওপারে। ঈশ্বর তাঁর মঙ্গল করুক।

আরো পড়ুন: স্বপ্নিল দিনগুলি


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান