বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিসেবে বেড়ে উঠার  অভিজ্ঞতা

Sun, Nov 12, 2017 1:53 AM

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিসেবে বেড়ে উঠার  অভিজ্ঞতা

স্নেহাশীষ রায় : ১.বঙ্গবন্ধুকে যেদিন হত্যা করা হয়, বাবা বাড়ীতে নেই, কাজে দূরে কোথাও গেছে। ভোর হলো, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লো। আমার মা ভীত। যাঁরা পাকিস্তান আমলে বেড়ে উঠেছে, মুক্তিযুদ্ধ সহন করেছে, তাঁরা জানে কিছু ঘটলেই প্রথম কোপটি যাবে হিন্দুদের উপর। আমার মা, তার মূল্যবান যা কিছু ছিল, সবকিছু একত্রিত করলো , কি জানি যদি পালাতে হয়। আমাদের পড়শী এগিয়ে এলেন অভয় দিতে। দুষ্কৃতিকারী নিহত হয়েছে। হিন্দুদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

জিয়ার হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লো। কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। মা আবার দ্রুত স্কুল থেকে বাড়ী ফিরে এলো। আবার প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখতে শুরু করলো। আবার যদি পালাতে হয়। জিয়ার মৃত্যুদিনে , আমার মায়ের উদ্বিগ্ন মুখটি এখনো চোখে ভাসে।

আমার ছোটবেলায়, আমাদের বাড়ীর অদূরেই ধর্ম সভা হতো। প্রতিবারই হতো। একবার ধর্মসভার আগের দিন, রটনা হলো, এক তুখোর বক্তা আসবেন। যিনি এক হাতে কোরান, অন্য হাতে গীতা নিয়ে বক্তৃতা করেন। এবং তার ওয়াজে, জনতা এতটাই উদ্বেলিত হয়, যে অনেক স্থানে হিন্দুদের বাড়ীতে হামলার ঘটনাও ঘটে।

মা-বাবার মুখে শংকার ছাপ। হিন্দু পাড়ায় থমথমে ভাব বিরাজ করছে। অদ্ভুত শংকা আমার মাঝেও ভর করলো। রাত নয়টার দিকে মহসিন-দার আম্মা লোক পাঠালো। গৌরী কি, ভয় পাচ্ছে? ভয় পেলে যেন, রাতটা আমরা তাঁদের বাসায় কাটাই। আমি সারা রাত শুয়ে শুয়ে জেগেছিলাম।

একানব্বই সালে, বাবরী মসজিদের দাঙ্গার সময় আমি আনন্দমোহন কলেজে পড়তাম। অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙ্গছে, চারদিক থমথমে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী, যারা প্রতিদিন আমাদের বাসায় আসা যাওয়া করতো , তারা অজানা কারণে নিরব হয়ে গেল। এমনকি শিশুরাও এদিকে এলো না। সেই একাকীত্বের কথাটি আজো আমার মনে পড়ে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিসেবে বেড়ে উঠা এক অভিজ্ঞতা। ঠিক এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না গেলে, অনুভব করা সম্ভব নয়, কখনো কখনো নি:সঙ্গতা কতটুকু পীড়ার কারণ হতে পারে।

ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে যখন বাংলাদেশ হলো। তখন, আমার বাবার শরণার্থী জীবন শেষে, কোলকাতায় প্রায় একটা চাকুরীর ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবা না এলেও পারতেন। তিনি ফিরে এলেন, কারণ বাংলাদেশ ছিলো এক স্বপ্নের নাম। আমার পরিবার ভেবেছিল, পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িকতার দৈত্যটি বোধ হয়, চিরতরে বোতলে ঢুকানো গেছে। ধর্ম নিরেপক্ষ সংবিধান তৈরী হলো। কিন্তু একটা জাতিকে একটা স্যেকুলার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, তার ছিঁটে ফোঁটাও ছিল না।

শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ আমলে পাঠ্যপুস্তকে প্রধান যে পরিবর্তনটি এলো, সেটি হলো জাতির পিতা হিসেবে জিন্নাহ-র বদলে বঙ্গবন্ধু। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সুদুর প্রসারী কোন পরিকল্পনা নেই।

যদিও ধর্মনিরপেক্ষ , প্রো-কম্যুনিষ্ট সংবিধান। সরকারের পররাষ্ট্র নীতিও ছিল পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। ইসলামী সদস্য সংস্থার সদস্য পদ পেতে মরিয়া হয়ে উঠে তখনকার সরকার। ৭১ সালের গণহত্যার অন্যতম নায়ক জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে চুয়াত্বর সালে তোলা হাস্যোজ্জ্বল ছবিটিই, সেই সময় আমাদের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোটিকে স্পষ্ট জানান দেয়।

তারপর বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো। এরপরের ইতিহাস তো সবারই জানা। বাংলাদেশ যেন হাঁটতে থাকলো, কি করে এক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। অন্যদিকে,শুদ্ধতম ইসলাম প্রচারের জন্য, পেট্রো ডলার প্রবেশ করলো আমাদের দেশে। আমাদের দেশের মানুষের যে ইসলামের চর্চাটি করতো, তার রঙও বদলাতে শুরু করলো। ৭৫ সালের পর দীর্ঘ তিন যুগে , মানুষের মনোজগতে এক ভীষণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ই মে , যাঁরা স্যেকুলার রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতো, টের পেলো তারা আসলে কতটা সংখ্যালঘু।

আওয়ামী লীগ ঠিক বুঝে গেলো, আসলে কি ঘটেছে। মূহুর্তে তারা ভুল পাল্টালো। মুক্তিযুদ্ধের ধর্ম নিরপেক্ষতা, এক মৃত ঘোড়ার নাম।

মুক্তিযুদ্ধের যে উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠিত হয়েছিল, তার অনেকটাই আসলে ব্যর্থ হয়েছে। আধুনিক স্যেকুলার রাষ্ট্র গঠনের পরিবর্তে , আমরা মূলত: আরেকটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে।

হয়তো খুব অল্প মানুষই আছে, যাঁরা এই কুৎসিত ঘটনাটি ঘটায়। বাকীরা লজ্জিত হয়। নিন্দা জানায়। কিন্তু বারবার এই ঘটনাগুলো ঘটে। যে সরকারই থাকুক, পদক্ষেপ নেয়। তারপর একদিন সবাই ভুলে যায়। আবার ঘটে। এবং নিশ্চিত করে আবার ঘটবে। তাই , সংখ্যালঘুরা নিরবে নিভৃতে পালিয়ে যাওয়া রাস্তাটি খুঁজতে থাকবে। বারাকত স্যারের গবেষণাটি কি আমি জানি না। তবে সাধারণ অংক জানি। হিন্দুদের মনে অবস্থা বুঝতে পারি। আমি শংকা বোধ করি, এ শতকের মাঝামাঝিতে হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় নি:শেষিত হয়ে যাবে বাংলাদেশ থেকে।

এবার আমাদের বাড়ীর দূর্গা পূজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলো, আমাদের প্রতিবেশী মুসলিম বড় ভাই। আমার অসংখ্য বন্ধু মুসলিম। আমি জানি, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি মন থেকে ঘৃণা করে। তারা ব্যথিত। তারপরও কেনো ঘটছে, ঘটনাগুলো?

তার প্রধান কারণ হলো, আমাদের সকলের মৌলবাদকে "না' না বলার অক্ষমতা। আমাদের একটি স্যেকুলার রাষ্ট্র তৈরী না করতে পারার ব্যর্থতা।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হয়তো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ঘৃণা করে। কিন্তু একই সাথে অধিকাংশ মানুষই এক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের পক্ষে। আপনি যদি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রকে "না' না বলেন, তবে আপনি যতই অসাম্প্রয়দিক মনোভাব পোষণ করেন না কেন প্রকারান্তরে আপনি , যারা মন্দির ভাঙ্গে, যারা হিন্দুদের বাড়ীতে আগুন দেয়, তাদের জন্য ক্ষেত্রটি প্রস্তুত করতে সাহায্য করছেন।

ধর্মীয় মৌলবাদ এক সংস্কৃতি। যেখানে সহনশীলতার কোন স্থান নেই। যেখানে অন্যের মতবাদ সমভাবে সম্মান করার কোন স্থান নেই।

ধর্মীয় মৌলবাদ একটি স্পেক্ট্রাম , যার এক পাশে অতি নিরীহ মৌলবাদ, অন্য পাশে উগ্রবাদী মৌলবাদ। মৌলবাদের এই পিরামিডের উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বাংলাদেশ।

যতদিন আধুনিক স্যেকুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে বাংলাদেশ সক্ষম হবে না, আমরা যতই লজ্জিত হই না কেন , যত দু:খই পাই না কেন, ততদিন মন্দির-গীর্জা-প্যাগোডা ভাঙ্গবে, লংদু-সাঁওতাল-গঙ্গাচরে আগুন জ্বলবে। আমরা দু:খ পাবো, কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিশ্চিতভাবে নি:শেষিত হবে।

আর বাংলাদেশের প্রায় অর্ধ-শতাব্দীর নি:সঙ্গতার মাঝে, এদের জেগে উঠার কোন দ্বিতীয় সুযোগ থাকবে না।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান