জয়তু সাংস্কৃতিক দল

Wed, Jan 31, 2018 2:35 AM

জয়তু সাংস্কৃতিক দল

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

 গোলাম হিলালী : সে এক অনিন্দ্য সুন্দর সময়। সালটা সম্ভবতঃ ১৯৮২। সৌন্দর্য সংগ্রামে গড়ে উঠার এক অবিস্মরণীয় সময়। স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের এক নতুন ফ্রন্টের জন্ম হলো। লিয়াকত আলী লাকী কাদের-চুন্নু পরিষদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সারা ক্যাম্পাস জুড়ে  ছোট্ট একটি গানের দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে। ভূপেন হাজারিকার শাশ্বত সংগ্রামের সব গান গেয়ে গেয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন তিনি। অবধারিত এক জয়ে লাকী ভাইয়ের মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে এলো সাংস্কৃতিক সংগ্রামের নতুন ফ্রন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল (ঢাবিসাদ)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টি এস সি)এর দোতালার একটি কক্ষে শুরু হলো এর কার্যক্রম। পরবর্তী অন্তত এক দশক,সম্ভবতঃ এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল বিভিন্ন আঙ্গিকে বাংলাদেশের তৎকালীন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কেবলমাত্র নিরেট আনন্দই দেয়নি,দিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগ্রামে স্বৈরাচার বিরোধী এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। আর এই সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে যাঁদের সম্মিলন হয়েছিল তাঁরা এর ধারাবাহিকতায় ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনেও তার প্রতিফলন দেখিয়েছিলেন।

সাংস্কৃতিক দলে আমার শুরু হয়েছিল লাকী ভাইয়ের মাধ্যমেই। তখন সমাজবিজ্ঞানে পড়ছি। ক্লাসমেট জর্জ অনেক চেষ্টা করেছিল,যাতে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যোগ দেই। সরাসরি রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল না। ক্লাস আর হাকিম ভাইয়ের চায়ের দোকানে বা টিএসিতে আড্ডা দিয়ে  বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটে যাচ্ছিল। জানতে পারলাম সাংস্কৃতিক দলে বিভিন্ন বিভাগে কর্মী নেয়া হবে। আমরা দুই বন্ধু, হারুন আর আমি কবিতার আবৃত্তির দলে আবেদন করলাম। সাক্ষাতকারের বিশদ এখন আর মনে নেই,হারুন আর আমি দু’জনের কারোই নাম এলো না তালিকায়। মনটা খারাপ হলো। কিন্তু কি আর করবো। তবে হারুন বিষয়টাকে অত সহজভাবে ছেড়ে দিতে রাজি হলো না। বললো,চল জানতে হবে কি কারণে আমাদের নেয়া হলো না। আমাদের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন যিনি তাকে পাওয়া গেল টিএসসি'র  সামনেই। জিজ্ঞেস করলে উনি বললেন,আমাদের উচ্চারণে সমস্যা আছে সেজন্য আমরা নির্বাচিত হইনি। হারুন বললো,আমার বাড়িতো যশোরের ঝিনাইদহে, উচ্চারণ কি করে আমাদের সমস্যা হবে। তখন উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমার বাড়ি কোথায়। সব সময় নির্দ্বিধায় যেভাবে বলি সেভাবেই বললাম নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর (যদিও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়টা ছাড়া আর কখনো লক্ষ্মীপুরের গ্রামের বাড়ীতে কখনো এক নাগাড়ে থাকা হয়নি)। উনি অনেকটা আমতা আমতা করে বললেন আমরা যারা দক্ষিণবঙ্গের, খুলনা যশোর কুষ্টিয়ার তাদের উচ্চারণে অবশ্য সমস্যা নেই (যতদূর মনে পড়ে ওঁর বাড়ি ছিল খুলনায়)। প্রকারান্তে হয়তো উনি এটাই বলতে চেয়েছিলেন যে,নোয়াখালীর মানুষেরা কিভাবে কবিতা আবৃত্তি করবে। এই মানুষটি ছিলেন এনএসডি ফেরত এবং পরবর্তীতে জাতীয় সম্প্রচার কর্তৃপক্ষে  যোগ দেয়া ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে প্রায়ই দেখা হতো, কিন্তু এই প্রসঙ্গ আর কোন দিন আসেনি।

সে যাই হোক,বাদ পড়ে মনটা খারাপ হলো। কিন্তু ক’দিন পরেই লাকী ভাইয়ের কাছ থেকে ডাক পেলাম। সেই সময়টাতে আমি একটু আধটু ছবি তুলছি। বেগার্ট ইনষ্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি থেকে বেসিক ফটোগ্রাফি করে ছবি তোলা শুরু করেছি। লেখক সাহিত্যিকদের লেখা ও ছবি সংগ্রহ করছি একটি প্রদর্শনী করবো বলে। (প্রদর্শনীটা ১৯৮৮-তে বাংলা একাডেমীর বই মেলায় হয়েছিল।) লাকী ভাই বললেন, তুমি ছবি তুলবে আর কবিতার গ্রুপে কাজ করবে। হাতে যেন আকাশের চাঁদ পেলাম। এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের একজন হয়ে গেলাম।

দূরদৃষ্টি নিয়ে লাকী ভাই আয়োজন করলেন কবিতা আবৃত্তির প্রথম কোর্স। ৭ দিন ব্যাপী এই কোর্স ছিল আমাদের জন্য এক আশীর্বাদ। অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস,মুজিবুর রহমান খাঁ,বিল্পব বালাসহ আরো কয়েকজন আমাদের উচ্চারণ আবৃত্তি নিয়ে যে একাডেমিক ও এ্যাপ্লাইড ধারণা দিয়েছেন তা আজও আমার সম্পদ হয়ে আছে। এ কোর্স পরবর্তীকালে আমাদের কবিতার বিভিন্ন প্রযোজনায় অভূতপূর্ব সাহায্য করেছিলো।

লাকী ভাইয়ের নির্দেশনায় কবিতার গ্রুপে আমাদের প্রথম প্রযোজনা ছিলো ‘বিস্ফোরণের বৃন্দগান’। প্রাচীন বাংলার সেই ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বা পাখি সব করে রব থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের সংগ্রামের কবিতার এক অনবদ্য গাঁথুনি দিয়ে কবিতার জপমন্ত্র  সাজিয়েছিলেন লাকী ভাই। সেই জপমন্ত্র  ‘বিস্ফোরণের বৃন্দগান’ই ছিল বাংলাদেশের আবৃত্তির ইতিহাসে বৃন্দ আবৃত্তির সূচনা। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এর উদাহরণ তখন আর ছিল না। পরবর্তীতে এলো বৃন্দ কবিতা আবৃত্তির দল স্বরিত,কন্ঠশীলন ইত্যাদি।

‘বিস্ফোরণের বৃন্দগান’ দিয়ে আমাদের যে কবিতার গ্রুপ তৈরি হলো তাতে ছিলো অসম্ভব সুন্দর সুন্দর থোকা থোকা কয়েকটি নাম। ডালিয়া আপা (ডালিয়া আহমেদ),গীতি আপা (গীতি আরা নাসরীন),নাসিম ভাই (নাসিম আহমেদ),আহমেদ হোসেন,আনিস, সাইফুল, নয়ন (জুবায়ের অহমেদ)।  শুরুর কিছুকাল পরে এসে যোগ দিয়েছিল ইস্তেকবাল, জেসমিন,সালমা আপা সহ আরো কয়েকজন। রিহার্সেল আর শো করতে করতে আমরা সবাই যেন সবার আত্মীয় হয়ে উঠলাম। দলের বড় বোনেরা, বড় ভাইয়েরা অনন্ত আদরে ছাপিয়ে দিয়েছেন। সমবয়সী বা ছোটরাও এক আত্মিক বন্ধুতে আপনার করে নিয়েছিল। ‘বিস্ফোরণের বৃন্দগান’ নিয়ে আমরা টিএসসি,বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করেছি। এর মধ্যেই লাকী ভাই আরও একটি বিপ্লবী ধারণা নিয়ে এলেন। বললেন গাইড হাউজ মিলনায়তনে দর্শনীর বিনিময়ে বৃন্দ আবৃত্তির অনুষ্ঠান হবে। হলোও তাই। আমারতো মনে হয় এটাই বাংলাদেশে প্রথম যেখানে দর্শনীর বিনিময়ে দর্শক স্রোতরা কবিতা শুনেছে।

সাংস্কৃতিক দলের অনন্য সাধারণ প্রযোজনা "সোনাই মাধব"। ময়মনসিংহ গীতিকার এক অপূর্ব কাহিনী নিয়ে যে অভূতপূর্ব প্রযোজনা, তা অন্তত সেই সময়ে আর দেখা যায়নি। এ্যানি আপা আর সোহেলের নাচ,মুনির ভাইয়ের ঘটকের চমৎকারিত্ব, আর বেলীর গান প্রতিটি দর্শক শ্রোতার কাছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হয়েছে। যেগুলোতে আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল না। সেখানে ছবি তোলাই ছিল আমার কাজ। আট কি দশ টাকার রিফিলে ছবি তুলে নিউমার্কেটের "আকস্ ফটোগ্রাফার্স" থেকে ৬ টাকায় ডেভেলপ করিয়ে তিন টাকা করে একেকটি ছবি প্রিন্ট করে এনে টিএসসির বোর্ডে স্বল্পতম সময়ে দর্শকদের জন্যে লাগিয়ে দেয়া লাকী ভাইয়ের এক ধরণের কমিটমেন্ট ছিল। যারা অনুষ্ঠান দেখেনি তারা যেন বুঝতে পারে কি মিস করেছে। পরে যখন শিবুদা (শিবনাথ চক্রবর্তী) অনেক দামী ক্যামেরা নিয়ে দলে যোগ দিলেন আমি ছবি তোলার দায়িত্ব থেকে অনেকটাই রেহাই পেয়ে গেলাম। 

ব্যতিক্রমী চিন্তা করা লাকী ভাইয়ের চরিত্রের একটি দিক। সাংস্কৃতিক দলে প্রযোজনার ক্ষেত্রে এই ব্যতিক্রমকে প্রকাশ করবার  দিকে সব সময়ই তার আগ্রহ ছিল। "অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ" পথ নাটকটি যখন শোষণ ও সংগ্রামের অনুভব পথে পথে ছড়িয়ে দিচ্ছে, সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের "চন্ডালিকা"-কে মঞ্চে নিয়ে এলেন কাব্য-নাটকের ফর্মে। শুরু হয়ে গেল "চণ্ডালিকা"র রির্হাসেল। এ্যানি আপা, সোহেল, অনুপসহ সবার নৃত্যের মহড়া চললো আমাদের কবিতার সাথে। ডালিয়া আপার জন্য মুশকিল হতো,কারণ ওঁ আবৃত্তি যেমন পছন্দ করতেন, তেমনি নাচ ও ছিলো তার অতি পছন্দের বিষয়। এ্যানি আপার সাথে নাচতে ডালিয়া আপা খুবই পছন্দ করতেন। "চন্ডালিকা" ডালিয়া আপার জন্য মুশকিল এনে দিলো। শেষ পর্যন্ত আমাদেরই জয় হলো। ডালিয়া আপাকে আমরা পেয়ে গেলাম আবৃত্তির গ্রুপে। "চণ্ডালিকা"র আমরা অনেকগুলো প্রদর্শনী করেছি টিএসসিতে,এমনকি দর্শনীর বিনিময়ে বেইলী রোডের গাইড হাউজ মঞ্চে । সম্ভবতঃ দুটি প্রদর্শনী হয়েছিল গাইড হাউজ মঞ্চে । দই ওয়ালা হয়ে "দই চাইগো,দই চা-ই-ই . . ." লাইনগুলো আজো আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্বের একটা চমৎকার দিক ছিলো দায়িত্ব বন্টন। দপ্তরের কাজ দেয়া ছিলো সদা হাস্যময় ম.আব্দুর রহিম-কে। চমৎকার শৈল্পিক হাতের লেখায় দলের সমস্ত নোটিশ ও অন্যান্য দাপ্তরিক কাগজপত্রের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন। প্রযোজনার ক্ষেত্রে লাকী ভাই একজনকে একেকটা দলের দায়িত্ব দিয়ে ছিলেন। দল তখন অনেক পরিণত। লাকী ভাইও সম্ভবতঃ চাইছিলেন বাকীদের মধ্যেও নেতৃত্ব ও প্রযোজনার কৌশল যোগ্যতা তৈরি হোক। নাটকের দায়িত্ব দিলেন ইমামুল হক কিসলু -কে,গানের অংশটি সম্ভবত নিজের কাঁধেই রাখলেন লাকী ভাই। নাচের দায়িত্ব দিলেন এ্যানি আপাকে। কবিতার গ্রুপে আমরা একটি প্রযোজনার কাজ শুরু করলাম। আহমেদ,নয়ন জেসমিন,সাইফুলসহ আমরা সবাই মিলে ব্রেইন স্ট্রমিং আর রিহার্সেল করে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এরশাদ ভ্যাকেশনে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের এ উদ্যোগ অবশ্য আর আলোর মুখ দেখেনি। তবে আমাদের বন্ধুত্ব যেন আরো গাঢ় হয়েছিল এর মধ্য দিয়ে। 

জীবনের চলবার পথে কিছু কিছু মানুষের কিছু কিছু কথা চিরকাল মনে থেকে যায়। এরকমই একজন মানুষ ছিলেন সালমা আপা। সাংস্কৃতিক দল তখন ঊর্ধ্ব গগনে। অনেক নতুন কর্মীর সাথে সালমা আপা এলেন দলে-কবিতার গ্রুপে । সার্বক্ষণিক বিষণ্ণ থাকা এই মানুষটির সাথে আলাপে আলাপে কাছে চলে আসি। ছোট ভাইয়ের মতো আদর করতেন আমাকে। একদিন টিএসসিতে আমাকে বললেন,হিলালী তুমি যখন শেভ কর রেজার দিয়ে জুলফির নীচের জায়গাটা কামিওনা। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেন সালমা আপা। বললেন, এই জায়গায় ব্লেড দিয়ে বেশী দাড়ি কামালে তাড়াড়াড়ি চুল সাদা হয়ে যায়,বুড়িয়ে যায় মানুষ। সেজন্যেই মনে হয় আমার চুল সাদা হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। সেই সাংস্কৃতিক দল ছাড়বার পর আর সালমা আপার সাথে দেখা হয়নি। কিন্তু তার সেই কথা আজো ভুলিনি। 

সাংস্কৃতিক দলে আমরা অনেকেই ছিলাম। বয়স আর স্মৃতির বিড়ম্বনায় সবার নাম আজ আর মনে নেই। কিন্তু বেশ ক'জন মানুষের জীবনের সুতোর সঙ্গে বেধে গিয়েছেন। এ যেন আমৃত্যু সম্পর্ক, নিপাট, নির্জলা,অনিন্দ সুন্দর এক সম্পর্ক। এদের সবার সাথেই যেন পরম আত্মীয়ের সম্পর্ক  আজও অম্লান। ডালিয়া আপা শুধু নিজের সাথে নন পরিবারের সাথেও মিশিয়ে দিয়েছেন আমাকে। পেয়েছি সব ভাই-ভাবীদের ভালোবাসা। একই ভাবে গীতি আপা, এ্যানী আপা, নাসিম ভাই, আহমেদ, কিসলু, সাইফুল, নয়ন এরা যেন এক একটি জলন্ত থোকা থোকা নাম আমার জীবনে। শান্তুনু দা, শ্যামল, অরিজি্ত,অভিজিত,সামলু,সুনীতা এঁরা সবাই আজও আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। 

সাংস্কৃতিক দল আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সবকিছু শেখায়নি। কিন্তু যুঁথবদ্ধভাবে কিভাবে কাজ করতে হয়,আর একাজ করে কিভাবে আনন্দ আর জীবনের সম্পদ তৈরি করতে হয় তার বোধ ঢুকিয়ে দিয়েছে আমাদের সবার মধ্যে। আমার বিশ্বাস কর্মজীবনে এই অর্জনগুলোকে সবাই কাজে লাগিয়েছে। আমার নিজের জীবনের একটি উদাহরণ দেই। 

সাভারের লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চার মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। প্রশিক্ষণ চলাকালীন প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতিমাসে একটি করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রযোজনা করতে হতো। একটি অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো আমাকে। তবে চ্যালেঞ্জ ছিল পাহাড়ের মত। প্রায় দেড়শ'র ও বেশী প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে মাত্র চারজন ছিলেন মহিলা, আর গান করতেন মাত্র দু'জন। অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করবার মতো ছিলেন তিন চার জন। সাংস্কৃতিক দলের পাওয়া প্রযোজনা কৌশল প্রয়োগ করে নির্বাচিত কর্মকর্তাদেরকে হাফ সার্কেলে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যান্যদের গানে কবিতায় মিশিয়ে অনুষ্ঠান করে ফেললাম। চার মাস পরে দেখা গেল ঐ কোর্সের এটাই ছিলো সেরা প্রযোজনা। সাংস্কৃতিক দলের তথা লাকী ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ স্কিল দিয়েই এটা করা সম্ভব হয়েছিল।

অনুষ্ঠানের সময় ছাড়াও সাংস্কৃতিক দলের অফিস ছিল আমাদের প্রাণের জায়গা সারাক্ষণই গান হচ্ছে, সেখানে হয় নারায়ণ'দা অথবা সুজিত নতুবা সামলু। বেলী,শিমু কাবেরী আচার্য আরো কত কত নাম। স্মৃতি থেকে একটি কথা না বললেই নয়। "সোনাই মাধবের" সম্ভবতঃ প্রথম দুটি শোতে বেলী গেয়েছিল সোনাইয়ের গান। আমার কাছে মনে হয়েছিল বেলীর জন্যেই যেন সোনাইয়ের গানগুলি ময়মনসিংহ গীতিকায় সুর করা হয়েছিল। ওর গলায় আমি সেই মাটির সুর খুঁজে পেয়েছিলাম। পরবর্তীতে চমৎকার এই মানুষটিতে আর দেখিনি। শুনেছি  মাগুরায় কলেজে শিক্ষকতা করে। কোনদিন সুযোগ হলে এই গুণমুগ্ধতা প্রকাশ করবো ওঁর কাছে।

সাংস্কৃতিক দলের স্মৃতি আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচে উল্লেখযোগ্য অংশ। এ থেকে পাওয়া সবকিছুই আমি নিয়ে চলেছি আজীবন। বন্ধুত্ব,সুখস্মৃতি, দলে একসাথে কাজ করা এ সবকিছুই যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। সেই সময়ে অনেকের কথা হয়তো লিখবার সময় স্মৃতি থেকে আসেনি, কিন্তু সাংস্কৃতিক দলের কেউই আমার কাছে কম গুরুত্বের নয়। লাকী ভাই যদি সেদিন দলে না নিতেন তবে হয়তো জীবনের সেই অংশটি অপূর্ণই থেকে যেতো। জয়তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।  


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান