আমার কমিউনিটি, কমিউনিটি আমার

Mon, Dec 25, 2017 12:45 AM

আমার কমিউনিটি, কমিউনিটি আমার

নুরুজ্জামান বিশ্বাস: কানাডাতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের বেশীর ভাগই উচ্চ শিক্ষিত। প্রবাসীদের কেউ কেউ বাবা-মাসহ কিছু আত্মীয় স্বজন নিয়ে থাকলেও, কানাডাতে আমরা বেশীর ভাগই প্রথম প্রজন্ম। অর্থাৎ, স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানাদি নিয়ে বসবাস। দেশে থাকতে হয়ত কারও সাথে তেমন কোন পরিচয় ছিল না। শুধু মাত্র ভাষার মিল থাকার কারনে প্রবাসে আমরা একজন আর একজনের সাথে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। এ যেন আত্মার আত্মীয়। চির চেনা, কত আপন! প্রত্যেকে তৈরি করেছি এক একটা নির্দিষ্ট বলয় বা সার্কেল। সদ্য জন্ম নেয়া একটা শিশু যেমন হামাগড়ি দিয়ে ও আদো আদো কথা দিয়ে ঘুমন্ত স্বজনদের কে তার আগমনীর বার্তার জানান দেয়, প্রবাসে আমরাও তেমনি ধীরে ধীরে আমাদের আগমনির বার্তার জানান দিচ্ছি। প্রথম প্রজন্ম হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই কম-বেশী নিজের ক্যারিয়ার বা প্রতিষ্ঠার পিছনে ছুটছি এবং এর ফলে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথা বেমালুম ভুলেই গেছি। প্রবাসে আমরা এখন ও আমাদের দেশীয় কালচারে অভ্যস্থ। মালটি কালচারাল কানাডার অনেক কালচারে আমরা এখন ও অভ্যস্থ নয়। এ যেন 'না পেলাম কাছে যাবার অধিকার, না পেলাম দূরে থাকার অনুমতি'।

নিজেদের আত্মার খোরাক মিটানোর জন্য আমরা বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশ থেকে নামি দামী শিল্পি এনে কালচারাল অনুষ্ঠান করছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এতে কতটা উপকৃত হচ্ছে তা জানা দরকার।

কয়েক বছর আগে, দেশ থেকে পরিচিত এক জনের ফোনে জানতে পারি তার মেয়ে-স্বামী, সন্তানসহ কানাডা এসেছে। মেয়ে কানাডা থাকতে চায় না। আমি যেন কারণটা উৎঘাটন করে তাদের জানাই। ফোন করে জানতে পারলাম তারা আমার আশে পাশে ই থাকে। এক বিকেলে তার সাথে দেখা করলে, মেয়েটা আমাকে দেখে কান্নায় ভেংগে পড়ল। সংক্ষেপে তার সাথে কথোপকথনের সারাংশ হচ্ছেঃ সে দেশে থাকতে হলিউডের মুভি দেখে, কানাডাতে প্রবাসী হবার স্বপ্নের জাল বুনিয়েছে। মুভিতে অষ্টাদশীর জীবন যাত্রা দেখে সে কানাডা আসার জন্য উদগ্রিব ছিল। কিন্তু এখানে আসার সপ্তাহ খানেক পর বাস্বতার মুখোমুখি হয়ে তার ঘুম ভাংগে। অবস্থা সম্পন্ন ঘরের মেয়ে। দেশে থাকতে বাসায় কমন কাজের লোক ছাড়াও ওর জন্য আলাদা একজন কাজের লোক ছিল। মায়ের সাথে ইউনিভারসিটিতে আসা যাওয়া করত। দেশী ভাষায় বলতে গেলে নিজ হাতে গ্লাসে পানি ঢেলে পান করতে হয় নি। কানাডতে এসে রান্না করে খাওয়া, স্বামী সন্তান সামলানো খুবই কষ্টের কাজ। তাই দেশে চলে যেতে চায়। শুধু কানাডা নয়, উন্নত বিশ্বের লাইফ স্টাইল আর বানংলাদেশে যাপিত লাইফ স্টাইল এক না। আমাদর দেশের মা আমাদেরকে আদর দিয়ে,পরবর্তী জীবনে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার কষ্টটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ওকে প্রথমে একটা মজার জোকস শুনালাম, সদ্য প্রেম করে বিবাহিত দম্পত্তি স্বপ্নের আকাশে ঘুরে ফিরে কেবল বাস্তবে ফিরে এসেছে। স্ত্রী স্বামীকে বিয়ের আগের স্বপ্নের বাণী মনে করিয়ে দিল। বিয়ের আগে তো বলতে বিয়ের পর রানীর মত পায়ের উপর পা তুলে খেতে পারব। আর এখন রান্না করে জীবন শেষ!

সাবেক প্রেমিক, বর্তমান স্বামীর নির্লিপ্ত উত্তর, আরে বোকা রান্না না করলে খাবে কি করে? রান্না কর, তারপর পা উপর পা তুলে খাও।

ওকে বাস্তবতা বূঝালাম। সামনে সামার। কানাডার সামার সম্পর্কে শুনে একটু আশান্বিত হল। এখন মাঝে মাঝে সসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেখি। কথা হয়। বূঝলাম ভালো আছে।

কাজের আসা যাওয়ার পথে এক দেশী যুবকের সাথে পরিচয়। তার বাবা মা বিয়ের জন্য পিড়াপীড়ি করছে। তাঁদের ইচ্ছা দেশ থেকে একটু নামাজী/ ধার্মিক পাত্রী বিয়ে করে কানাডা নিয়ে আসা। ছেলে চায় এখানকার মেয়ে বিয়ে করতে। পছন্দের কেউ আছে কিনা জানতে চাইলে। ও না জবাব দেয়। আমার পরিচিত সার্কেলের বেশীর ভাগই বাস্তব জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে। একপর্যায়ে ওর বাবা মা’র সাথে কথা হয়। তাদের খুব ইচছা ধর্মীয় রীতি নীতি মেনে চলে এ রকম একটা মেয়েকে তাঁদের ছেলের বৌ করার খুব ইচ্ছা। আমার পরিচিত কয়েকজনের নাম ও বলে ফেলল। যাদের ব্যাপরে আমি আগে থেকেই জানতাম,তারাও মেয়ের জন্য ধর্মীয় রীতি নিতি মেনে চলে এরম পাত্র খুজছে।

এবার ছেলের সাথে তার ব্যক্তি জীবন নিয়ে কথা বললাম। সে ধর্মীয় রীতি নিতিতে কতটা অভ্যস্থ। সে জানাল,এ ব্যাপারে সে তেমন একটা অভ্যস্থ না। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে বারে গেলে অ্যালকোহল পান করে। এছাড়া করে না। তার বাবা মা’র ব্যাপারে জানতে চাইলাম। তারা ও বাস্তব জীবনে ধর্মীয় ব্যাপারে ততটা সিরিয়াস না। ঈদের নামাজ পড়েন। সময় পেলে শুক্রুবারের জুম্মার নামাজ এ যান। তবে নিয়মিত না। খাবার দাবারের ব্যাপারে অতটা বাচ বিচার করেন না। বাবা মা ও বিভিন্ন পার্টিতে যান এবং মাঝে মাঝে অ্যালকোহল পান করেন। তাদের কথা অনুযায়ী কয়েকটি পরিবারের অভিবাকরে সাথে আলাপ করেছি। তারা নিয়মিত ধর্মীয় বিধি বিধান মেনে চলে এ রকম ছেলে চায়।

পরিশেষে, ছেলে ও তার পরিবার কে বললাম, নিজেরা ধর্মীয় ব্যাপারে উদাসীন অথচ ছেলের জন্য ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা পাত্রী খুজছেন। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা পাত্রীরা ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা পাত্র চায়।

এ বার ফিরে যাই গল্পের শুরুতে, বিয়ের পূর্বে প্রেমিক প্রেমিকাকে যেমন পায়ের উপর পা রেখে খাওয়ানোর প্রুতিশ্রুতি দেয় আর বাস্তবে রান্না না করে খাওয়া যায় না । রান্না না করলেে পায়ের উর পা তুলে খাওয়া যাবে না। তেমনী সুন্দর একটা কমিউনিটি গড়তে না পারলে পরবরতী প্রজন্ম এর সুফল পাবে না।


External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান