বাংলাদেশি পপিকে নতুন জীবন দিলো কানাডীয়ান সার্জন

Thu, Dec 14, 2017 11:27 PM

বাংলাদেশি পপিকে নতুন জীবন দিলো কানাডীয়ান সার্জন

নাসরিন শাপলা : গত কয়েকদিন ধরে এখানকার টিভি চ্যানেলগুলো আকাইদময়- আকাইদের ট্রেইল ফলো করে করে, তারা পৌছে গেছে সুদূর ঢাকায় তার শশুড়বাড়ি পর্যন্ত। আর গুটি গুটি পায়ে আরেক বাংলাদেশী কন্যা পপি রানী সাহা পৌছে গেছে তার অস্থায়ী ঠিকানা টরন্টোতে। একজন যখন ব্যস্ত অন্যের জীবন নিতে, তখন আরেকজন ব্যস্ত নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতার হাত থেকে নিজের জীবনকে বাঁচাতে।

পপি রানী সাহা, এসিডের শিকার বাংলাদেশের একজন তরুনী।বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের কারণে স্বামীর হাতে নির্যাতিত হতেন পপি। সেটা যে রীতিমতো এসিড পর্যন্ত গড়াবে, সেটা তার কল্পনাতেও ছিলোনা। এক রাতে অসুস্থ বোধ করায়, স্বামী তাকে ওষুধ বলে হাতে তুলে দেয় এসিডের বোতল। সেই শক্তিশালী এসিড পান করার ফলে ঝলসে যায় পপির কন্ঠনালীসহ আরো অন্যান্য অঙ্গ। ঢাকার একটি হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসলেও, জীবন পুরোপুরি বদলে যায় পপির। মুখ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে কোন খাবার বা পানীয় সে খেতে পারতো না। একটি সিরিঞ্জ দিয়ে প্রায় তরল খাবার পেটের সাথে লাগানো টিঊবের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করাতে হতো পপিকে। বাংলাদেশের ডাক্তাররাও আর কোন চিকিৎসা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছিলো।

এভাবেই ধুঁকতে ধুঁকতে হাসপাতালের বেডে পপিকে খুঁজে পায় টরন্টো জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার টনি ঝ্যাং। একটি চ্যারিটি সংস্থার হয়ে তিনি তখন ঢাকায় কাজ করছিলেন। পপিকে দেখে তিনি বুঝতে পারেন, তার চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব। টরন্টো ফিরে ফান্ডের ব্যবস্থা করে ডাঃ ঝ্যাং পপিকে কানাডাতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন গত ফেব্রুয়ারি মাসে।

গত আটমাসে টরন্টো জেনারেল হাসপাতালে পপির মোট তিনটি অপারেশন হয়েছে। পাশাপাশি থেরাপীর মাধ্যমে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানকার সার্জনদের একটি বিশাল দল তাদের সময় ডোনেট করেছে পপির জন্য। হাসপাতালের বিল এবং অন্যান্য খরচ এসেছে ডোনেশনের মাধ্যমে। পপি এখন প্রায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। হাসপাতালের ডাক্তার এবং স্টাফরা আজ কেক কেটে পপির এই নতুন জীবনকে সেলিব্রেট করছিলো। পপির মুখে অনাবিল হাসি থাকলেও, সেখানে উপস্থিত অনেকের চোখেই পানি দেখলাম। সেবাকে যারা শুধু পেশা নয়, জীবনের ব্রত হিসেবে নেয়, এরা সেইসব অসাধারণ মানুষ।

পপির এখন দেশে ফিরে যাওয়ার পালা। সে দেশে ফিরে এসিডের শিকার নারীদের নিয়ে কাজ করতে চায়। ভালো কথা। কিন্তু কিছু পুরোন হিসাব নিকাশ যে এখনো বাকী। পপির স্বামী এখনো বাংলাদেশে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার অন্যায়ের জন্য তাকে কখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি।

আমরা যখন স্কুলে পড়ি, তখন একবার এসিড ছোঁড়া রীতিমতো মহামারীর আকার ধারণ করেছিলো। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারনে সেটা অনেকটা কমে এসেছিলো (অন্তত আমার তাই ধারনা ছিলো)। আজ কানাডীয়ান মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারলাম, এখনো প্রতিমাসে বাংলাদেশে গড়ে পাঁচজন নারী এসিডের শিকার হন।

 

আর মাত্র একদিন পরেই বাংলাদেশে বিজয় দিবস। ঢাকাসহ সারাদেশ নিশ্চয়ই এখন আলোয় ঝলমল করছে। তবে এই আলো সবার জন্য নয়। কিছু মানুষের জীবন থেকে ইচ্ছে করেই আলো কেড়ে নেয়া হয়েছে- সারাজীবনের জন্য। পৃথিবীর একদল মানুষ যখন অন্যের জীবনের আলো জ্বালাতে ব্যস্ত, তখন আরেকদল মানুষরূপী পশু ব্যস্ত অন্যের জীবনের আলো কেড়ে নিতে। কি অদ্ভুত বৈপরীত্য!

পরিশেষে, শুভকামনা পপি রানী সাহা- বাংলাদেশে তোমার বাকীটা জীবন আলোময় হোক। তোমার দেখানো পথে যেন আরো নারী তাদের জীবনের আলো খুঁজে পায়। কৃতজ্ঞতা ডাঃ টনি ঝ্যাং এবং তার টীমকে-তোমরা আছো বলেই না পৃথিবীটা এখনো অনেক সুন্দর।

সবাইকে বিজয়ের শুভেচ্ছা।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান