পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

Sun, Nov 26, 2017 3:16 PM

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

মাসকাওয়াথ আহসান: অনেক অনুজ প্রতিম বিতার্কিক আমাকে জিজ্ঞেস করতো, আপনি কী ফরিদপুরের বিতার্কিক! আমি উত্তর দিতাম নাতো! তবে একাধিকবার একই প্রশ্ন শুনে খটকা জাগে। ফরিদপুরের বিতর্ক আয়োজনগুলোর প্রকাশনাগুলোতে নিয়মিত লিখেছি। যতদূরেই যাই নিয়মিত ফরিদপুর থেকে একটি ইমেইল আসতো, বিতর্ক আয়োজনের প্রকাশনায় লেখা চাই। বিস্ময় জাগতো। ঢাকার বিতর্ক আন্দোলনের সমান্তরালে ফরিদপুরের বিতর্ক আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছিলো এটা টের পাচ্ছিলাম।

বিতার্কিক, গবেষক ও লেখক এইচ এম মেহেদী হাসান "ফরিদপুরের বিতর্ক চর্চা" শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রণয়নের সময় কাকতালীয়ভাবে আমাকে যখন একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো; তখন একটু স্মৃতি হাতড়ে দেখি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে ধারাবাহিকভাবে নানা সময়ে ফরিদপুর থেকে আসা বিতার্কিকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কের বিভিন্ন যুগক্ষণে ফরিদপুরের বিতার্কিকেরা উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছে। বিতর্ক সংগঠন বা আন্দোলনের নেতৃত্বে কিংবা তারকা বিতর্কের আসরে ফরিদপুরের বিতার্কিক থাকেই।

কাজেই ফরিদপুরের বিতর্কের ঐতিহ্য নিয়ে প্রত্ন গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। চাণক্য সেনের "পিতা পুত্রকে" গ্রন্থে মাদারীপুরের পালং হাইস্কুলে বৃটিশ আমলে আয়োজিত বিতর্ক আয়োজনের কথা পড়েছি; বিতর্কের মাঝ দিয়ে কিশোরদের মনে স্বদেশ মুক্তির আকাংক্ষা জারিত করার সে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় ঐ অঞ্চলে বিতর্কের আলো অনেক আগে জ্বলেছে। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে ফরিদপুরে ঢাকার সমান্তরাল একটি বিতর্ক আন্দোলন গুণগত মান বজায় রেখে অব্যাহত রাখার ঐতিহ্যের পাটাতন সেখানে আগে থেকেই ছিলো।

এইচ এম মেহেদী হাসান ফরিদপুরের বাংলাদেশ কালের বিতর্ক চর্চার ইতিহাসকেই খুঁজেছেন; যাতে অতীতের বিতর্কের ইতিহাস সংরক্ষণের অভাবে এই আলোকায়নের ইতিহাসটি হারিয়ে না যায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার কিছু আগে ফরিদপুরে সনাতন পদ্ধতির একক বক্তার বিতর্কের কিছু তথ্য-উপাত্ত মেহেদী এ গ্রন্থে উপস্থিত করেছেন। ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে বিতর্ক চর্চাটি জোরদার ছিলো; তা টের পাওয়া যায়। এছাড়া সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ ও ইয়াসিন কলেজে বিতর্ক চর্চার চিহ্ন চোখে পড়ে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ফরিদপুর খেলাঘর প্রথম বিতর্ক উতসব আয়োজন করে। "লাখো শহিদের আত্মত্যাগে মুক্ত স্বদেশ" শ্লোগানে বিতর্কের বিষয় ছিলো, "একমাত্র ছাত্ররাই পারে দেশকে সঠিকপথে এগিয়ে নিতে।" স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বিতর্ক চর্চার এই শুভক্ষণে ফরিদপুরের বিতর্ক আন্দোলনের উজ্জ্বল আগামীর প্রতীতী চোখে পড়ে।

১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন "জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা" শুরু করলে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের বিতার্কিকেরা এতে অংশ নেয়; তিন জন বিতার্কিক দলীয়ভাবে বিতর্ক চর্চার আঙ্গিকটি এসময় ফরিদপুরে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ১৯৭৮ সালে ফরিদপুর বিতর্ক পরিষদ গড়ে উঠে।

আশির দশকে টেলিভিশন বিতর্কের জনপ্রিয়তার অভিঘাত বিতর্ক শিল্পের প্রতি আগ্রহ সম্প্রসারিত করে। সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের বিতার্কিকেরা অংশ নেন টেলিভিশন বিতর্কে। ১৯৮২ সালে গড়ে উঠে দ্বিতীয় বিতর্ক পরিষদ।

একই বছর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের পর ছাত্র-শিক্ষক বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। সংকট নিরসনে বিতর্ক আয়োজন; সভ্যতার ভিত্তি যে সংলাপ সে কথা আরেকবার মনে করিয়ে দেয়। ফরিদপুর কলেজের সাধারণ মানুষ হাজির হয়েছিলো ছাত্র-শিক্ষকদের এই বিতর্ক দেখতে।

আশির দশকে শিশু একাডেমি আয়োজিত "জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা" ও "মৌসুমি বিতর্ক প্রতিযোগিতায়" শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন গঠিত হলে বিতর্ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার ধারণাটি বিকশিত হয়। ফরিদপুরের বিতার্কিকেরা ঢাকা থেকে ফরিদপুরে গিয়ে বিতর্ক কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দেবার আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশানকে।

এতে বোঝা যায় ঢাকার বিতর্ক চর্চার প্রতিটি উজ্জ্বল যুগক্ষণকে স্পর্শ করেছে ফরিদপুরের বিতার্কিকেরা; সেইসঙ্গে চালিয়ে গেছেন নিজস্ব বিতর্ক আন্দোলন।

১৯৯৪ সালে ফরিদপুরে একাধিক বিতর্ক সংগঠন গড়ে উঠে। বিতর্ক চর্চা কেন্দ্র, তৃতীয় বিতর্ক পরিষদ এদের অন্যতম।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু হয়; স্কুল বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে ফরিদপুরের বিতর্কের ভবিষ্যত তারকারা।

সরকারি রাজেন্দ্র কলেজই খুব সম্ভব বাংলাদেশের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে ছাত্র-সংসদে বিতর্ক সম্পাদক নির্বাচিত হতেন। এমন আগামী মনস্ক চিন্তার উদ্ভাস খুব কম চোখে পড়ে।

ফরিদপুরে নতুন নতুন বিতর্ক সংগঠন গড়ে উঠার একটি ইতিবাচক প্রবণতা চোখে পড়ে। ২০০৫ সালে 'বিতার্কিকবৃন্দ, ফরিদপুর' একটি বিতার্কিক সম্মেলন আয়োজন করে। এই সম্মেলনের শ্লোগান ছিলো, "এখনো নীল আকাশ; এখনো স্বপ্নেরা ডানা মেলে।"

২০০৬ সালে একাত্তরের ২৫ মার্চ-এর কালো রাত্রি স্মরণে আয়োজিত হয় প্ল্যানচেট বিতর্ক ও আলোর মিছিল। এসময় অনেকগুলো বিতর্ক সংগঠন বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে; একটি বিতর্ক সংগঠনে সমস্ত সৃজনশীলতার শক্তি জড়ো করার সিদ্ধান্তে ঐক্যবদ্ধ হয় বিতার্কিকেরা।

২০০৬ সালের ১৭ মার্চ যাত্রা শুরু করে ফরিদপুর ডিবেট ফোরাম।

উপজেলা পর্যায়ে বিতর্ক আন্দোলন জারিত করতে উদ্যোগী হয়। ২০১২ সালে সদরপুর ডিবেট ক্লাব আয়োজন করে বিতার্কিক অন্বেষণ; "তোমার মাঝে লুকিয়ে আছে অসীম সম্ভাবনা"।

ফরিদপুরের বিতর্ক চর্চার ইতিহাস এই লুকিয়ে থাকা অসীম সম্ভাবনার নিরন্তর খোঁজ। সে কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনকে ফরিদপুর উপহার দিয়েছে তারকা বিতার্কিক ও ভালো সংগঠক; আর বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছে অসংখ্য সৃজনশীল যুক্তিনিষ্ঠ মানুষ যারা নানা ক্ষেত্রে তাদের সেরাটা উপহার দিতে শিখেছিলো ফরিদপুরের বিতর্কের আলোকিত উঠোনে।

ফরিদপুরে বিতর্ক চর্চা

লেখকঃ এইচ এম মেহেদী হাসান

প্রকাশকঃ পাললিক সৌরভ


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান