"পীর" বা "ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ"সংস্কৃতি

Tue, Nov 28, 2017 7:20 AM

"পীর" বা "ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ"সংস্কৃতি

মাসকাওয়াথ আহসান : বাংলাদেশের শাপলা চত্বরে হেফাজতের তান্ডব, ভারতে রাম-রহিম সিং-এর গ্রেফতারে ভক্তদের তান্ডব, সম্প্রতি পাকিস্তানের ফায়েজাবাদে তেহেরিক লাব্বায়েকের তান্ডবের চেহারা ও চরিত্র একই। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশেই ধর্মীয় অনুভূতির রোগ এতো প্রবল যে তান্ডব ঘটানোর জন্য আক্রোশের খড়ের গাদা সব সময়ই প্রস্তুত থাকে। সেখানে দেশলাই কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া খুব সম্ভব সবচেয়ে সহজ কাজ।

কাজেই এটা অনুধাবন করা জরুরী যে মানসিকভাবে সবচেয়ে আদিম পর্যায়ে বসবাস করছে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ। এরজন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী দক্ষিণ এশিয় আত্মকেন্দ্রিক আধা-শিক্ষিত সমাজ। সামান্য শিক্ষিত হলেই প্যান্ট-শার্ট পরে সাহেব সেজে নিজের ফেলে আসা অতীতকেই ছোট করে দেখা; কাল্পনিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রত্যাশা; অন্যকে হীন করে নিজেকে উচ্চে তুলে ধরে পুচ্ছ নাচানোর যে বদ-অভ্যাস; তা ব্যাপক শ্রেণী বৈষম্য ও শ্রেণী আক্রোশ তৈরি করে।

ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর নেতারা প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে খুব মধুর আচরণ করে। উদ্দেশ্য; তাদের দলে ভেড়ানো। অন্যদিকে একটু শিক্ষিত নিজেকে প্রগতিশীল দাবী করা মানুষেরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত দাম্ভিক আচরণ করে। এরফলে সাধারণ মানুষেরা ক্রমশঃ ধর্মভিত্তিক সংগঠনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কথিত প্রগতিশীল মানুষেরা কৌশলের দিক থেকে পরাজিত হয়েছে ধর্মান্ধ মানুষের কাছে।

অধুনা ধর্মভিত্তিক মানুষের হাতে বেশ টাকা-পয়সা হয়েছে। ফলে এতোদিন উপেক্ষিত থাকার প্রতিশোধ নিতে বেপরোয়া তারা। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত সুশৃংখল; পরিচালিত হয় পশ্চিমা রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক মডেলে; কিন্তু পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিতদের কথিত আধুনিক রাজনৈতিকদলগুলো বিশৃংখল; পরিচালিত হয় পরিবারতন্ত্রে। আদিম সামন্ত প্রথার নব্য সংস্করণ এই রাজনৈতিক দলগুলো; যার অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার ভীষণ অভাব।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার জীনগত কীনা জানিনা; ধর্মভিত্তিক ও কথিত আধুনিক রাজনৈতিক দলের নেতারা সবাই "পীর" বা "ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ" হয়ে উঠতে চেষ্টা করেন। আবার ব্যাপক পঞ্চায়েতি করার আগ্রহ দক্ষিণ এশিয়ার একটু প্রভাবশালী মানুষের। কোরান তেলওয়াত জানা, একটু ওয়াজ করতে পারা, একটু ইতিহাস জানা, একটু সংস্কৃতি করতে পারা, একটু লিখতে পারা, একটু টাকা-পয়সা হয়েছে, একটু সাজতে শিখেছে, একটু ইংরেজি বলতে পারা, একটু কফি খাওয়া শিখেছে; এমন প্রতিটি মানুষের মধ্যে পঞ্চায়েতি করার প্রবল আগ্রহ। এই পঞ্চায়েতির বদ-অভ্যাস একদিকে যেমন অধিকার বঞ্চিত মানুষের মধ্যে তান্ডবের রিরংসা জাগায়; অন্যদিকে প্রতিটি মানুষের মাঝে পঞ্চায়েতি করার স্বপ্ন জারিত করে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে; এরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে নিজের দেশকে তুলনা করে; তিনজন খারাপ ছাত্রের মধ্যে কে প্রথম হয়েছে; তা নিয়ে ভীষণ গর্ব করে। অথচ ধারণা করতেও পারে না; শিক্ষায়, বিজ্ঞানে, বোধে, শৃংখলায় পৃথিবীর অনেক অনুন্নত দেশ এরি মাঝে অনেক এগিয়ে গেছে। এটা ঘটেছে বিগত কয়েকটি দশকে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কোন সংকট সমাধান না হবার কারণ; নিজের অক্ষমতা ঢাকতে প্রতিটি রাষ্ট্রের শাসক ও তাদের দালালেরা অন্যদেশের ওপর দোষ চাপায়। নিজের কোন দোষ দেখতে না পাওয়া, দোষ স্বীকার না করা আর উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে চাপিয়ে এরা বর্ণনাতীত হাস্যকর ও অবিশ্বাসের জায়গায় পৌঁছে গেছে।

একটু পড়ালেখা জানা সম্পদশালী দক্ষিণ এশিয়রা নিজেদের বাচ্চা-কাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়াম ও পশ্চিমা দেশে পড়ায়। অধিকার বঞ্চিত মানুষের শিশুরা মাদ্রাসায় পড়ে ও ব্যাপক ধর্মীয় অনুভূতির অযৌক্তিক বোধ নিয়ে বেড়ে ওঠে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের যে কোন অজুহাতে ফুসে ওঠার মত খড়্গাদা হয়ে অপেক্ষা করে তান্ডব চালানোর আক্রোশ নিয়ে।

আর মধ্য উপার্জনের মানুষের যে শিশুরা দেশগুলোর সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে পড়াশোনা করে; সেখান থেকে কথিত আধুনিক রাজনৈতিক দলের ক্যাডার তৈরির নীল নক্সা চলে। এদের জাতীয়তাবাদের অনুভূতির খড়গাদা হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। ধর্মীয় অনুভূতির ফুটসোলজারদের মোকাবেলার জন্য কথিত আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয়তাবাদের অনুভূতির ক্যাডার তৈরি করে।

ধর্ম আর উগ্রজাতীয়তাদের আবেশে ঠিক হিটলারের নাতসিদের মতো করে গড়ে তোলা হয়েছে দুটি বিপরীতমুখী দল। দক্ষিণ এশিয়ার নিয়তি অধিকার বঞ্চিত মানুষের সন্তানদের নিয়তি নিয়ে খেলাধুলা করে নানা ধরনের ঠক ও প্রতারক নেতারা। এইভাবে ক্রমে ক্রমে দক্ষিণ এশিয়ার মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিনাশ সাধন করা হয়েছে।

একটি প্রজন্মে তবু ধনী দেশে দাস হিসেবে পাঠিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার আদিম রাষ্ট্রগুলো বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে। কৃষক-শ্রমিককে খাটিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা হয়েছে। তারপর তাদের উপার্জিত অর্থ লুন্ঠন করেছে ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতা, তাদের অনুগত ব্যবসায়ী, সামরিক-বেসামরিক আমলা ও চট করে দালাল হবার মতো প্রশিক্ষিত লোকেরা। সেসব অর্থ চলে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে।

ভবিষ্যতের জন্য তোলা রয়েছে কেবল তান্ডব, চাঁদাবাজি আর দালালি করে ভাগ্যবদলের প্রলোভন। ঘৃণারও অযোগ্য এই ধর্ম-জাতীয়তাবাদের ঠিকাদার আর দালালবাদের সভ্যতা বিনাশী কর্মকান্ড।


External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান