জগত দেখুক, কে নষ্ট!

Sat, Feb 10, 2018 8:56 AM

জগত দেখুক, কে নষ্ট!

ইমতিয়াজ মাহমুদ: বেগম খালেদা জিয়ার বিচার ও শাস্তি নিয়ে আমি খুব বিস্তারিত খোঁজ খবর রাখি না। ফৌজদারি মামলার বিচার রায় এইসব একটু বিস্তারিত দেখে টেখে কথা বলতে হয়। এমনিতে টেলিভিশনে ও খবরের কাগজে নকশা ও বাক্স করে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নিয়ে যেসব তথ্য দেখা যায় সেগুলি দেখে এইটুকু শুধু বলতে পারি যে ঐ টাকাটা নিয়ে যেসব কাণ্ড হয়েছে সেটা যে কোন বিচারেই অনৈতিক। ফৌজদারি অপরাধ হয় কিনা সেটা আলাদা কথা। কিন্তু ন্যুনতম রাজনৈতিক নৈতিকতা যে এদের নাই সেই ব্যাপারটা তো একদম স্পষ্ট আরকি।

ফৌজদারি বিচারে অপরাধ প্রমাণ করার যে মান, সেটা খুবই কঠিন। অপরাধ প্রমাণ করতে হয় সন্দেহাতীতভাবে। আর বিচার প্রক্রিয়া ও স্বাক্ষ্য প্রমাণ সম্পর্কিত যেসব বিধি বিধান আছে সেগুলি মানতে হয় খুব যথাযথভাবে। সামান্য ব্যাত্যয়ের কারণে প্রকৃত অপরাধী খালাস পেয়ে গেছে এরকম ঘটনা দুনিয়ার সর্বত্রই ঘটে। আমাদের মতো কমন ল শাসিত এডভারসারিয়াল বিচার ব্যাবস্থা যেসব দেশে আছে আছে সেগুলিতে তো এইরকম ঘটনা অহরহই ঘটে।

এটার একটা কারণ হচ্ছে প্রায় সব বিচার ব্যাবস্থাতেই একটা নীতি মানা হয়, যে অনেক অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেলে যাক, কিন্তু একজন নিরপরাধীও যেন সাজা না পায়। এজন্যে তিলেকমাত্র সন্দেহও যদি থাকে অভিযুক্তের অপরাধে সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে তাইলে তাকে আর সাজা দেওয়া যাবে না। এইরকম কোন ফাঁক ফোঁকর গলে বেগম জিয়া যদি ভবিষ্যতে এই সাজা থেকে মুক্তিও পেয়ে যান, আমি অবাক হবো না মোটেই। হতে পারে এরকম। কিন্তু কাজটা যেটা তিনি করেছেন সেটা যে একটা অনৈতিক কাজ হয়েছে সেটা কিন্তু মুছে যাবে না। এই মামলা ও বিচার প্রক্রিয়ায় অন্তত এইটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে বেগম জিয়া একজন ভ্রষ্টাচারী রাজনৈতিক নেতা, এবং দেখা যাচ্ছে এইসব ভ্রষ্টাচার নিয়ে তাঁর কোন লজ্জা শরম নাই।

 

ব্যক্তিগতভাবে বেগম জিয়ার প্রতি আমার তীব্র বিরাগ রয়েছে। সেই বিরাগের সুস্পষ্ট কারণও আছে। সেই কারণটা রাজনৈতিক এবং আদর্শগত। তিনি সাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। তিনি আমাদের বাঙালী পরিচয়টা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না এবং তাঁর কাছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেয়ে ভারত বিরোধিতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলত তিনি জামাতের সাথে আদর্শিক নৈকট্য অনুভব করেন এবং রাজাকারদের সাজা হলে ব্যাথিত হন, বিচলিত হন।এইসব তো জাহেরি কথা আপনারা সকলেই জানেন।

এই বেগম জিয়ার রাজনৈতিক এবং আদর্শগত অবস্থান, এটাকে যে তাঁর কেবল পলিটিক্যাল স্ট্রাটেজির কারণে নেওয়া অবস্থান সেটা কিন্তু না। এইটা হচ্ছে বেগম জিয়ার হৃদয়ের গভীরে একান্ত চেতনাগত অবস্থান। ফলত এইসব রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে ওঁর আবেগ অনুভূতিও একই তারে বাধা। এটার বহিঃপ্রকাশ মাঝে মাঝেই বেগম জিয়ার আচার আচরণে হয়।

এইরকম একটা ঘটনার কথা আপনাদের মনে করিয়ে দিই।

২০১৩ সনের পাঁচ তারিখে গণজাগরণ মঞ্চের সূচনার কথা তো আপনাদের মনে থাকার কথা। সেদিন মঙ্গলবার ছিল। মঙ্গলবার রাত থেকেই মানুষ বাড়ছিল, বুধবার বৃহস্পতিবার সেখানে লোকে লোকারণ্য। শুক্রবারদিন সেখানে প্রথম আনুষ্ঠানিক সভাটা হলো, সেইদিন সারা দুনিয়া চমকে উঠল। কি পরিমাণ মানুষ সেখানে সেই শুক্রবার ছিল আর মানুষের আবেগে সেই সমাবেশটি কিরকম ইলেক্ট্রিফাইড ছিল সেটা সেদিন সেখানে যারা ছিল না ওরা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারবেন না।

 

সেসময় বিএনপির অবস্থানটা ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। আমার মনে আছে মেজর হাফিজের কথা, তিনি প্রেসকে বলছিলেন যে মনের দিক দিয়ে তাঁর ইচ্ছে করছিল শাহবাগে ছুটে যেতে কিন্তু যেহেতু তিনি একটি দল করেন দলের অবস্থানটা ঠিক না হলে তিনি সেখানে যেতে পারছেন না। সেসময় বেগম জিয়া ছিলেন সিঙ্গাপুরে। সিঙ্গাপুর থেকে তিনি ফিরলেন ফেব্রুয়ারির সাতাশ কি আঠাশ তারিখে। এসে মার্চের এক কি দুই তারিখে একটা প্রেস কনফারেন্স করলেন, সেই প্রেস কনফারেন্সে তিনি অবস্থানটা খানিকটা স্পষ্ট করলেন। বুঝা গেল তিনি গণজাগরণ মঞ্চকে পছন্দ করছেন না। সেটাকে কেউ অবাক হয়নি সেদিন।

 

মার্চের পনের তারিখ বেগম জিয়া গেলেন মুন্সিগঞ্জে একটা জনসভা করতে। সেই জনসভায় তিনি দেখালেন গণজাগরণ মঞ্চ সম্পর্কে তাঁর আসল চেহারা। টেলিভিশনে আমি সেই বক্তৃতার ছবি দেখেছিলাম, এখনো মনে আছে তাঁর সেই বীভৎস কদর্য ক্রোধে উম্মত্ত চেহারা। শাহবাগ চত্বরকে 'নাস্তিক চত্বর' বলে তিনি আমাদের সকলের দিকে ছুড়ে দিচ্ছিলেন তীব্র আক্রোশ আর বলছিলেন ওখানে যারা জড়ো হয়েছে ওরা সব 'নষ্ট যুবক'। ওরা সবাই নাকি আওয়ামী লীগ ঘরানার নাস্তিক লোক, শাহবাগে জড়ো হয়ে নাচ গান আর অপকর্ম করছে। আপনারা খুঁজলে এখনো হয়তো সেই বক্তৃতার ভিডিও খুঁজে পাবেন কোথাও না কোথাও। পনেরই মার্চ ২০১৩ শুক্রবার, মুন্সিগঞ্জের একটি সভায় বেগম জিয়ার বক্তৃতা। ভিডিওটা না দেখলে বুঝতে পারবেন না কি পরিমাণ বিদ্বেষ আর ক্রোধ নিয়ে তিনি আক্রমণ করেছিলেন আমাদেরকে।

আজকে আমি এতদিন আগের এই ঘটনার কথা কেন বলছি। বলছি তাঁর কারণ হচ্ছে আজকে যখন বেগম জিয়ার দুর্নীতি ও ভ্রষ্টাচার আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। আজকে তো অন্তত আমি বুক ঠিকে বলতেই পারি, ম্যাডাম, শাহবাগের সেই তরুণরা ব্যক্তিগত জীবনে কে কতোটুকু নষ্ট আর ভ্রষ্ট সে কথা তো জানিনা, কিন্তু আপনি যে ভ্রষ্টাচার করেছেন সে কথা তো প্রমাণিত। ফৌজদারি সাজা উচ্চ আদালতে গিয়ে টিকুক বা না টিকুক, প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা যে আপনি আপনার পুত্রদের হাতে এবং সেখান থেকে আর কার কার হাতে তুলে দিয়েছেন সেটা তো আপনার উকিলেরাও অস্বীকার করছেন না।

জগত দেখুক, কে নষ্ট। সেদিনের শাহবাগের তরুণেরা? নাকি ওদেরকে যিনি নষ্ট বলেছিলেন তিনি?


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান