আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী

Sat, Dec 23, 2017 7:29 PM

আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

হুমায়ুন কবীর হীরা: যে দেশের সাহিত্য সংস্কৃতি যত সমৃদ্ধ সে দেশ জাতি হিসেবে ততোই উন্নত, সমৃদ্ধ আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতি উন্নত এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ বলেই কবিগুরুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গনে বিষয় ভিত্তিক যতো রকম গান রয়েছে, নাচ, কবিতা রয়েছে তা খুব কম দেশেরই আছে আমরা জাতি হিসেবে কতো সাহসী আর যোদ্ধা তা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষিত পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে কি ভাবে পর্যুদস্ত আর নাস্তানাবুদ করে ৯৫ হাজার পাক সেনা লুংগী পরা আর সাধারণ কাপড় পরা সাধারণ অস্ত্র হাতে বাংলার দামাল ছেলে মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়েছিলো আর এই মুক্তিসেনাদের বীরত্বেই পৃথিবীর বুকে বাঙালী বাঙালী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে একটা ভাষা ভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়  বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জানাই আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম ও অভিবাদন তাঁদের নিঃস্বার্থ এই ত্যাগ ঋণ কোনোদিন শোধবার নয়

স্বাধীন দেশে সাহিত্য সংস্কৃতি আরো বিকশিত হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু তা আর সম্ভব হয় নাই  বিশ্ব ইতিহাসে চরম নিকৃষ্টতম হত্যাকাণ্ড ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে এ দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে চালিত হতে থাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িতরা স্বাধীন বাংলাদেশে বিজাতীয় বা অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে থাকে খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই হারিয়ে যেতে থাকে আমাদের গৌরবগাঁথা অহংকারের মুক্তিযুদ্ধের রক্ত গরম করা সমস্ত গান, কবিতা, কথিকাসহ, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্রসমূহ এবং আরো অনেক কিছু পাল্টে যেতে দেশ ও দেশের  রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক জগত

ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার মধ্যে প্রিন্সেসের সুড়সুড়িমূলক অশ্লীল নৃত্য প্রবেশ করিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয় এই শিল্পকে বিদেশী গানের, বিদেশী সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট আমদানীর ব্যবস্থা করে দিয়ে এ দেশের মানুষের প্রিয় বাংলা সিনেমা, ঐতিহ্যবাহী জারিসারি, পল্লীগীতি, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, লালন, হাসন, দেশাত্মবোধক, মুক্তিযুদ্ধের গান, কবিতা, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নির্মিত সিনেমা সব কিছুকেই নির্বাসনে পাঠানো হয় এ সবের স্থানে জায়গা করে নেয় হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গান, ইংরেজী গান মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ক্ষমতাসীনদের ছড়ানো অপসংস্কৃতির থাবায় ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে সমগ্র দেশ জাতি

দেশের গৌরবমণ্ডিত শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও এই থাবা থেকে মুক্ত থাকতে পারে নি দেশের রাজনৈ্তিক এই সংকটে ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র কমিটি ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে লিয়াকত আলী লাকী ভাই (বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক)বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠকে আগে অপসংস্কৃতি মুক্ত করবেন

দেশের সর্বোচ্চ এবং শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের পবিত্র অংগন থেকেই শুরু করবেন সুস্থ সাংস্কৃতিক আন্দোলন  ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে গান গাইতে আসা বিখ্যাত গায়িকা নিলুফার ইয়াসমিন দর্শক শ্রোতাদের মন মতো হিন্দি গান না গাওয়ায় তাঁকেও মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বাধ্য করা হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের এই পরিস্থিতিতে লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক দলের এই সুস্থ সংস্কৃতির আন্দোলন একটা রীতিমতোই যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া আর কিছুই ছিলো না

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের যে সব শিক্ষার্থীরা গান, নাচ, অভিনয়, তবলা, গিটার, আবৃত্তি, ছবি তোলা (ফটোগ্রাফার) এই সব বিষয়ে আগ্রহী তাদের সমন্বয়ে ১৯৮২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল” এই সাংস্কৃতিক দল বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত ছিলো যেমন – সংগীত বিভাগ, নাটক বিভাগ, যন্ত্র সংগীত বিভাগ, আবৃত্তি বিভাগ, এমন কি ফটোগ্রাফী বিভাগও

সাংস্কৃতিক দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য তখন মৌখিক পরীক্ষা এবং যে শিক্ষার্থী যে বিষয়ে আগ্রহী সেই বিষয়ে অভিজ্ঞ পরীক্ষকদের সামনে উপস্থাপন করে যোগ্য বিবেচিত হয়েই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই সাংস্কৃতিক দলে প্রথম পর্বে সব বিভাগ মিলে সদস্য সংখ্যা ছিলো ১০০ জনের মতো অবাক করার মতো কথা হলো এদের অনেকের প্রতিভা ছিলো বহুমুখী যেমন কেউ কেউ ছিলো যারা রবীন্দ্র-নজরুল সংগীতে পারদর্শী হলেও দেখা গেছে অসাধারণ আধুনিক গান, আবার কেউ কেউ অসাধারণ দেশাত্মবোধক, লালন-হাসন, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, লোকগীতি গান গাইতে পারে ঠিক একই ভাবে যারা নাটক বিভাগের তারাও অনেকেই ভালো গান গাইতে পারে, কেউবা কবিতা আবৃত্তিতে, আবার কেউ কেউ ছবি তোলাতেও পারঙ্গম লিয়াকত আলী লাকী ভাই বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধের গান, কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন গানের সাথে নাচের সমন্বয় করে যন্ত্র সংগীতের সদস্যদের দিয়ে মহড়ার ব্যবস্থা করেন এ সময় একসাথে এক ঝাঁক সম্ভাবনাময় শিল্পীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে এবং প্রাণ ফিরে পায় নির্জীব ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র স্বৈরাচার শাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে এই সাংস্কৃতিক দল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে 

১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসে ডাকসু আয়োজন করে আন্তঃ হল নাট্য প্রতিযোগিতা তখন দেশে স্বৈরশাসক এরশাদের সামরিক শাসন জারি এ অবস্থায় আন্তঃ হল নাট্য প্রতিযোগিতা বাধার মুখে পড়ে সামরিক বাহিনীর দপ্তর থেকে জানতে চাওয়া হয় কি কি নাটক মঞ্চস্থ হবে সামরিক কর্মকর্তারা কবিগুরুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রথ যাত্রা’ নাটকের উপর একরকম নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও সাংস্কৃতিক দলের সদস্যবৃন্দ দ্বিগুণ মাত্রায় উৎসাহিত হয় এই নাটক মঞ্চস্থ করার সেদিন সামরিক শাসনের সামরিক বিধিকে উপেক্ষা করে ‘রথ যাত্রা’ নাটক সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চস্থ করা হয়

লাকী ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রাবাসের প্রাধক্ষ্যদের  পত্র দিয়ে জানিয়ে দেন যে ছাত্রাবাস সমূহের যে কোনো অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সদস্যরা বিনা সম্মানীতে সংগীতানুষ্ঠান, নাটক করে দিতে প্রস্তুত ছাত্রাবাস কর্তৃপক্ষ যেন বাইরে থেকে কোনো শিল্পীদের না আনেন উল্লেখ্য যে, তখন বিভিন্ন ছাত্রাবাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের সম্মানীর বিনিময়ে আনা হতো

এ ভাবেই যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সব ছাত্রাবাসে্র প্রাধক্ষ্যগণ সেই পত্রের মূল্য দিয়েছেন তাঁরা অত্যন্ত আনন্দ আর উৎসাহের সাথে দ্রুতই সাড়া দেন লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক দলের সদস্যরা সব ছাত্রাবাসে বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানে বিশেষ করে জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে গান, নাচ, নাটক, আবৃত্তির আয়োজন করতে থাকে শুধু তাইই নয় পাশাপাশি ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে মূল মিলনায়তনে একের পর এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ অত্যন্ত উৎসাহের সাথে দলের আয়োজিত অনুষ্ঠানসমূহ উপভোগ করতে থাকে সমগ্র অনুষ্ঠান এই দলের সদস্যরা করতো যে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের মঞ্চ থেকে প্রখ্যাত গায়িকা নিলুফার ইয়াসমিনের মতো শুদ্ধ সংগীতের শিল্পীকে দর্শকদের চাপে নেমে যেতে হয়েছিলো সেই মঞ্চেই সাংস্কৃতিক দলের সদস্যরা এক নাগাড়ে রবীন্দ্র-নজরুল সংগীতের দেড়/দু’ঘন্টার অনুষ্ঠান করেছে পিন পতন শব্দহীন দর্শকপূর্ণ মিলনায়তনে এই মঞ্চেই সেই নিলুফার ইয়াসমিনকে একটা অনুষ্ঠানের অতিথি শিল্পী হিসেবে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানালে তিনি সেখানে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন উনাকে আশ্বস্ত এবং কথা দেয়া হয়েছিলো অমন অনাকাংখিত ঘটনা কোনো ক্রমেই ঘটবে না, ঘটতে দেয়া হবে না তিনি অনুষ্ঠানে এসে দর্শক পূর্ণ মিলনায়নে স্বচ্ছন্দে মনের মাধুরী মিশিয়ে গান গেয়েছিলেন অনুষ্ঠান শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে বিস্মিত কন্ঠে বলেছিলেন “এই টিএসসি কি সেই টিএসসি”? এ ভাবেই লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিজ আংগিনা থেকে ঝেঁটিয়ে অপসংস্কৃতি বিদায় করা হয়

বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের সড়ক দ্বীপে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা স্থানে, ২১ এর বই মেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে, শহীদ মিনারে এক নাগাড়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে সাভারে মহান স্মৃতি সৌধেও সকাল থেকে অনুষ্ঠান করেছে সব অনুষ্ঠানেই মুক্তিযুদ্ধের গান, দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, নাটক থাকতো দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণেও সাংস্কৃতিক দল অনুষ্ঠান করেছে  এ ভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের গান, দেশাত্মবোধক গান, লালন হাসনের গান, নাটক, আবৃত্তি করে দেশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে 

১৯৮৩ এর ১৪ ফেব্রুয়ারী স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত ইতিহাসের দিন এ দিন স্বৈরাচার শাসক এরশাদের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের শিক্ষা নীতি বাতিলের দাবীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিশাল মিছিল বটতলা থেকে শিক্ষা ভবনের উদ্দেশ্য যাত্রা করে বিশাল প্রতিবাদী মিছিল শিশু একাডেমির সামনে উপস্থিত হতেই আচমকা পুলিশ  মিছিলে গুলি বর্ষণ করে পুলিশের গুলিতে জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহা সহ আরোও অনেক নাম না জানা শহীদ হন সেদিনই বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনা হাকিম চত্বরে সাংস্কৃতিক দলের স্বৈরাচার বিরোধী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিলোসেই লক্ষ্যে সেখানে বিশাল খোলা মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়  সেদিন দুপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ জাফরের লাশ জানাজার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আনা হয় বিকেল চারটার দিকে এরশাদের পেটোয়া মিলিটারি, পুলিশ অতর্কিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্তুদিক ঘিরে প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীদের উপর নৃশংস ভাবে হামলা চালায় সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় এক যুদ্ধক্ষেত্রে এ সময় সেনাবাহিনী, পুলিশ হাকিম চত্বরে তৈরি বিশাল মঞ্চ ভেংগে চুরমার করে দেয় শিক্ষার্থীরা পালিয়ে আত্মরক্ষা করে সেই সময় সেখানে লাকী ভাই, বাকী ভাই, অসি, ডালিয়া আপা, মুনীর ভাই, পাঁপড়ি আমি ছিলাম আমরাও আত্মরক্ষার্থে পালিয়ে বাঁচি

স্বৈরাচার এরশাদ অনির্দিষ্ট কালের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করলেও তো এরশাদ বিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ হয় নাই বন্ধের মধ্যে লাকী ভাই, বাকী ভাই, মুনীর ভাইসহ আমরা কখনো ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে, কখনো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গিয়েছি আলোচনায় প্রখ্যাত প্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাইও উপস্থিত থেকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন এই সময়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পরামর্শে সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট” “সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট” নামকরণ করেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

১৯৮৩ এর ফেব্রুয়ারী মাসে স্বৈরশাসক এরশাদ ঘোষণা করে যে শহীদ দিবস উপলক্ষে শহীদ মিনারে কোনো আলপনা আঁকা যাবে না এরশাদের এই ঘোষণার প্রতিবাদে এবং ঘোষণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সাংস্কৃতিক দলের অধিকর্তা লাকী ভাইয়ের সিদ্ধান্তে ও নেতৃত্বে শুধু মাত্র শহীদ মিনারই নয় সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাস্তা জুড়ে আল্পনা আঁকা হয়

আজ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যে অনুষ্ঠান করছে আশির দশকে এই অনুষ্ঠানের মূল দায়িত্ব পালন করেছে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল শুনলে অনেকেই মুখ চেপে হাসবেন অথবা বলবে পাগলের প্রলাপ তবুও যা সত্যি তাই বলছি এই সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অনুষ্ঠান আগাগোড়া করেছে এই সাংস্কৃতিক দল শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস উপলক্ষে শহীদ মিনারে সাংস্কৃতিক জোট যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে তা এক সময় অর্ধ যুগের বেশি অর্থাৎ ১৯৮৩,’৮৪,’৮৫,’৮৬,’৮৭,’৮৮,‘৮৯ সাল পর্যন্ত এই অনুষ্ঠানের মূল দায়িত্বে ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস বিস্মৃত

লিয়াকত আলী লাকী ভাই দলের প্রতিটি বিভাগের সদস্যদের দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে ধারাবাহিক ভাবে একের পর এক কর্মশালার ব্যবস্থা করেন বিভিন্ন বিভাগের সদস্যবৃন্দ কর্মশালায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠে প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মধ্যে ‘বিস্ফোরণের বৃন্দ গান” ছিলো একটি নিরীক্ষামূলক প্রযোজনা বৃন্দ আবৃত্তির সাথে নাটকের সংযোজন করা হয় ‘বিস্ফোরণের বৃন্দ’ ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের সুদীর্ঘ কালের সংগ্রাম ইতিহাস যা কবিতায় ফুটিয়ে তোলা হয় নাটকের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতি নৃত্যনাট্য ‘চন্ডালিকা’, ‘রথ যাত্রা’, ময়মনসিংহ গীতিকা ‘সোনাই মাধব’, ম্যাক্সিম গোর্কির ‘অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ’, কৃষ্ণ কুমার ঘোষের নাটক ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ এর মধ্যে সর্বাধিক প্রযোজনা ও দর্শক প্রিয় নাটক হলো ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’

আগেই বলেছি যে, ’৭৫ এর পর স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত রক্ত গরম করা সমস্ত গান অঘোষিত ভাবে নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের অধিকর্তা লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের সাহসিকতায় সেই সমস্ত গান, কবিতা কথিকাগুলো সাংস্কৃতিক দল সাহসিকতার সাথে নিঃশংক চিত্তে বিভিন্ন স্থানে গেয়ে গানগুলো আবারো দর্শক শ্রোতা প্রিয় করে তোলে

সাংস্কৃতিক দলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুধুই ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গান, কবিতা, নাটক, কথিকা প্রচার করেছে বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে অনেক স্থানে হামলার শিকারও হয়েছে বিশেষ করে ১৫ আগষ্ট সেই সময় ট্রাকে করে অনুষ্ঠান করার সময় ট্রাকের উপর ককটেল ছোঁড়া হয়

১৯৮৪ এর ২৮ ফেব্রুয়ারী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি ঘৃণিত রক্তাক্ত দিন স্বৈর শাসক এরশাদের পুলিশ বাহিনী ঢাকার ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের কাছে সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র সংগ্রামের মিছিলের পেছন থেকে পুলিশের ট্রাক চালিয়ে দিলে ঘটনা স্থলে আমাদের সহযোদ্ধা সেলিম দেলোয়ার শহীদ হন পরের দিন ১ মার্চ সাংস্কৃতিক দলের পক্ষ থেকে যতদূর মনে পড়ে অসি, রটি ভাই, জন ভাই,ই জাহাংগীর ভাই আমিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে মধুর ক্যান্টিন থেকে প্রথম প্রতিবাদী মিছিল বের করে বিশ্ববিদ্যালিয় এলাকা প্রদক্ষিণ করি আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী শ্লোগান বা মূল দর্শন প্রয়াত অধ্যাপক ডঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যারের লেখা চমৎকার এই শ্লোগানটি  ডঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল কাছ থেকে আদায় করতে প্রায় এক মাস ধরে দিন রাত্রি জোঁকের মতো লেগে ছিলো দলের সদস্য সহকারী পরিচালক নূর ইসলাম খান অসি অসির কাজ ছিলো প্রতিদিন সন্ধ্যা রাতে স্যারের কাছে গিয়ে এই একটি অসাধারণ লাইনটির জন্য তাগাদা দেয়া

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময়'  র‌্যাগ ডে' করতো শিক্ষার্থীরা যা ছিলো অত্যন্ত কদর্যের বিশ্রী ডাকসুর কল্যাণে তাকেও ঝেঁটিয়ে বিদায় করে ১৮৮৫ সালে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস' এর প্রবর্তন করে এই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপনের পুরো দায়িত্ব সাংস্কৃতিক দল পালন করে দিনব্যাপী সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন জুড়ে সাংস্কৃতিক দল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে রাখে শান্তিপূর্ণ এবং অত্যন্ত সুন্দর ভাবে প্রথম বারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপিত হয় এটিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের কৃতিত্ব

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, সংগীত বিভাগ রয়েছে তা এই সাংস্কৃতিক দল আশির দশক থেকেই দাবী করেছিলো ১৯৮৪ সাল থেকে সাংস্কৃতিক দল লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের নেতৃত্বে এই বিভাগ খোলার দাবীতে আন্দোলন করেছে, তৎকালীন উপাচার্যদের কাছে স্মারক লিপি দিয়েছে সাংস্কৃতিক দল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মুক্ত মঞ্চ নির্মাণ করার জন্যও আন্দোলন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্ত মঞ্চ না হলেও নাট মন্ডল বলে একটা মঞ্চ হয়েছে যা সেদিনকারই আন্দোলনের ফসল এই সব বিভাগ থেকে শত শত শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত

দেশে বিদেশে ছড়িয়ে আছে দলের সদস্যবৃন্দ সেদিনের ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচলক পদে আসীন “আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরীর” কর্ণধার সেই লিয়াকত আলী লাকী ভাই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সমগ্র বাংলাদেশে আমাদের সেই আদর্শ আর সংস্কৃতির প্রবাহে নাও ভাসিয়ে ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালী, পল্লীগীতি, জারিসারি, হাসন-লালন, রবীন্দ্র-নজরুল, স্বধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ দর্শক শ্রোতা প্রিয়তা পেয়েছে এটি সাংস্কৃতিক দলের আন্দোলনেরই ধারাবাহিক ফসল  

দলের অনেক সদস্য আজ জাতীয় পর্যায়ের শিল্পী রয়েছে সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা  বিদেশে স্ব স্ব ক্ষেত্রে একেকজন স্ব স্ব প্রতিভায় উজ্জ্বল, বাংলা ও বাংগালীর সুস্থ সংস্কৃতির ধারা বহমান রেখেছে বিদেশের মাটিতেও কানাডায় আহমেদ হোসেন, জিল্লুর রহমান জন, অনুপ বোস, সাবিনা বারী লাকি, ইমামুল হক কিসলু, আমেরিকায় নাহিদ নেসার ও জিয়া, পর্তুগালে মোস্তফা আনোয়ার, আফ্রিকায় লিপি আলমাজীর নেতৃত্বে বিদেশের মঞ্চে সেই সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দেশিয় সংস্কৃতির ধারা অব্যাহত রেখেছে 

দেশের সংগীত জগতে নজরুল সংগীত শিল্পী সুজিত মোস্তফা, আধুনিক গানের শিল্পী শামিমা পারভীন শিমু, নৃত্য শিল্পী এ্যানি ফেরদৌসি, সোহেল রহমান, অনুপ, নাট্য তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ডঃ ইস্রাফিল শাহীনসহ আরো অনেকে  

 “আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী” ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের ভাব সংগীত যেটা লিখেছিলো এক সদস্য মাসুদ সালাউদ্দিন সেই সত্য সুন্দর দেশিয় সুস্থ সংস্কৃতির আন্দোলনের নেতৃত্বের পুরো ভাগে ছিলো এই দল

আমাদের প্রিয় সোনার বাংলায় আজ যে সুস্থ সংস্কৃতির ধারা বহমান তা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলেরই কৃতিত্ব, অবদান

আরো পড়ুন: ঋদ্ধ সময়ের শুদ্ধ স্মৃতি


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান