টেলিভিশন:প্রযুক্তির উৎকর্ষের উন্মোচিত নতুন দিগন্ত

Mon, Nov 20, 2017 10:34 AM

টেলিভিশন:প্রযুক্তির উৎকর্ষের উন্মোচিত নতুন দিগন্ত

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: কম্পিউটার এবং ল্যাপটপ কিংবা স্মার্ট  ফোন। এগুলো বিনোদনের জায়গা দখল করার আগে টেলিভিশন-ই ছিলো মানুষের বিনোদনের মূল উৎস। বিশ্বের যেকোনো জায়গাতে বসে নিজ দেশ সহ সারা বিশ্বের সাম্প্রতিক খবরা-খবর, জমজমাট সব ব্লক বাস্টার মুভি, নাটক, টিভি সিরিজ এবং ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান গুলো উপভোগ করার জন্য টেলিভিশন এক অদ্বিতীয় মাধ্যম। টেলিভিশন শব্দটি মূলত প্রাচীন গ্রিক শব্দ 'টেলি' অর্থ দূরত্ব , আর ল্যাটিন শব্দ 'ভিশন' অর্থ দেখা। এই দুটি শব্দ মিলিয়ে ইংরেজীতে টেলিভিশন বলা হয়ে থাকে। এ কারনে টেলিভিশনকে বাংলায় দূরদর্শন যন্ত্র ও বলা হয়।

১৯২৬ সালে লোগি বেয়ার্ড কর্তৃক টেলিভিশন আবিস্কৃত হবার পর যন্ত্র টিকে নানা গবেষণার পথ পেরিয়ে রুশ প্রকৌশলী আইজাক শোয়েনবার্গের সহায়তায় ১৯৩৬ সালে বিবিসি প্রথম টিভি সম্প্রচার শুরু করে। তবে ১৯৩৬ সালে বিবিসি কর্তৃক সম্প্রচার শুরু হলেও টেলিভিশন বানিজ্যিক ভিত্তিতে চালু হয় ১৯৪০ সালে। অতঃপর ১৯৪৫ সালে যন্ত্রটি পূর্ণতা লাভ করে। তারপর পঞ্চাশ এর দশকে টেলিভিশন গণমাধ্যম হিসাবে ভূমিকা নিতে শুরু করে। টেলিভিশন আবিস্কার হবার পর থেকে এটি নিয়ে তারপর থেকেই নানা গবেষণার কাজ চলেছে। ভিডিও এবং অডিও কোয়ালিটি আরো ভাল মানের দেবার চেষ্টা এবং এতে আরো নিত্য নতুন সুবিধা যুক্ত করার জন্য এখনো গবেষণা চলছে।

আমাদের দেশের টেলিভিশনসহ সকল ধরনের মিডিয়ার স্বাধীনতা ভোগের মাত্রা যত দিন যাচ্ছে বাড়ছে৷ ১৯৯১ সাল থেকে আমাদের দেশের মিডিয়াতে সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের সেন্সরশিপ কিংবা বিধিনষেধ লক্ষ্য করা যায়না৷ এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাপ রয়েছে বলেও শোনা যায় না৷ তবে আমরা অনেক সময় মিডিয়ার প্রধান নির্বাহীদের বলতে শুনি তারা এক ধরনের অদৃশ্য চাপের মধ্যে থাকেন, সেই চাপ তারা বোধ করেন মিডিয়ার মালিক পক্ষ থেকে৷ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মিডিয়ার মালিক শিল্পপতি৷ তারা করপোরেট কালচার থেকে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান৷ যে কারণে সকল ধরনের মিডিয়াতে অদৃশ্য চাপের বিষয়টি বেড়ে চলেছে৷ এটি শুধুই আমাদের দেশের সমস্যা নয়৷ পৃথিবীর সকল দেশেই শিল্প মালিকানায় পরিচালিত মিডিয়া হাউজগুলোতে এক ধরনের সেন্সরশিপ থাকে৷ এই ধরনের সেন্সরশিপকে অনেকে বলেন সেলফ সেন্সরশিপ৷

সেলফ সেন্সরশিপের ধরনটা এমন যে, বিজনেস হাউজগুলোর বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না৷ এমনকি সেখানে যদি নিউজ ভ্যালুও থাকে তবুও চুপ করে থাকাটাই রেওয়াজ৷ আবার উল্টোভাবে প্রতিপক্ষের ব্যবসায়িক ক্ষতি করতে মিডিয়াকে ব্যবহারের নজির রয়েছে৷ এই ধরনের অবস্থায় একটি দেশের বড় বড় করপোরেট হা্‌উজগুলো মিডিয়াতে নিজেদের অবস্থান তৈরিতে ব্যস্ত থাকে৷ রেডিও,  টেলিভিশন কিংবা নিউজপেপার কোন কিছু একটা নিয়ে তারা নিজের ক্ষমতা পোক্ত করতে চায়৷

এই ধরনের পরিস্থিতি মিডিয়ার সার্বিক বিকাশের জন্য ভালো নয় বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে বেশিরভাগ মানুষ আবার স্বল্প শিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর৷ মিডিয়া এক্মপার্টরা মনে করেন এই অবস্থাকে যদি চ্যালেঞ্জ না করা হয় তবে আগামী দিনগুলোতে আমাদের দেশের মানুষেরা তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্রাইসিসে পড়তে পারেন৷ এতে করে বর্তমান তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় আরো বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে৷

টেলিভিশনকে ডিসপ্লে প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে বিভিন্নভাবে ভাগ করা যায়।
যেমন :

১। সিআরটি (CRT),২। প্লাজমা (Plasma),৩। এলসিডি (LCD),৪। এলইডি (LED) ইত্যাদি।

সম্প্রচার থেকে প্রদর্শন পর্যন্ত টেলিভিশনের সম্পূর্ণ পদ্ধতিকে আবার তিনভাগে ভাগ করা যায়।

১। এনালগ টেলিভিশন (ATV),২। ডিজিটাল টেলিভিশন (DTV) ৩। এইচডিটিভি (HDTV)।

জাতিসংঘের সাধারণ সভা ২১ নভেম্বর দিনটিকে বিশ্ব টেলিভিশন দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত বিশ্ব টেলিভিশন ফোরামকে স্মরণ করার জন্যই মূলত দিনটিকে টেলিভিশন দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘে যখন বিশ্ব টেলিভিশন দিবসের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় তখন একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই এর বিপক্ষে বলে যে বিশ্ব টেলিভিশন দিবস শুধু সময় এবং শক্তির অপচয়ই ঘটাবে। তবে অন্য কোনো দেশ এই দিবসের বিপক্ষে কথা না বলায় ২১ নভেম্বর বিশ্ব টেলিভিশন দিবস হিসেবে তা স্বীকৃতি পায়।

১৯২৬ সালে যখন প্রথম টেলিভিশন উদ্ভাবন করা হয় তখন এর নাম টেলিভিশন ছিল না। উদ্ভাবক জন লোগি বেয়ার্ডের নাম দিয়েছিলেন টেলিভাইজর। স্কটিশ বিজ্ঞানী জন লোগি বেয়ার্ড যখন সর্বপ্রথম টেলিভিশন উদ্ভাবন করেন তখন তা বানাতে ব্যবহার হয়েছিল পুরনো হ্যাটের বাক্স, এক জোড়া কাঁচি, কয়েকটা মোটা সুঁই, বাইসাইকেলের লাইটের লেন্স, চা পরিবহনের বাক্স, আঠা আর একটু মোম।

বেয়ার্ড যখন টেলিভিশন উদ্ভাবনের ঘটনাটি তত্কালীন সব পত্রিকা জানাতে চাইল, তখন কিছু পত্রিকা মানতেই চায়নি যে কোনো রকমের তারের সংযোগ ছাড়া একটা বাক্সের মতো জিনিসে নানা রকমের ছবি দেখা যাবে। দি ডেইলি এক্সপ্রেস পত্রিকার কাছে প্রচারের জন্য গেলে বেয়ার্ডকে পাগল বলে জোর করেই অফিস থেকে বের করে দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিভিশনটি স্যামসাংয়ের তৈরি ১০৫ ইঞ্চি ইউএইচডি বাঁকানো ডিসপ্লের। টিভিটির দাম প্রায় দেড় লাখ ডলার।

যদিও টেলিভিশন উদ্ভাবন হয়েছে ১৯২৬ সালে, কিন্তু টেলিভিশন শব্দটির উত্পত্তি হয়েছে ১৯০৭ সালে। আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে ২২ বছর পর্যন্ত যন্ত্রটি টেলিভিশন নামেই পরিচিত ছিল। টেলিভিশনের সংক্ষিপ্ত রূপ টিভি শব্দটি প্রথম ব্যবহার শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। বিশ্বের প্রথম টিভি বিজ্ঞাপন ছিল বুলোভা ঘড়ির। ১৯৪১ সালের জুলাই মাসে একটি বেসবল খেলার মাঝখানে বিজ্ঞাপনটি প্রচার করা হয়। প্রচারে খরচ হয়েছিল ৯ ডলার।

যুক্তরাজ্যের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশটিতে মোট টেলিভিশনের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি ছিল। আমেরিকায় ৯৯ শতাংশ পরিবারের অন্তত একটি করে আর ৬৬ শতাংশ পরিবারের অন্তত তিনটি করে টিভি সেট আছে। তবে কেবল লাইনের জন্য বিল দেয় মাত্র অর্ধেক জনগণ। ইদানীং যত স্লিম বা চিকন টিভি বাজারে আসছে তার কোনোটিই কিন্তু সিআরটি প্রযুক্তিতে বানানো সম্ভব নয়। অর্থাত্ যদি সিআরটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো, তাহলে টিভি সেটের স্ক্রিন যতটুকু বড়, পেছনেও ঠিক ততটুকু জায়গা চওড়া রাখতে হতো। ফলে একটি টিভি সেট ফিট করতেই ঘরের সব জায়গা শেষ হয়ে যেত। প্রথম রিমোট কন্ট্রোল আবিষ্কার করা হয়েছিল ১৯৫৫ সালে, যার নাম ছিল ফ্ল্যাশম্যাটিক।

প্রথম যে টিভির রিমোট আবিষ্কার করা হয়েছিল সেটা তারের সাহায্যে চলত। রিমোটে লাগানো তারটি লম্বা ছিল বলে দূর থেকে চেয়ারে বসেই চ্যানেল পরিবর্তন করা যেত। ব্যাপারটা ছিল এখনকার ইউএসবি মাউসগুলোর মতো। আর সেই তারযুক্ত রিমোট কন্ট্রোলই তখন বিক্রি হয়েছে কয়েল লাখ পিস। আমেরিকায় বেশির ভাগ লোকজনই এখন টিভি শোগুলো স্মার্টফোনের স্ক্রিনে দেখে থাকে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, স্মার্টফোন সারাক্ষণ তাদের হাতের মুঠোয় থাকে।

একটা গল্প ছড়িয়ে দেয়া যেমন মানুষের একটি অন্যতম নেশা তেমনি ইতিহাস ধরে রাখাও মানুষের আর এক নেশা। ১৮৫৭ সালে এ্যাডওয়ার্ড লিওন স্কট ডি মার্টিনভিল শব্দ রেকর্ড করতে সক্ষম হলেন। কাগজে রেকর্ড হল শব্দ। কিন্তু রেকর্ড করা সেই শব্দ শুনার ব্যাবস্থা করা গেল না। ১৮৯৪ সালে কলকাতার টাউন হলে জগদীশ চন্দ্র বসু বিনা তারে তরঙ্গ পাঠিয়ে অদূরবর্তী একটি ঘন্টা বাজিয়ে দেখান সবাইকে। কিন্তু এর পেটেন্ট তিনি করেননি। ১৮৯৫ সালে মার্কনী একটি যন্ত্র তৈরী করেন যা ২.৪ কি.মি. দূর পর্যন্ত তরঙ্গ পাঠাতে পারে। পরে ১৯০০ সালে মার্কনী রেডিওর পেটেন্ট করে নেন। তাই জগদীশ বাবু আবিষ্কারক হয়েও পেটেন্ট না করায় তাঁকে অফিসিয়ালি রেডিওর আবিষ্কারক বলা হয় না। রেডিওর মাধ্যমে কথা ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হল দূর থেকে দূরে। মানব সভ্যতার প্রথম বিস্ময়কর যন্ত্র রেডিও।

১৮৩২ সালে হারকিউলিস ফ্লোরেন্স ক্যামেরার ছবি ধরে রাখা নিয়ে কাজ করেন। যদিও তিনি তা প্রকাশ করে যাননি। ১৮৮৪ সালে ২৩ বছরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধারণা করে যে ভিডিও সিগনাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো সম্ভব। পল গটলায়েব নিপকো নামের সেই ছেলেটি তখন এর পেটেন্টও করে ফেলে। কিন্তু তখন পর্যন্ত এম্পিফাইড টিওব তৈরী না হওয়াতে কিছুতেই তিনি পেটেন্টে করা যন্ত্র বানাতে সক্ষম হননি। পরে নিপকোর’র ধারনা অনুযায়ী কাজ শুরু করেন স্কটিশ বিজ্ঞানী জন লজি বিয়ার্ড।

১৯২৫ সালে তিনি লন্ডনে টেলিভিশনের প্রথম ছবিটি দেখাতে সক্ষম হন। তারহীন শব্দ পাঠিয়ে মার্কনী যে রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন ১৯০০ সালে তা তো আর নতুন করে আবিষ্কার করার কিছু নাই। লজি বিয়ার্ড তারহীন ছবিও পাঠাতে পারলেন। এখন অপেক্ষা শুরু হলো ছবি ও শব্দের সমন্বয়ে একটা যন্ত্র কে বানাবে। ফিলু ফার্ণসওর্থ নামের মাত্র ২১ বছরের এক মার্কিন বিজ্ঞানী তা করে দেখালেন। বেশীরভাগ মানুষই লজি বিয়ার্ডকে টেলিভিশনের আবিষ্কারক জানেন। কথা সত্য। কিন্তু বাস্তব টেলিভিশন বলতে যা বুঝায় তার জনক বলে কেউ কেউ মনে করেন ফার্ণসওর্থকে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটা কাঁচের বাক্সে আলো ধরে তা অন্য বাক্সে কিভাবে পাঠানো যায়। তার সেই স্বপ্ন আজ রঙ্গীণ হয়ে ধরা দেয় কোটি কোটি ঘরে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষে ও সময়ের দাবিতে বাংলাদেশেও এখন টেলিভিশন যন্ত্রটি গণমাধ্যম হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। দৈনন্দিন খবরাখবর ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও টেলিভিশনের গুরুত্ব অপরিসীম। যারা টেলিভিশনের সংবাদ ও অনুষ্ঠানের পথ প্রদর্শক, তারা বহু নতুন দিগন্তের পথ উন্মোচণ করেছেন। অবিরাম পরিশ্রম করেছেন এবং করছেন। প্রযুক্তির প্রথাকে কাজে লাগিয়ে তারা সময়কে করে দিয়েছেন আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক। সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি এই দিনে রইলো বিশেষ শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।।

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সিনিয়র সাংবাদিক।।jsb.shuvo@gmail.com


External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান