মৃত্যুমুখী নগর বাঁচাতে জীবন দিলেন যিনি

Sat, Dec 2, 2017 7:45 AM

মৃত্যুমুখী নগর বাঁচাতে জীবন দিলেন যিনি

মাসকাওয়াথ আহসান : বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আনিসুল হক ছিলেন একজন বেমানান মানুষ। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জনগণকে কেবল অঙ্গীকার করতে হয়; কিন্তু সে অঙ্গীকার পূরণ করতে হয় না। এই দেশপ্রেমের কেনাবেচার বাজারে মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে হয় সে স্বপ্ন ভেঙ্গে দিতে। কিন্তু আনিসুল হক একটি মৃত নগরীতে বসে জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

এ ছিলো অসম্ভব স্বপ্ন; নরভোজি জনপদে অসংখ্য আত্মকেন্দ্রিক মানুষ যখন ক্ষমতার বেলিফুলের মালা হাতে গলিয়ে সুগন্ধী মেখে উন্নয়নের মুজরা দেখাতে ব্যস্ত; আনিসুল হক তখন অল্প-বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া নগরের ডুবতে থাকা ছোট-খাট মানুষের পাশে বিনিদ্র রাত কাটাতেন। অবৈধ দখলদার মুক্ত নগরী রচনার স্বপ্নে বিভোর আনিসুল হক যখন বুলডোজার নিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন দম্ভের অবৈধ স্থাপনা ও দালানগুলো; দখলদার সমাজ তখন খুব বিরক্ত হয়েছে। কারণ তারা টিভিতে একজন উপস্থাপক আনিসুল হকের মুখে শুধু স্বপ্নের কথা শুনতে চেয়েছে; কিন্তু সে স্বপ্নের বুলডোজার নিয়ে তিনি বাস্তবজীবনে উপস্থিত হবেন এ তাদের পছন্দ হয়নি।

তাঁর স্বপ্নের প্রতিপক্ষ এই প্রচলিত রাজনৈতিক ও আমলা কাঠামো। তিনি একের পর এক নাগরিক জীবনের বিপর্যয়ে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বপ্নের নগরীকে বাঁচাতে চেয়েছেন; একসময় সেই জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে তিল তিল মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছেন।

হাসপাতালে তিনি যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন; তখন কিছু কিছু ওয়েব পোর্টাল "তিনি আওয়ামী লীগের নন, তৃতীয় শক্তির" এমন একটি গুজব ছড়ায়। আবার কেউ কেউ তাঁর মৃত্যু দেখতে এতো অস্থির হয়ে পড়েছিলো যে বারবার তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়াচ্ছিলো। মূলধারার মাধ্যমও এই গুজবের ফাঁদে পড়েছে প্রবল অপেশাদারিতায়। অবশেষে আনিসুল হককে "মরিয়া প্রমাণ করিতে হইলো" তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন।

"অদৃশ্য সাবানে হাত কচলানোর" যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেখানে গতানুগতিক রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা-কর্মীর পক্ষে আনিসুল হকের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ঋজু ও নৈর্ব্যক্তিক থাকাটাকে বোঝা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হবার পর একজন মানুষ যে দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি পুরবাসীর মেয়র হতে পারেন; এই সহজ চিন্তাটি স্বপ্নহীন দলদাসদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। তাদের কাছে "নৈর্ব্যক্তিকতা বা নিরপেক্ষতা" মানেই তৃতীয় শক্তি।

আবার আনিসুল হক যেহেতু আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মেয়র হয়েছেন; অতএব তার মৃত্যুর পর চিন্তার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে বিরোধী পক্ষ। আনিসুল হকের কী কী খারাপ ছিলো সেই কাসুন্দি ছাড়া তাদের নরভোজের আয়োজন সম্পন্ন হবে কী করে!

কিন্তু আনিসুল হকের মতো এতো দক্ষ, সমসাময়িক, আগামী মনস্ক মানুষটির স্বপ্ন যখন হোঁচট খেয়েছে ঢাকা নগরীর অনিরাময়যোগ্য মরণ রোগ দেখে; তখন আশংকা জাগে অন্য কারো পক্ষে এ শহরকে বাঁচানো সম্ভব কীনা! আদৌ এ নগরটিকে আর ম্যানেজ করা সম্ভব কীনা! না কী ক্রমে ক্রমে একটি হানানগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা!

এতো বিপুল জনসংখ্যার মানুষ এতো ক্ষুদ্র একটি নগরীর ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে যেভাবে; সে ভার এ নগর আর বইতে পারবে কীনা এই ভাবনাটি আক্রান্ত করে। প্রায় প্রতিটি একতলা-দোতলা বাড়ী এখন আকাশ ছোঁয়া দালান; একদিকে দারিদ্র্যে লীন পুরবাসী; অন্যদিকে নানা সময়ে ক্ষমতা কাঠামোতে থেকে জমি দখল করে প্রাসাদ তুলেছে তস্কর সমাজ। দখল হয়ে গেছে খাল। ভরাট করে সেখানেও তোলা হয়েছে দালান কোঠা। পরিবহন মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যে এখনও একটি সুস্থ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ সমাজ বড় বড় পাজেরো-প্রাডো হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছে ক্ষুদ্র এ নগরীতে। আর রোমান্টিক মধ্যবিত্ত সমাজ নিজের গৃহটিকে শৈল্পিকভাবে সাজিয়ে শিল্প-বর্জ্য ফেলে দিয়ে আসছে যেখানে-সেখানে। এমনকি যে অভিবাসী পশ্চিমে নিয়মিত ডাস্টবিন ব্যবহার করে; সে ঢাকা বিমান বন্দর থেকে বেরিয়েই ঢাকার পথে ফেলে দিচ্ছে বাচ্চার চিপস-জুসের ব্যবহৃত প্যাকেট।

আমরা যারা আনিসুল হকের মৃত্যুতে শোকাহত; তারা আনিসুল হকের স্বপ্ন হননের জন্য প্রত্যেকেই কমবেশী দায়ী; এ কথাটি স্বীকার করে নিয়ে এ নগরকে ভালোবেসে অন্ততঃ নিজের নাগরিক দায়িত্ব পালন করে আনিসুল হকের স্বপ্নের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি। মৃত্যুমুখী ঢাকাকে বাঁচিয়ে তুলতে পারলেই প্রমাণিত হবে, মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান