বাংলাদেশে যা হচ্ছে, সেটি কি তবে ‘হিন্দুফোবিয়া’?

Sat, Nov 11, 2017 1:25 AM

বাংলাদেশে যা হচ্ছে, সেটি কি তবে ‘হিন্দুফোবিয়া’?

শওগাত আলী সাগর: ১. দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকা রংপুরের হিন্দু বাড়ীগুলোর দিকে তাকানো যায় না। আহাজারী করে ক্রন্দনরত মহিলার ছবিটার দিকে আপনি কতোক্ষণ চোখ রাখতে পারছেন? পারছেন কি?

পারার কথা না। আমি পারি নি। কতোবার যে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়েছি। দীর্ঘ ক্ষণ তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করেছি। পারিনি। বারবারই ছবিগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। সেখানে ভেসে ওঠেছে বাংলাদেশের মানচিত্র। মনে হয়েছে, বাংলাদেশের মানচিত্রজুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। মনে হয়েছে, বাংলাদেশ আহাজারী করে কাঁদছে।

আসলে কি বাংলাদেশ কাঁদছে? আসলে কি বাংলাদেশ এখন কাঁদে? হিন্দু বাড়ীতে আগুন লাগলে, হিন্দু নারী নির্যাতিত হলে বাংলাদেশ কি সত্যিই এখন কাঁদে। হিন্দুই বলি কেন? নাগরিকের যন্ত্রনা কি এখন বাংলাদেশকে স্পর্শ করে?

স্পর্শ করলে রংপুরের ঘটনা কিভাবে ঘটে?

২. উত্তেজনাটা চলছিলো কয়েক দিন ধরেই। তা হলে রংপুরের প্রশাসন কি করেছে? রাজনৈতিক দলগুলো কি করেছে? সাংস্কৃতিক কর্মীরা কি করেছেন? স্মৃতি বলি, কিংবা অভিজ্ঞতা বলি, নাসিরনগরের দৃষ্টান্ত তো আমাদের সামনে ছিলোই। তা হলে? নাসিরনগরের ঘটনাও ঘটেছিলো ফেসবুক পোষ্টকে কেন্দ্র করে। এবারও ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করেই যখন উত্তেজনা, তখন কারো মনেই নাসিরনগরের স্মৃতি হানা দেয়নি? দেয়নি- এ কথা কিভাবে বিশ্বাস করি? তা হলে আমরা সবাই মিলেই কি ঘটনা ঘটতে দিয়েছি?

৩. চিকিৎসক, শিল্পী গুলজার হোসেন উজ্জল ফেসবুকে নিজের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে লিখেছেন, “বাংলাদেশ যে একটা মুসলিম অধ্যুষিত বার্মা সেটা আমরা স্বীকার করবনা। স্বীকার করলেই ব্যপারটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।

বার্মা যেটা আর্মি দিয়ে করায় আমরা নিজেরাই সেটা করি। আস্তে আস্তে থেমে থেমে। তবে এটা স্বীকার করা যাবেনা। স্বীকার করলেই আমাদের মাহাত্ম্য শেষ।

সমস্ত মানব জাতির ভেতরই একখন্ড বার্মা বাস করে। এবং সকল সংখ্যা লঘুই হয় এক একজন রোহিংগা। পোড়া ঘরের ছবিও একইরকম। আহাজারি করা মানুষের চেহারাও প্রায় এক। তাই একই ছবি আপনি চাইলে রোহিংগা, ইয়েমেনী, রংপুরিয়া হিন্দু সবার ক্ষেত্রেই ব্যাবহার করতে পারবেন।

শুধু স্বীকার করবেননা। কেউ কিছু বললে ত্যানা প্যাঁচাবেন।”

৪. সংখ্যালঘু শব্দটা আসলে কি? এর অর্থ কি? সংখ্যালঘু কি সীমান্তভেদে ভিন্ন হয়ে যায় না? সীমান্তের এই পাড়ে যারা সংখ্যালঘু তারাই কি সীমান্ত পেরুলে সংখ্যাগুরু হয়ে যায় না?  বাংলাদেশে যেই মুসলমানরা সংখ্যাগুরু, ভিন্ন সীমান্তে তারাই কি সংখ্যালঘু না? কানাডাতে, পশ্চিমের দেশগুলোতে মুসলমানদের নিয়ে কেউ কোনো কথা বললেই আমরা বলতে শুরু করি- ‘ইসলামোফোবিয়া’। দেশের সরকার, প্রশাসনও ‘ইসলামোফোবিয়া’র বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। কানাডার কোনো কোনো প্রদেশে তো ‘ইসলামোফোবিয়া’র বিরুদ্ধে আইন পর্যন্ত হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে যা হচ্ছে, সেটি কি তবে ‘হিন্দুফোবিয়া’?

৫. ফেসবুকে কে কি লিখলো তাতেই  কি ধর্মের অবমাননা হয়ে যায়? ধর্ম কি এতোটাই ঠুনকো? বিশ্বাসীরা তো বিশ্বাসই করেন- ধর্ম এসেছে স্রষ্টার কাছ থেকে, মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, মনে প্রাণে মানেন- ধর্ম হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান।  স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার দেওয়া বিধান কি তার সৃষ্টির আচরনে হেয় যায়? যেতে পারে? আর স্বয়ং আল্লাহ যে ধর্ম পাঠিয়েছেন, সেই ধর্ম কি তার অবমাননার শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব ‘সৃষ্টি’কে দিয়েছে? তা হলে?

বিশ্বাসীরা বলেন, ধর্ম হচ্ছে কল্যাণের পথে মানুষকে ডাকার একটি পথ। তাই যদি হয়, সেই ধর্ম নিশ্চয়ই কারো বাড়ী ঘর পুড়িয়ে দেওয়াকে সমর্থন করে না। ধর্মের নামে মানুষ হত্যাকে সমর্থন করে না! ধর্ম নিয়ে যারা কাজ করেন, যারা ধর্মীয় নেতা- তারা কি কখনো সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়েছেন- এইসব বর্বরতার বিরুদ্ধে? নাসিরনগরের ঘটনার পর দেশের ওলামারা কি সেম্মিলিতভাবে বলেছেন-ইসলামের নামে এইসব বন্ধ করো। রংপুরের ঘটনার পর কি তারা সমস্বরে বলবেন, ইসলামের নামে এই ধরনের সহিংসতা বন্ধ করো।

৬. কানাডায় মুসলমানরা সংখ্যালঘু। বিভিন্ন সময় দেখেছি, রাতের অন্ধকারে ভেঙ্গে দেওয়া মসজিদের পূণনির্মানের দায়িত্ব নিচ্ছে খ্রীষ্টানদের চার্চ। ‘ফার রাইটিস্ট গ্রুপ’গুলো যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো সভা ডাকে, সেখানে সংখ্যায় তাদের চেয়ে বেশি সংখ্যক ভিন্নধর্মাবলম্বীরা মুসলমানদের পক্ষে দাড়িয়ে যায়। তারা তো বলে না, মুসলমানের পাশে আমি দাঁড়াবো না।বাংলাদেশেও প্রতিটিঘটনা ঘটে যাওয়ার পর মুসলমানরাই পাশে দাড়ান। যারা পাশে দাড়ান তাদের সিংহভাগই নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়েও মানুষ হিসেবেই বেশি ভাবেন।

রংপুরের ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগে সেই মানুষরা কোথায় ছিলেন?

লেখক: শওগাত আলী সাগর, নতুনদেশ এর প্রধান সম্পাদক


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান