বাঙালী পাড়ার গ্রোসারীর অভিজ্ঞতা !

Sun, Nov 19, 2017 11:06 PM

বাঙালী পাড়ার গ্রোসারীর অভিজ্ঞতা !

স্নেহাশীষ রায় : আমি মূলত: উনার গ্রোসারীতে বাজার করতাম। তাজা শাক্-সবজীর পসরার জন্য। ধার্মিক বেশ-ভূষা। ক্রেতাদের সাথে ব্যবসায়ীরা সাধারণত: হাসি মুখে কথা বলে, তা ক্রেতা যতই অপরিচিত হোক না কেন। কিন্তু ভদ্রলোককে কখনো আমি হাসতে দেখি নি। অন্যসময় হাসে কিনা জানি না, আমার ভদ্রলোকের হাসিমুখ দেখার সৌভাগ্য হয় নি। এমন গোমরা-মুখ বিক্রেতা, কানাডার মতো ভোক্তা-অধিকারের দেশে পাওয়া দূর্লভ।

কিন্তু যেহেতু গ্রোসারীটি আমার নিবাসের কাছে, তাই তার রাম-গরুড়-বদনটি উপেক্ষা করে যেতাম।

একটা লোক তার দোকানে কাজ করতো। লোকটি আফ্রিকার কোন দেশের। অত্যন্ত গোবেচারা টাইপের। কাজ করতে গিয়ে কি একটা ভুল করলো। আমার সামনেই, লোকটিকে ভৎর্সনা করলো উক্ত গ্রোসারীর মালিক। মূহুর্তেই কর্মচারীটির মুখটি বিমর্ষ হয়ে উঠলো। আমার কাছে মনে হলো, এই লোকটি এখানে কাজ করে কেন? হয়তো, সে নতুন ইমিগ্র্যান্ট , ছাত্র অথবা অন্য কিছু।খুব সম্ভবত: নগদে ,গোপনে কাজ করে, তাই খুব বেশী রাস্তা খোলা নেই।

এবার গ্রোসারীতে আসা , দোকানীর পরিচিত ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে, তার অভব্য আচরণ , জাস্টিফাই করতে শুরু করলেন, বাংলায়। " নিজের দেশে নাকি স্কুলে পড়াতো, সামান্য হিসাব করতে পারে না।"

আমার বাবা-মা স্কুল শিক্ষক ছিলেন। অপরিচিত দেশের এক, অপরিচিত এক স্কুল শিক্ষকের অপমানে আমার খারাপ লাগলো।

আমি খুব তাজা-সবজীর পসরা সাজানো সেই গ্রোসারী মালিকের দোকানটি পরিহার করা শুরু করলাম, নিরবে। পাশের গ্রোসারীতে যাই। দোকানের মালিক -কর্মচারীদের সাথে খোশ্-গল্প করে করে বাজার করি। আজও ওখানে বাজার করছিলাম। কোন একটা আইটেম এই দোকানে ছিল না। অগত্যা আমার প্রাক্তন গ্রোসারীতে যেতে হলো। মনে মনে কামনা করছিলাম, রাম-গরুড়ের ছানার সামনে যেন না পরে যাই।

ঢুকলাম সেই গ্রোসারীেতে। দেখলাম সে নেই। আইলে ঢুকে , আমার দ্রব্যটি খুঁজছি।

আমার পেছন থেকে একজন বলে উঠলো, "ভাই একটু বাইরে আসেন তো"।

পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি, সেই আমার প্রিয় গ্রোসারী-কিং! আমি যে আইলে দ্রব্যটি খুঁজছিলাম, সেই আইল থেকে সরে আসার আদেশ দিচ্ছে।

ক্রেতা যখন কোন আইলে ঢুকে বাজার করে, বিক্রেতা তখন অপেক্ষা করবে ক্রেতার কাজটি শেষ হওয়া পর্যন্ত। এটিই সভ্য সমাজের নিয়ম। যদি খুব ইমার্জেন্সি কিছু হয়, তবে অনুরোধ করবে।

ভাবলাম, বেচারা ভদ্রলোকের অভিধানে, প্লিজ শব্দটি নেই। সরে এলাম।

এবার তিনি এক বাঙ্গালী কর্মচারীকে উক্ত আইলে ডেকে আনলেন। তারপর কিছু একটা ভুলের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভর্ৎসনা শুরু করলেন। পরিশেষে জানালেন, কারো আশায় সে ব্যবসা করে না। তাই কোন কর্মচারীই অপরিহার্য নয়।

আমি জিনিসের দাম দিয়ে বেড়িয়ে এলাম। ভাবছিলাম। এই লোকটি এখন অগাধ টাকার মালিক। কিন্তু আচরণের যে দীনতা কেমন করে কাটবে?

তিনি অত্যন্ত ভদ্রলোকের দেশে দীর্ঘ কাল ধরে আছেন। একটা প্রধান ধর্মের আচার পালনে বদ্ধ পরিকর। ধর্মীয় বাণী অথবা ভদ্র মানুষের সাহচর্য অথবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিছুই যথেষ্ট নয়। এই আচরণের দীনতা যেন দূর হবার নয় ।

আমাদের দেশে তবে কি, প্লিজ, থ্যাংক ইউ, সরি, এই তিনটি শব্দের ব্যবহার শেখানোতে প্রবল ঘাটতি রয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক মন্ডলে যদি, অন্তত: এই তিনটি শব্দের ব্যবহার ঠিক ঠাক হতো, তবে কি আমরা আরেকটু ভালো রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেতাম না?

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট


External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান