লাল সালুর মজিদ কেনো আমার মানচিত্র গ্রাস করবে ?

Mon, Nov 13, 2017 12:46 AM

লাল সালুর মজিদ কেনো আমার মানচিত্র গ্রাস করবে ?

শেখ শামসুন্নাহার ইতি: প্রথম যখন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাংলাদেশে দেখি ,আব্বার চিৎকার দেখে ভয় পেয়েছিলাম। আমার জন্মের আগে থেকেই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিষিদ্ধ ছিল, ১৯৭৫ এর পর অলৌকিক ভাবেই আরো অনেকের মতোই আব্বা বেঁচে যান! সেই গল্পও পুরাতন !  প্রিয় নেতার ডাকে যিনি সন্তান – সংসার তুচ্ছ করে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, সেই নেতার মৃত্যু বিভীষিকা , তার পরবর্তী ভয়ংকর সময় পাড়ি দেয়া মানুষটার  কান্না আমি আজো শুনতে পাই। যখন দেখি আমার মানচিত্রে মৌলবাদের বীভৎস নিরব আগ্রাসন ।

হ্যাঁ , খুব সত্যি , আমাকেও – আমার মতো দেশছাড়া , বিদেশের মাটিতে শিকড় গাঁরাদের গালি দেওয়া হয় সুবিধাবাদী বলে। কিছুই মনে করি না তাতে, কেউ যদি আমাদের গালি দিয়ে শান্তি পায় , তবে পাক। কিন্তু যখন ১৯৭১ এর রক্ত ভেজা বাংলাদেশর মাটিতে হিন্ধু – মুসলমান ঐক্যের কথা বলাতে,.১৯৭১ এর সংবিধানের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে মনে করিয়ে দেয়ার অপরাধে  আমাকে “কাফের” বলে গালি দেয়া হয় , তখন আমি আতংকিত হই আব্বার কান্না আমি শুনতে পাই।

কেন আমার বাংলাদেশে শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার অপরাধে ভিটা আগুনে পোড়ে ?? কেন আজ ধর্ম নিরপেক্ষতা নিষিদ্ধ “ শিরকই” গুনাহ ? ১৯৭১ সালে কি ধর্ম ছিল না ?  মসজিদে এসে যারা মুসলমান নারী ধর্ষণ করেছিল তারা তো মুসলমানই ছিল , তাই না ? আজ এত্ত বড় সাহস সেই মাটিতে “ ফতোয়া “ দেয় ধর্ষিতা নারীরা ছিল “ গণিমতের মাল” !!! বলি , ১৯৭১ সালে আমার দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিল ; এখন কি সেই রক্তের পুরুষেরা সব নপুংসক হয়ে গেছে ? ? বুঝলাম নারী মানেই সত্যি কথা বললে পৃথিবীর সব নিকৃষ্ট ভাষায় তাদের কুৎসিত ভাবে গালাগালি করা হয় বাংলাদেশে এখন এইটা নতুন সংস্কৃতি !!!! বাহ ! বাহ ! বাহ!  নারী মানেই মাথায় হিজাব না দিলে , ধর্ম – নিরপেক্ষতার কথা বললে , অশ্লীল ভাষায় দল বেধে তাকে আক্রমন করা হয়।

কিন্তু, এই জন্য কি শুধুই রাষ্ট্রযন্ত্র দায়ী ? এক “ শেখ হাসিনা” প্রধানমন্ত্রী হয়ে এমন পাপ করেছেন যে , এখন উনার ও পিন্ডি চটকাতে হবে ? জানি , অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর দায় আছে, আমি একমত। কিন্তু, ইতিহাস থেকে কি আমরা কোনো শিক্ষা নিয়েছি ? বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বলেছিলেন , “ আমার কম্বল কই “?  তিনি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন , তার চারপাশের চোর বাটপারদের হরির লুট , কতোটা কষ্ট নিয়ে তিনি এই কথা বলে ছিলেন ? আজ যখন সারা দেশে “ মায়ানমারের” মুসলমানদের জন্য এতো মাতম , আমাদের বুকফাটা কান্না , তখন “  দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকা রংপুরের হিন্দু বাড়ীগুলোর দিকে তাকানো যায় না। আহাজারী করে ক্রন্দনরত মহিলার ছবিটার দিকে আপনি কতোক্ষণ চোখ রাখতে পারছেন? পারছেন কি?” এই লেখা আমাকে পড়তে হয় কেন? ইউনিভার্সিটির শিক্ষিত , পিএইচ ডি ডিগ্রী ধারী ভাইবোনেরা যেই অনলাইন সাইটে ছিলেন , সেখানে  ধর্ম – নিরপেক্ষতা নিয়ে  লেখা নিষিদ্ধ করা হল , তখন এই শিক্ষিত মানুষেরা চুপ ছিল কেন ? আজকে যখন হিন্দু বাড়ীতে আগুন এখন ও আমরা দলে-বলে নীরব থাকবো !!! “কোন কথা বলিবনা , নিজের গা টি বাঁচাইয়া , ঘরে বসিয়া ভারতীয় হিন্দি সিরিয়াল দেখিব আর মালাউন-মালাউন বলিয়া গালি দিব”- তাই তো , তাই না ??? অসুবিধা কি ? দুনিয়ায় গাড়ি – বাড়ি থাকিবে, হিজাবী বউ থাকিবে আর আখেরাতে বেহেস্ত !! আমাদের আর পায় কে ?

বাংলাদেশের বর্তমানের যে সামাজিক অবক্ষয় হচ্ছে , তা কি শুধুই গরীব মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য ? ধনী শ্রেণীর স্বার্থবাদী মানুষ নামের  সুবিধাবাদীদের জন্য কি না ? প্রধানমন্ত্রী কি ঘরে ঘরে গিয়ে বলে দিয়েছেন যে তোমরা ধর্ম – নিরপেক্ষতাবাদ কে কুফুরী বল ? বলেছেন এই কথা ?

হ্যাঁ , খুবী সত্যি আমি নিজেই উনার অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কে সমর্থন করি না। সত্যি কথা বলতে কি , আমি সাধারন মানুষ ; রাজনীতির কৌটিল্যের জটিল নীতির সাথে বাস্তবতার ব্যবধান এ জগতে ছিল-আছে – থাকবে এই অমোঘ নীতির বাইরে রাষ্ট্র নামের যন্ত্রটি যেতে পারেনি, পারবেও না । আর তাই সেই সব নীতি নিয়ে আমি আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর নিতে যাবো না।

কিন্তু, সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি খালি চোখে এটা পরিষ্কার দেখতে পাই যে ইতিহাস আজ উল্টো পথে হাটছে যার শুরু হয়েছে ১৯৭৫ সালে। বাংলাদেশ কে বাংলাস্থান বানানোর পরিকল্পনায় সচেতনে – অচেতনে আমার দেশের মাটিতে আজ “ আম্মিজান” পাকিস্তান, ইসলামের নামে “ লাল সালুর “ মজিদের আবার ও খুব ঘটা করে আবির্ভাব হচ্ছে ( লালসালু সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ রচিত একটি উপন্যাস। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে।)। ভন্ড পীরের আখড়া হচ্ছে আজ আমার বাংলাদেশ! বুঝলাম গ্রামের লোক অশিক্ষিত, কিন্তু শহরের শিক্ষিত মানষ যখন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানের ডিগ্রী নিয়ে হুযুরের তাবিজ – কবজ গলায় নিয়ে হাঁটেন তখন শুধুই “শেখ হাসিনা” এই জাতিরে মানুষ করবে কি দিয়ে ? 

আমি বিষয়টা নিয়ে পরিষ্কার  বলতে চাই, আমাদের দেশের মুল শত্রু এখন এই নীরব মৌলবাদী মানসিকতা । এই ভয়ংকর দৈত্যের হাত থেকে মুক্তি না পেলে , সাবেক বিচারপতি “এস কে সিনহা” স্যার কে কানাডার  মাটিতে এসে উঠতে হবে, দেশে হিন্দু বাড়ীতে আগুন জ্বলবে , মৌলবাদী শক্তির ভোট ব্যাঙ্কের কাছে গণতন্ত্র আছাড় খেয়ে পড়বে ! আমাদের “ হায় গণতন্ত্র! হায় গণতন্ত্র!” বলে  মাতম করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না ।

 পুনশ্চঃ “যে গাছে গোড়ায় বিষ তার আগা ছেটে কি হইবে? সামাজিক এই অবক্ষয় সবাই মিলে রোধ না করে শুধুই একজনের পিণ্ডি চটকিয়ে কি হবে”? আমি কিন্তু, কিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর দায় এড়ানোর কথা বলছি না; উনাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে উনার জায়গা থেকে। কারন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়িত্ত সরকারের। কিন্তু, কারা এই রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতার চেষ্টা করছে , কোন সাহসে , তারই অদৃশ্য জালের কথা বলছি... ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি আজ কেন আবার সূক্ষ্ম চালে প্রভাব ফেলছে রাষ্ট্র যন্ত্রের ছায়ায়?

আসুন সবাই আমাদের বিবেকের সামনে দাড়াই, সেখানকার  “মজিদ” কে আগে তাড়াই ।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান