উড়াল পথের কথকতা -১

Fri, Dec 22, 2017 6:13 PM

উড়াল পথের কথকতা -১

শামীম চাকরা: একটানা ঘন্টা দশেক কয়েক হাজার কিলোমিটার আকাশে থাকার পরে জেদ্দাহ এয়ারপোর্টে নামলাম। সুপরিসর বিমান। সৌদিয়ার প্লেন, মাঝে মাঝে পেছনের নামাজের জায়গায় নামাজ পড়ে নেয়া। নানান পদের সুপেয় ফলের রস ,স্যান্ডউইচ , আর চা টা তো ফাটা ফাটি রকমের দারুন , মনে হয় আমাদের সিলেটের মালিনী ছড়া চা বাগান থেকে আজ ই তুলে আনা পাতার চা , ইচ্ছে হলে চিনি লেবু দিয়ে খাও ,ইচ্ছে হলে কনে আঙ্গুলের মতো সাইজের প্যাকেটের কফি মেট দিয়ে খাও। কফির টেস্ট টাও যে খারাপ সে কথা বলতে পারবোনা।

কানাডা থেকে প্লেনে ওঠা হোস্টেসরা যার পর নাই অমায়িক, ভদ্র।

আমি মোটা মুটি একটা বাদশাহী মেজাজ নিয়ে হাটা চলা করছি প্লেনের ভেতর। বাদশার দেশে যাবো, দেখি বাদশা বাদশা ফিলিংস নেয়া যায় কিনা, কিছুক্ষন চেষ্টা করলাম, পরে ভাবলাম, নাহ ' আমাকে দিয়ে বাদশার অভিনয় হবে না।

ওহ, মনে পড়েছে কিছুদিন আগে টরন্টো তে আমাদের মানিক চন্দ দাদার নির্দেশনায় নবাব সিরাজুদৌল্লার মঞ্চায়ন হয়ে গেলো। আল্লাহ যদি সুভে লাভে আবার টরন্টো ফিরে যাবার তৌফিক দেন,তবে মানিক দাকে চেপে ধরবো।উনি  যেনো সেই মঞ্চের নবাবের কাছে নিয়ে যান। এবং রীতি মোতাবেক কুর্নিশ পর্ব সেরে, হাত কচলাতে কচলাতে অতীব সম্মানের সাথে জিজ্ঞেস করবো,

" জাহাঁপনা, আমি কি ভয়ে বলবো, না নির্ভয়ে বলবো " ?

"নির্ভয়ে ই বলো "

" জাহাঁপনা, জুড়িদার পাগড়ী, নবাবের পোশাক পরে , কারুকাজ করা চটি পরে, কোমড়ে কাঠের রং করা তরবারি ঝুলিয়ে গোলাম হোসেন কিংবা আলেয়া র সাথে -সেইরকম --অভিনয়ের কালে কি মনের ভেতরেও নবাব নবাব ফিল করেছেন ?

" ওহে নরাধম, তোর গর্দান নেবো "

" সিপাহসালার , সি পা হ সা লা র " ?

বেশ লম্বা জার্নি ।

তাই মাঝে মাঝে একটা রোমান্টিক ভাব ধরার চেষ্টা করেও তেমন সুবিধা করতে না পেরে, অবশেষে মন খারাপ করার অভিনয় করলাম কিছুক্ষন। তাতে কোনো লাভ না হওয়ায়, আগের মতো ফুরফুরে মেজাজে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

এদিকে চিকেন অথবা ভেজিটেবেলের সাথে গরম গরম সুবাসিত পোলাউ, আমি নিজে খাচ্ছি , আর অভ্যতরীণ এডভার্টাইসমেন্ট করছি আমার পরিবারের কাছে এমন ভাবে যে, " কিছুক্ষন পরে যে খাবার টা আসছে , ওটা খুবই ফ্রেশ, আর মজাদার হওয়ার কথা" ।

খাবার দেয়া হলে------ " কি মজাদার না " বলছিলাম না ? চিকেন টা খেয়ে দেখো, সাথে লেবু টা একটু নিয়ে নাও।

"খারাপ না " না না লেবু নেবোনা , হোয়াইট সস টা ই খুব মজা লাগছে।

"খুব ফ্রেশ মনে হচ্ছে তাই না "?

" হুম গরম, আর ফ্রেশ মনে হচ্ছে , তবে আচার টার কোনো স্বাদই নাই, একেবারে যাচ্ছে তাই " বৌ এর উত্তর।

" তাহলে আচারটা আর নিও না , খাবারটাই নষ্ট হয়ে যাবে।

"না নেইনি , জাস্ট একটু মুখে দিয়েই বুঝে ফেলেছি "

"ওহ " আমি বল্লাম , কিন্তু চেখে দেখলাম দারুন মজা। গরম সুবাসিত পোলাউর সাথে, কম ঝাল কম তেলের ম্যাংগো পিকল আচার ,..আহ্হা , এর চেয়ে মজাদার কি হতে পারে ? যেখানে আমি আধা পেঁয়াজ আর গরম ভাত হলেই পেট পুরে খেয়ে উঠতে পারি , আর এই খাবার তো আমার কাছে অমৃত।

যখনই আমার টেবিলে একাধিক খাবারের সমাগম দেখি, আমার মন খুব খারাপ হয়ে যায়, কেন হয় সে কথা কাউকে বলবোনা।  বেশি পদের খাবার থাকলে, আমি খুব দ্রুত খেয়ে উঠি।

আমার মা বলতো কিরে তোর কি ট্রেন ছেড়ে দিবে নাকি ?

"বরিশালে ট্রেন কোথায় পাবো " শোনো, পাগলির কথা।

আমি যে বলি মেয়েটা আমার মতো হয়েছে ? কারণ হলো, যে কোনো খাবারই ও খেতে পারে , মাসাআল্লাহ কোনো কমপ্লেইন নেই। এটা খেতে হবে, ওটা পেতে হবে এমন আবদার নেই। যদি কখনো কাজের ব্যাস্ততায় বাইরে খেতে হয় , ওকে জিজ্ঞেস করি

" কিরে রেস্টুরেন্টে খাবি আজ " ?

" তোমরা যদি চাও " " কেনো বাসায় রান্না নাই " ?

" না। রান্না করতে সময় পাই নাই "

" কোথায় খেতে চাস বল " "তারা তারি বল , তোর বাবার হাতে বেশি সময় নাই , বেশি ঢং করিস না "

ওর মা ক্ষেপে যায়।

" তুমি যেখানে চাও "

আমি কোনো কথা বলি না এ সময় , শুধু শুনি , কথা বললে কাজ হবে না জানি। ওর মা ই সিদ্ধান্ত  দেয়

" চল তুই আজ কান্দাহার কাবাব খাবি "

"ওকে চলো "

"তুই আজ চিকেন ফেরাই খাবি , তোর বাবার ক্লায়েন্টের সাথে এপয়েন্টমেন্ট আছে "

" ওকে চলো "

 

ওকে যদি প্রশ্ন করা হতো " তোমরা কোথা থেকে এসেছো " বা দেশ কোথায় ?

বরিশাল, বাংলাদেশ।

বিপত্তি টা বাধলো সৌদি ইমিগ্রেশনে , চেংড়া মতো এক আরবি, নিচু একটা রিভলভিং চেয়ারে বসে আছে। মাথায় স্কার্ফ অনেক সুন্দর একটা কালো রিঙের সাথে আটকে আছে। বাহ্ মজার টেকনিক তো ? আমাদের বাঙালিদের মহা মূল্যবান কাপড় পড়ার টেকনিক হল, লুঙ্গি পরার টেকনিক। পৃথিবীর অনেক জাতিই জানে না বাংলার বাঙালিদের মত লুঙ্গি পড়তে। যেমন কলকাতার বাঙালিদের রয়েছে ধূতী পড়ার টেকনিক , যেটা শুধু জানে এ বাংলার কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।

সেই মাথায় লুঙ্গি ওয়ালা , সরি সেই স্কার্ফ ওয়ালা , আমাদের হাতের ছাপ নিলো , আমাদের ওমরার ভিসা , ছবি তুললো , বার বার উল্টে পাল্টে দেখলো পাসপোর্ট , ভিসা। মুখে কথা নেই। ইশারায় উঃ উহুঁ করছে।

অনেক বছর , উত্তর আমেরিকায় থেকে অভ্যস্ত আমার সহধর্মিনী গেলো ভীষণ ভাবে খেপে। দস্তুর মতো আপসেট। আমি হাসি, আরে বাবা ওকে বসানোই হয়েছে ,ওভাবে বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে। ওরচেয়ে ভালো ব্যবহার যেন না করে। সবাইকেই যেন সন্দেহের চোখে দেখে। তার উপর ওদের এখন সবাই শত্রু , ঘরে শত্রু , বাইরে শত্রু। এক শাহজাদার শত্রু আর এক শাহাজাদা।

কে কাকে বিশ্বাস করবে বোলো ?

ওদের কারো চোখে ঘুম নাইরে ঘুম নাই।

" আর উই ডান " আমার মেয়ের প্রশ্ন ইমিগ্রেশন অফিসার কে।

"নো" -বলে ইশারায় ক্যামেরা দেখালো , মেয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাতে ছবি তুলে , হাতের ইশারায় বুঝালো ডান।

ও মামা। তাহলে তুমি ইংরেজি জানো,বোঝো , শুধু মুখে বলবানা।

বলতে চাওনা, কেন মামা ? তোমরা না অতিথি পরায়ণ জাতি ?

আরব দের অথিথি পরায়ণতার ইতিহাস হাজারো বছরের। নবী রসূল দেড় কথা না হয় বাদ ই দিলাম,সাধারণ আরব দের অথিথি আপ্যায়ণ এর কথা কে না জানে ?

তোমার তো চাকরি একটা ইন্টারন্যাশনাল এয়ার পোর্টে, কিন্তু এখন বুঝলাম তুমি আমাদের গ্রামের রাজ্জাকের চাইতেও গেয়ো।

এই সমস্ত কথা যখন বললাম, তখন আমার সহ ধর্মিনী বুঝলো, অফিসার তাকে আপসেট করায় আমি ও অনেক রাগ হয়ে গেছি, অফিসার এর উপর। তখন তার রাগ, আমাদের বাড়ীর পেছনের আমগাছে ঘেরা পুকুরটি, যেখানে বাড়ীর বৌ ঝিরা গোসল করে , দৈনন্দীন কাজ করে, সেই পুকুর টির পানির মতো শীতল হয়ে গেলো।

আমার মেয়ে আমার দিকে তাকালো, দুজনে হাসলাম, ওর মা তখন আমাদের কাগজ পত্র ঠিক মতো গুছিয়ে নিচ্ছে।

টরন্টো ,কানাডা।

 


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান