যুদ্ধ, বাবা এবং শৈশব-২

Wed, Dec 27, 2017 4:49 PM

যুদ্ধ, বাবা এবং শৈশব-২

মিতা হোসেন :ছোটবেলা থেকেই আমার ছিল গান শোনার প্রচন্ড নেশা। যে কোন গান আমি অধীর আগ্রহে শুনতাম। আমার নানা প্রতিদিন সন্ধ্যায় রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার ধরতেন। আমি বসে বসে গানগুলো শুনতাম। তখনই পরিচিত হয়েছিলাম জাগরণের সব অমর গানগুলোর সাথে। ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ এই গানগুলো উল্লেখযোগ্য।  আরো একটি অনুষ্ঠান তিনি রেডিওতে শুনতেন, তা হলো ‘দুর্বার’, সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান। নানা এবং বাড়ীর অন্যরা আরো একটি অনুষ্ঠান শুনতেন, তা হলো আকাশবাণী।  এইসকল অনুষ্ঠানগুলো আমার গানের রুচিকে অনেক সমৃদ্ধ করেছিল পরবর্তিতে। ঐ সময়ের এইসব স্মৃতি আমার জীবনে একটি বিরাট অংশ জুড়ে আছে। পরে অনেক বড় হয়েও রেডিওতে আমি এই অনুষ্ঠানগুলো নিয়মিত শোনার চেষ্টা করতাম। এই সন্ধ্যাবেলাতে আমার মায়ের ছোট মামা মানে টিঙ্কুর বাবা প্রায়ই আসতেন। তিনিও এখন নিউ ইয়র্কে থাকেন। তিনি এলে আমার নানার সাথে দেশের গল্প করতেন। নানার বিছানায় বসে গান শুনতে শুনতে টুকরো টুকরো দেশের অবস্থাও তখন আমার জানা হয়ে যেত। তখনি জেনেছিলাম ঢাকায় নাকি বুদ্ধিজীবিদের ধরে ধরে নিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। রাস্তায় রাস্তায় নাকি মানুষের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ঢাকায় জীবন অচল। এইসব গল্প শুনে আমার বুকে হাতুড়ির বাড়ি পড়ত। আর গান শুনতে ইচ্ছা হতো না। মন ছুটে যেত বাবার কাছে। শুধু বাবার কথা ভাবতাম। আমার বাবা কেমন আছেন? ইচ্ছে হতো এক দৌড়ে বাবার কাছে চলে যাই। রাতে যখন ঘুমাতে যেতাম, ঐ সময়টা ছিল আমার জন্য সব চাইতে কষ্টের!

 প্রতিদিন আমি আমার বাবার জন্য কাঁদতাম। দুহাত তুলে আল্লাহ’র কাছে দোয়া করতাম, ‘আল্লাহ, আমার আব্বুকে ভাল রেখেন। তাঁর যেন কোন বিপদ না হয়’! প্রতিদিন এভাবে বাবার জন্য দোয়া চেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমাতাম। আমার যুদ্ধ ছিল ওটাই। বাবার জন্য দোয়া চেয়ে যুদ্ধ। একদিন মা শুনে ফেললেন আমার কান্নার শব্দ, জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে। আমি বলেছিলাম, ‘কিছু না’। বড় হয়ে যখনি ব্যাপারটা মনে পড়তো, আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবতাম, তখন ঐটুকু বয়েসে কেমন চেপে গিয়েছিলাম, মাকে বলতে চাইনি আমি কাঁদছি। যদি মার কষ্ট বেড়ে যায়, এই চিন্তা করে। বাবা আমাদের নানা বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আবার ঢাকা ফিরে গিয়েছিলেন। দেশে স্কুল কলেজসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল খোলা, তাই  তাঁর উপায় ছিল না, কাজ রেখে আমাদের সাথে ভোলায় থাকা। তিনি ঢাকার বাসায় একা থাকতেন, চিন্তায় ঐটুকু আমার ঘুম হতোনা। এখন ভাবি, আমার মায়েরও নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট গেছে বাবাকে ছাড়া ওভাবে থাকতে। কিন্তু কেমন শক্তভাবে তিনি তিনটি ছোট ছোট শিশুকে নিয়ে দিনগুলো পার করেছেন। কত কিছুই তো হয়ে যেতে পারত! আল্লাহ আমাদের কৃপা করেছিলেন। আমার যুদ্ধ যেমন ছিল বাবার জন্য, তেমনি আমার মায়েরও যুদ্ধ ছিল তাঁর তিনটি সন্তানকে আগলে রাখা। তাদের যেন কোন কষ্ট ছুঁতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা। আমি জানি এরকম যুদ্ধ বাংলাদেশের হাজারো মায়ের করতে হয়েছে। তাঁরা হয়তো অস্ত্র হাতে মাঠে নামেননি, তবে এভাবেই তাঁদের মত করে তাঁরা তাদের যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যেমন তাঁর প্রাণের চাইতে প্রিয় সন্তান রুমীকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিয়েছিলেন, সেটাও তাঁর জন্য ছিল এক যুদ্ধ।

এভাবেই কাটছিল আমাদের জীবন নানা বাড়ীতে। হঠাত একদিন খবর এল ভোলায় মিলিটারি এসেছে। সবার মুখে বিপদের কালো ছায়া দেখতে পেলাম। শুনলাম আমার দুই মামাই মুক্তিযুদ্ধে গেছিলেন, তাই নানা বাড়ী পাকিস্তানী সেনাদের নজরে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে প্রবল। নানা বাড়ীতে তখন আমরা অনেকে ছিলাম। নানা আমাদের দুভাগে ভাগ করে দু জায়গায় পাঠিয়ে দিলেন। আমরা তিন ভাই-বোন, মা আর ছোট খালা চলে গেলাম গ্রামের দিকে মায়ের এক সম্পর্কিত বোনের বাড়ীতে, আর বাকিরা চলে গেল আরেক জায়গায়।

মায়ের সেই বোনের বাড়ীতে যেয়ে শুরু হলো আরেক জীবন। ওখানে যেয়ে দেখি   আগে থেকেই মায়ের আরো কিছু আত্মিয়স্বজন তাঁদের পরিবার নিয়ে ওখানে রয়েছেন। আরো বন্ধু বাড়লো। এই বাড়ীতে আমার মায়ের এক মামাত ভাইয়ের পরিবারও এসেছিলেন ঢাকা থেকে। সেই মামার এক মেয়ে বুলবুলির সাথে আমার ভাব হলো বেশ। বুলবুলিও আমার এক ক্লাশ উপরে পড়তো, কিন্তু বন্ধুত্বে তা কোন বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো না। টিঙ্কুর অভাব বুলবুলিকে দিয়ে কিছুটা পুরণ হয়েছিল। হায়রে আমাদের বন্ধুত্ব! ছায়ার মত থাকতাম দুজনে। এখানে আর প্রাইভেট টিউটর এর কাছে পড়তে হলো না। বরং মনে হলো স্বাধীনতা যেন একটু বেড়ে গেল। দলবল নিয়ে মাঠে, জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। ঘন বনের মত বাগানে যেয়ে কাঠবাদাম খুঁজে বের করতাম। ওগুলো গাছ থেকে নীচে পড়ে থাকত, আর আমরা তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম। কোন গাছে কি ফল রয়েছে, এবং তা খাওয়ার উপযুক্ত হয়েছে কিনা, দলবল নিয়ে এসব অনুসন্ধান করে বেড়াতাম। আমার সমবয়সী সবাই সাঁতার জানে, কিন্তু আমি জানতাম না। বিষয়টি আমার জন্য খুবই লজ্জার ছিল। সবাই মিলে ঠিক করলো আমাকে সাঁতার শেখানো হবে।

কলা গাছ কাটা হলো আমার জন্য। কলা গাছের গুড়িটা দিয়ে সাঁতারে হাতে খড়ি দেয়া হলো। কিন্তু এই পদ্ধতি ব্যর্থ হলো, কিছুতেই পারলাম না। মাঝখান থেকে আমার প্রিয় একটি জামা কলাগাছের কষের দাগ লেগে নষ্ট হয়ে গেল। হায়রে আমার কান্না! কারণ, ঐ জামাটি আমার মেজ খালু করাচী থেকে এনে দিয়েছিলেন এবং সবাই বলতো জামাটিতে আমাকে বেশ মানায়। পরে যখন ঢাকা ফিরে এসেছিলাম, আমার বাবা নিজে কাপড় কিনে ঠিক ঐরকম একটি জামা বানিয়ে দিয়েছিলেন নিজের হাতে। আমার মা যেমন ভাল সেলাই জানতেন, তেমনি বাবাও খুব ভাল সেলাই জানতেন। তাঁদের এইসব প্রতিভার কথা আমার অন্যান্য লেখায় বিস্তারিত লিখেছি।

যাই হোক, এর পরের অধ্যায় শুরু হলো ডাবের খোলা দিয়ে আমাকে সাঁতার শেখানো এবং সবশেষে পোকাওয়ালা আমও খাওয়ালেন আমার ছোট খালা। পোকরা আম, বা পোকাওয়ালা আম খেলে নাকি সাঁতার শেখা যায়, জানিনা এটা কোথা থেকে এসেছিল। আমাকে সেই আমও কেটে খাওয়ানো হলো। কিন্তু বিধি বাম! সাঁতার আর শেখা হলো না, এই কাজটি অদ্যাবধি আমি পারিনি।

এই বাড়ীতে থাকা অবস্থাতে একদিন দেখলাম মায়ের সেই বোনের এক ছেলে এলেন। আমরা এসে তাঁকে দেখিনি। হাসিখুশী একজন মানুষ! কদিন থেকে চলে গেলেন আবার। চলে যাবার দিন যখন তাঁর কাছে স্টেনগান আর গুলির চেইন দেখলাম, নিমিষে তারঁ সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে গিয়েছিল। হাসিখুশী নরম মানুষ থেকে তিনি চোখের সামনে একজন বিস্ময়কর মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি চলে গেলেন। তখন জানতে পেলাম, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। কদিনের জন্য বাড়ীতে এসেছিলেন, আবার চলে গেলেন। আরো জানতে পেলাম, যে যুদ্ধটি হচ্ছে পাকিস্তানের সাথে আমাদের, আমাদের এই ভাইটা সেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বন্দুক হাতে নিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। বাড়ীতে কদিন ধরে শুধু এই আলোচনা চলতে লাগল, এই ভাই এবং তার কিছু বন্ধু-বান্ধব যুদ্ধে যোগদান করেছেন। তারা যেন দেশ স্বাধীন করে যার যার বাড়ী ফিরে আসতে পারেন, বড়রা সে দোয়া করতে লাগলেন।

আমাদের দিনকাল আবার আগের মত কাটতে লাগলো। বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম আগের মত। তবে দুপুরবেলা মা পাড়া বেড়াতে দিতে চাইতেন না। ঐ সময়েই জেনেছিলাম, দুপুরে বনে-বাদারে ঘুরে বেড়াতে হয়না। বিশেষ করে ধান ক্ষেতে যেতে নেই, তাল গাছের নীচে যেতে নেই, তেঁতুল গাছের কাছে যেতে নেই, কারণ তাহলে ভূতে ধরে! এখনকার বাচ্চাদের এসব বলে আর ভয় দেখানো যায়না। এরা অনেক ধরণের প্রশ্ন করে। সত্যতা যাচাই করতে চায়। কিন্তু যখন আমরা বড় হচ্ছিলাম, তখন মুরুব্বীরা কোন কথা বললে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়, এই ধারণাই আমাদের ছিল না। মা/বাবা কিংবা বড় কেউ কোন কথা বলেছেন, বেদবাক্য হিসেবে সেটাই মেনে নিতাম। তাই যখন শুনলাম দুপুর বেলাটায় ‘তেনারা’ এসব জায়গায় বিশ্রাম নিতে আসেন, তখন গা ছমছম করা এক ভয় সত্যিই পেয়ে বসেছিল। যদিও ভূতের গল্প পড়েছিলাম আগেই, কিন্তু ওখানেই এভাবে ভূত নামক একটি ছায়ার সাথে আনুষ্ঠানিক পরিচয় হলো আমার। অবশ্য সে ছায়ার সাথে চাক্ষুস দেখা এখনো হয়নি। লজ্জার বিষয়, এই ভয়টা আমার এখনো আছে।

একদিন ওখান থেকেও পাততাড়ি গোটাতে হলো। শোনা গেল ঐ গ্রামে মিলিটারি এসেছে। আমরা সবাই মিলে চলে গেলাম এই খালার, মানে যাদের বাড়ীতে এতদিন ছিলাম, তার শ্বশুর কূলের এক আত্মিয়ের বাড়ী, অন্য একটি গ্রামে। এবার আমাদের সঙ্গীসাথী আরো বেড়ে গেল। মায়ের আরো কিছু আত্মিয়-স্বজনও যোগ দিলেন আমাদের সাথে।

আরো পড়ুন: যুদ্ধ, বাবা এবং শৈশব-


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান