বীথির কাছে চিঠি-৪২

Wed, Dec 13, 2017 9:14 AM

বীথির কাছে চিঠি-৪২

লুনা শিরীন : মাত্র ৪৫ মিনিট  আগে বাসায় ফিরেছি। নিজের বাসায়,নিজের ভুবনে। পৃথিবীর যেখানেই গেছি , যত প্রিয় বা সুন্দর জায়গাতেই যাই না কেন,দিনশেষে মন প্রবলভাবে টানে নিজের একান্ত ভুবনের দিকে,নিজের ঘরে,একেবারে আপন যে ঘর সেই ঘরেই ফিরে আসে মন।

তুই কি জানিস বীথি, এখোনো পৃথিবীর ৯৯% মানুষ বা বিশেষ করে মেয়েমানুষ শুধু এই নিজের ঘরের মায়ায় ছেড়ে যেতে পারে না সংসারকে , শত লক্ষ লক্ষ অত্যাচার আর নীপিড়নকে সয়েও তারা থেকে যায় সংসার নামক এই অঘোম মায়ার বন্ধনে । একসময় ভাবতাম, ঘরের প্রতি এই প্রবল টান  বুঝি আমার একার ,কিন্তু আজকে বিশ্বাস করি ,সাদা কালো ভেদে এই টান বা মায়া মানুষকে পিছু টেনে রেখেছে যুগে যুগে ।

 গতকাল এমন সময় ছিলাম ইনেদের বাসায়। এই সপ্তাহে নিজের ল্যাপটপ নিয়ে যাইনি তাই আরো বেশী করে অনুভব করেছি তোর সাথে কথা বলার এই শূন্যতাকে। যতক্ষণ কথা বলি তোর সাথে ,ততক্ষণ সেই ১৬ বছর আগে দেখা তোর ওই মায়াবী মুখটা ভেসে থাকে আমার সামনে। সেই কতদুরে তুই ,১৭ হাজার মাইল দুরে। কিন্তু কি গভীর করে তোকে লিখে ফেলি না বলা কথা সব কথা ,আসলে কি জানিস –জীবনকে  ক্ষমা যেমন  করা যায় না তেমনি জীবনকে ভালো ও বাসা যায় না। ভালোবাসা পাবার আকাঙ্খা -- এই জীবন কেবলই দুরে দুরে সরে থাকার জন্য –আমার কাছে তাই মনে হয় – তীব্রভাবে যা ভালবাসবি সেটা কক্ষনো পাবার না।

গতকাল একটা লেখায় পড়ছিলাম,রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়সের দিকে বলেছিলেন—মেজবউঠান বেচে থাকলে সম্পপ্তি নিয়ে মামলা করতে হতো –এই সেই মেজবঊদি – যার ভালোবাসার আগুনে পুড়ে রবীন্দ্রনাথ এত বড় হয়েছেন,কিন্তু  মেজ বঊঠান তা দেখে যাননি –জীবনের নিয়মই তাই বীথি । আমার জীবনের আজ একটা ভীষণ অন্যরকম দিন,সারাদিন অফিসে বিষণ্ণ হয়ে ছিলাম, কোনদিন যা করিনি আজকে তাই করেছি,এই লেখার জন্য নোট টুকে রেখেছি, কিন্তু কই এই যে তোকে লিখছি নোট তো দেখছি না। ইফতারির আর  মাত্র ৪৫  মিনিট বাকী আছে, সুন্য বাসা , রান্না করাই আছে কিছু, নামাজ পরে আল্লাহকে সুদু বলি , শক্তি দিও আল্লাহ, দু;খ সইবার শক্তি, ভুলে থাকার শক্তি, নিজেকে চালাবার শক্তি, আমার  ছেলেটা যেন জানে আমি  নিজের স্বার্থ আর আনন্দের জন্য কোথাও মাথা নত করিনি,কোথাও নিজেকে ছোট করিনি – কেন বলছি তোকে এমন সব কথা ?

উপরের এই লেখাটুকু লিখেই গতকাল ব্যাস্ত হয়ে পরেছিলাম ইফতার এবং অন্যান্য কাজ নিয়ে । আজকে লিখছি আবার, এখন বিকেল সোয়া পাঁচটা । শান্ত নীরব বাড়ি, ভীষন শান্ত এই মুহূর্তটা,তুই বিস্বাশ করবি কিনা জানিনা ,এই নীরবতা ভাঙ্গাটা আমার জন্য অনেক অনেক জরুরী,বলেছি তোকে গত একমাস আমি একটা পার্ট- টাইম মাজ খুঁজছি ছুটির দিনে করবো, এখন মনে হচ্ছে যত না টাকা দরকার তারচেয়ে বেশী দরকার আমার ব্যাস্ততা। সময় সময় অর্থকষ্টের চেয়েও বড় কষ্ট জীবনের পথ রোধ করে দাড়ায় ,জীবনে যে এমন অনুভুতিও পেতে হবে সেটা  কোনদিন জানতাম না । অন্য একটা কথা বলি—আমার শরীরে একটা ছোট সার্জারি ছিলো আজকে সকাল নয়টায়,এমনিতেই নাইয়া নেই, আমি একা, অপারেশন এর ডেট দিয়েছে আরো ২ মাস আগে,বেশ একটু ভাবছিলাম ,এই তো জীবন আমিই বেছে নিয়েছি তাই না ? তবুও রওনা হলাম,পরিচিত একজনকে বলেছিলাম দরকার হলে জানাবো ।  কি বলি তোকে, মাত্র ১৮ মিনিটে সার্জারি শেষ করে,অন্য একটা কাজের জায়গায় দেখা করে,আরো কিছু কাজ সেরে  দিব্বি চারবার বাস পাবলিক বাস বদল করে সুস্থ্য হয়ে একা বাড়ি ফিরলাম। তখন বার বার মনে পড়ছিল শুধু একটাই কথা,কেন পৃথিবীর তাবৎ মানুষ আমেরিকা / কানাডার জন্য হা করে বসে থাকে, কেন থাকে ?

একটা দেশের ভালো মন্দ কোনদিন-ই একদিনে বোঝা যায় না বীথি। মোহাম্মদ জাফর ইকাবালের দেশ নিয়ে সাদা-সিধে  কলাম পরলে যেমন বোঝা যায় তিনি কত গভীর করে জানলে এমন সহজ করে কঠিন কথা বলতে পারেন তেমনি,একটা দেশে  বছরের পর বছর পার না করলে সে দেশের ভালো মন্দও চট করে বলা যায় না । আমি তো আর জাফর ইকবালের মেধা নিয়ে  জন্মায়নি যে  অসামান্য সুযোগ কে সামান্য করে দেখবো ? প্রতিটা দিন বেচে থাকাই যেখানে আমার লক্ষ্য সেখানে কানাডার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা-র সুযোগ  তো আমার মতো নিম্ন-বিত্ত মানুষকে অনেক বেশী শক্তি দেয় তাই না ? এই যে বাড়ি ফিরেছি, সুন্য বাসা  ঠিকই কিন্তু নিরাপদে তো আছি, অনেক দিন ভেবেছি বিথী, অনেক অনেক দিন –ভেবেছি – দেশে চলে গেলে কি আজকের এই জীবনটা যাপন করতে পারতাম আমি ? সঙ্গী থাকতো হয়তো,একদিন তো সঙ্গী ছিলই আমার, সুখী কি ছিলাম আমি ? সুখ শুধুই নিজের কাছে – এমন মহান ফিলসফির কথা লিখে হয়তো আবেগ  তৈরী  করতে পারি আমি, কিন্তু ব্যাক্তিগত জীবন দিয়ে কি সেটা প্রমান করার মতো ধী- শক্তির মানুষ আমি ? বাংলাদেশের তিনজন বিখ্যাত,একদম বিখ্যাত শিক্ষক ও  বুদ্ধিজীবীকে কাছে দেখে ,ভীষন কাছে থেকে দেখেছি,বছরের পর বছর দেখেছি, এখনো দেখছি একজনকে,নিবিড়ভাবে যোগাযোগ আছে আমার সাথে। এই চারজনের ভিতরে একমাত্র সরদার ফজলুল করিম স্যার নিজের ছেলেমেয়েদের নিজে থেকে বাইরে সেটেল করানোর চেষ্টা নিজে করেননি – কিন্তু বাকী তিনজনের একজনের ছেলেমেয়েও দেশী কায়দায় বড় হয়নি, তাদের সবার সবগুলো ছেলেমেয়ের তকমা বিদেশের, সবার একমাত্র জোর বিদেশী ডিগ্রী আর সেই আধো আধো বোলে বাংলা বলা আর চোস্ত ইংরেজী বলা,কিন্তু কেন ?

 যারা নিজেরা দেশ নিলে গলার রগ ফুলিয়ে লম্বা লম্বা লেকচার দেবেন তা্দের নিজেদের ছেলেমেয়েদের জন্য দেশের সব খারাপের ঝুকিটা নেবেন না কেন তারা ? আর আমার মতো বিদেশে সেটেল করা মেয়ে দেখলে, মাথায় হাত দিয়ে বলবেন ,দেশে তোমার মতো মেয়েদের খুউব দরকার ছিলো,কেন সেটা বলবেন ? কি ,গরীব সৎ  শিক্ষকের মেয়ে হয়ে  জন্মানো কি অপরাধ হোয়েছে আমার ? জীবনে তাই শুধু দেশে থেকে থেকে পরে পরে মার খেতে হবে,আর ঐ সব  ধান্ধাবাজদের ছেলেমেয়েরা  বিদেশ থেকে ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে শীতল গড়িতে  বসে আরো বেশী ডলার হাতানোর সব আয়োজন করবেন,তাই চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে,তাই তো ?

জানিনা বীথি –কেন এত বেশী ক্ষোভ জমে থাকে বুকের ভিতরে,হয়তো খুব ছোট মাপের মানুষ বলে তুলনা করে বাচি,নিজের দায় এড়াবার জন্য খারাপ উধহারনকে আশ্রয় করি,তোকে লিখতে বসলে কোনদিন  গুছিয়ে লিখতে পারলাম না, যা যা নোট নিয়ে রেখেছিলাম সেই টপিক-গুলো আর লেখা হলো না । জীবন-ও আমার কাছে তাই বীথি – যতবার তীব্র ভালবাসা নিয়ে  জীবনের কাছে হাত পেতেছি,ততবার সেই কাঙ্খিত ভালোবাসা আমা্কে সবচেয়ে বেশী অপমান করেছে,ঘৃণা করেছে,আমি ভেবেছি আর চিৎকার দিয়ে কেদে কেদে প্রশ্ন করেছি এই কি চেয়েছিলাম আমি  তোমার কাছে ? সত্যিই এই পাওনা ছিলো আমার ? কোনদিন উত্তর পাইনি বীথি – যা পেয়েছি তার নাম অপমান । এই কানাডায় ছোটবোন কনা এপ্লাই করেছে ১৯৯৭ সালে,আমি তখন সদ্য বিয়ে করে এনজিওতে কাজ করি,মিছিল করি, ঘাতক-দালাল  নির্মূল কমিটি করি -আন্দোলন করি। কনা বলল – মেঝপা তুই-ও কানাডায় এপ্লাই করে রাখ –আমার সেই বোন যে আমাকে জীবনে সবচেয়ে বেশী সাপোর্ট করছে ,তাকে বললাম—আমি  তোর মতো অপদার্থ না যে আমি বিদেশে যাবো –দেশে আমার অনেক কাজ আছে,সেদিন মনে হয় আল্লাহ হেসেছিলেন,কারন আল্লাহ তো দেখেছিলেন আমার ভবিষ্যৎ আমি না হয় দেখেনি, তাই না ? সেই কানাডায় আসার পরে,আমি তোর  কাছে কসম করে বলছি—প্রথম  আড়াই বছর কানাডার জবের অবস্থা দেখে আল্লাহকে বলেছিলাম ,আল্লাহ আমাকে সামান্য একটা চাকরি দাও ,সামান্য একটা চাকরি,আমি আজন্ম বেসমেন্ট এ থাকবো, শুধু মাসে ১০০০ থেকে ১২০০ ডলার এর নিরাপত্তা চাই আল্লাহ ।

 বিথী এই দেশ আমাকে অনেক  দিয়েছে ,অনেক দিয়েছে। কিন্তু এই দেশ এর কাছে কি এত ভালোবাসা চেয়েছিলাম ? আজকে যে মেয়েটি অপারেশন করলো,ছোট্ট একটা বাচ্চা চাইনীজ মেয়ে, ১৮ মিনিটের অপারেশন এ ১০ বার বলল – আর উ ওকে ? ওই যে বললাম তোকে, যেখানে জীবন সপে  দিয়েছিলাম আজকের দিনেই সেখানে পেয়েছি অপমান, উপেক্ষা,আর ঘৃণা  আর যেখানে ভয় /সঙ্কা নিয়ে দাড়িয়ে  ছিলাম সেখানে পেয়েছি উজাড় করা ভালোবাসা । এই কঠিন পথ কি আমার একার বীথি ? কিছুতেই যে হিসেব মেলে না,শুধুই বোবা কান্না আমার সব সুন্যতাকে সাথী করে ফিরে আসে আমার নিজের অনুভুতিতে। আদর তোকে ।

১৮ই জুলাই ,২০১৪।

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিটি-৪১


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান