আমার মেয়েরা কি তবে একটি বাংলাভাষী পাকিস্তানে বাস করবে?

Fri, Nov 10, 2017 9:56 PM

আমার মেয়েরা কি তবে একটি বাংলাভাষী পাকিস্তানে বাস করবে?

ইমতিয়াজ মাহমুদ: দায়টা সরকারের, দায় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। এমনিই তো সাংবিধানিকভাবেই তো সরকার দেশের সকল মানুষের জীবন ও জান মালের নিরাপত্তা বিধান করার কথা। না পারলে তো সেটা সরকারেরই ব্যার্থতা। আর সরকারের ব্যার্থতার জন্যে প্রধানমন্ত্রীকে দায়টা নিতে হয়। কিন্তু কেবল এইসব আইনি বা নৈতিক দায়িত্বের ব্যার্থতার জন্যেই আমি এটিকে সরকারের বা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দায়ের কথা বলছি না। এই যে রংপুরে মুসল্লিরা মানুষের ঘরবাড়ী জ্বলিয়ে দিল এই পরিস্থিতিটা তৈরি হওয়ার জন্যে আমাদের জননেত্রী শেখ হাসিনার এবং তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ভুল নীতিই অনেকাংশে দায়ী। এই কারণেই দায়টা জননেত্রী শেখ হাসিনার।

ভুল নীতিটা কি? হেফাজত তোষণ, মদিনা সনদের কথা বলে নিজেদেরকে ইসলামপন্থী প্রমাণের চেষ্টা ইত্যাদি। কেন, এইসব নীতির সাথে রংপুরে হিন্দুদের ঘরবাড়ী পোড়ার সম্পর্ক কি? এইটা তো না বুঝার কথা না।

ধরেন একটা খবর বের হলো যে একটা হিন্দু ছেলে ফেসবুকে ইসলাম ও প্রফেট সম্পর্কে খুব খারাপ আপত্তিকর কথা লিখেছে। শুনে মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা হবেই। এটা যুক্তির ব্যাপার না, আবেগ ও বিশ্বাসের ব্যাপার। আমরা ভালো বলি বা মন্দ বলি- উত্তেজনাটা হবেই। এই উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ কিভাবে হবে? একটা তো হতে পারে যে কে এই ছোকরা, ওকে ধর, ওকে মার ওকে পুলিশের হাতে দে ইত্যাদি। এলাকার লোকজন যদি ছোকরাকে ধরতে পারে, ওকে মারধোর করবে আর পুলিশ গিয়ে ওকে উদ্ধার করবে, করে ওর বিরুদ্ধে একটা মামলা ঠুকে দিবে। এটা একরকম প্রতিক্রিয়া। এইটা নিয়ে এখন কিছু বললাম না।

আরেক ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়, এবং এটা স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া না, যে মওলানা সাহেবেরা আর এলাকার মুরুব্বী সাহেবেরা বলতে থাকেন যে 'মালাউনের বাচ্চার এতো বড় সাহস আমার পেয়ারা নবীর শানে বেয়াদবি ফরমায়? এই দেশের মুসলমানরা কি মরে গেছে নাকি সব হিজড়া হয়ে গেছে? একটা মুসলমানও জিন্দা থাকতে মালাউনের বাচ্চারা এই সাহস কিভাবে পায়? শালা মালাউনদেরকে শিক্ষা দিতে না পারলে...' ইত্যাদি। এরপর ওরা কর্মসূচী দিবেন স্থানীয় মসজিদে পরবর্তী জুমার দিন বাদ জুমা প্রতিবাদ সমাবেশ হবে, সমাবেশের পর বিক্ষোভ মিছিল।

এইখানেই আসে সরকারের হেফাজত তোষণের নীতি আর মদিনা সনদ নীতির প্রয়োগ।

শুক্রবার স্থানীয় মসজিদে বাদ জুমা কর্মসূচী হবে- বিক্ষোভ কর্মসূচী। এই কর্মসূচী থেকে হিন্দু পাড়ার দিকে মিছিল যাবে। বিষুদবার বিকালে পুলিশ তিন চারজন মৌলানা আর স্থানীয় নেতাকে ডেকে শাসাতে পারেন। আপনারা বিক্ষোভ করেন, কিন্তু সাবধান কোন হামলা করতে যাবেন না। তাইলে আপনাদের কারো পাছার ছাল রাখবো না। তাইলে শুক্রবার কর্মসূচী হবে ঠিকই, কিন্তু তাতে উত্তাপ কম হবে আর কর্মসূচীর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। কিন্তু ঐ যে নীতি, সেইসব নিতিত কারণে পুলিশ মৌলানা সাহেবদেরকে শক্ত গিলায় কিছু বলবে না। কেন?

কারণ পুলিশ দেখেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে হেফাজতের হুজুরদেরকে সালাম দিচ্ছেন আর দুই মৌলানা শাহী স্টাইলে চেয়ারে বসে আছেন। এই ছবিটা সকলের কাছে সিগনাল পাঠিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে হুজুররা গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর যখন কাউকে সালাম দেয় বা সম্ভাষণ জানান তখন সকলকেই দাঁড়িয়ে যেতে হয়ে। এটা স্বাভাবিক সৌজন্য। প্রধানমন্ত্রী মানে আমার দেশের প্রধানমন্ত্রী- তিনি যেই হন। কিন্তু এই হুজুররা এতোই বড় যে ওরা চেয়ারে বসে থাকে আর আমার প্রধানমন্ত্রী ওদেরকে দাঁড়িয়ে সালাম জানান। পুলিশের একজন এসি বা একজন ইন্সপেক্টর বা একজন সাবইন্সপেক্টর কি করবে? পুলিশের তখন হুজুরদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়।

আর আছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ যুবলীগ এরা আর হিন্দুদের রক্ষা করতে বা সাম্প্রদায়িকতা ঠেকাতে হুজুরদের সাথে বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজান ঠেকাতে মাঠে থাকবে না। কেন? হেফাজতকে পক্ষে রাখতে হবে, ওদেরকে খেপানো যাবেনা। বরং কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী বাদ জুমা বিক্ষোভেও অংশ নিবে, হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিবে। ওদেরকে তো প্রমাণ করতে হবে যে ওরা ইসলামের বিপক্ষে না, ওরা ইসলামের পক্ষের শক্তি।

ফলাফল হচ্ছে ওরা নির্বিবাদে প্রায় বিনা বাধায় ঘটনা ঘটাবে। শুধু এক্সট্রিম পর্যায়ে গিয়ে পুলিশ বাধা দিতে চাইবে, বা ঘটনা ঘটের সময় বা ঘটার পরে ঠেকাতে চাইবে। তাতে ঘটনা তো ঠেকবে না, উল্টা ঘটনার তীব্রতা আরও বাড়বে। কেননা তখন মৌলানারা পরবর্তী আরও একটা কর্মসূচী দেওয়ার সুযোগ পাবে। পুলিশি হামলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ।

আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে মনে হয়েছে এইটা হচ্ছে সরকারের নীতির ফল। আর সরকারের নীতি দায় তো তো সরকার প্রধানেরই। এই কারণে এইটুকু গঠনমূলক সমালোচনা করলাম। এই কারণে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিদিন বাড়ে। বঙ্গবন্ধু কিন্তু ঠিকই ধর্মের ব্যাপারটা আমাদের রাষ্ট্রের ইয়ে থেকে বাইরে রাখতে চাইতেন।

আমার আর এইসব বলতে ইচ্ছা করে না। বুড়ো হচ্ছি। প্রিয়জনরা বলে তোমার এইসব ঝামেলার দরকার কি? ইতিমধ্যে মামলা টামলা খেয়ে বসে আছো। তোমার পলিটিক্যাল এম্বিশন নাই। তুমি কিছুদিন পরে মরে টরে যাবে। তোমার কি দরকার! ঝামেলা টামেলা হবে। দরকারটা কি! কথা সত্যি। আমাদের পরিবারের ছেলেরা একটি আগেই মরে। আমার বাপ চাচারা সব মরে সাফ। নেক্সট ক্যান্ডিডেট হচ্ছি ভাইয়া আর আমি। মৃত্যুর সিরিয়ালে থেকে এইসব কেন বলছি! তার চেয়ে এখন একটু আরাম আয়েশ করবো, টেলভিশনে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রাম চাহে লীলা চাহে গাইতে গাইতে ব্লাউজের বোতাম খুলছে নাকি বন্ধ করছে সেই রহস্য ভাঙার চেষ্টা করব। সেসব না করে কেন এইসব বলছি?

না, বলছি তার কারণ আছে। কারণ এইটা আমার দেশ। আমি এই দেশের মালিক। দাম দিয়ে কিনেছি। দামটা শালার নেহেয়ায়েত কম না। আমাদের সকলের ব্যক্তিগত ত্যাগ আছে এই দেশ অর্জনের জন্যে। আমারও আছে। বড় ট্যাজেডি আছে আমাদের জীবনে স্বাধীনতা নিয়ে। আমি ছেড়ে দিব? ওরা আরেকটা পাকিস্তান বানাবে আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব? মরে তো যাবোই, কিন্তু এই মাটিতেই তো মরবো। যেরকম দেশ চেয়েছি সেরকম দেশ যদি না থাকে তাইলে মরেও তো আরাম পাবো না বাল।

আর সন্তানদের জন্যে কি করছি? আমার মেয়েরা কি তবে একটি বাংলাভাষী পাকিস্তানে বাস করবে? এইরকম দেশ রেখে যাবো বাচ্চার জন্যে? এইজন্যেই বাচ্চা ফুটাইছি? দুর।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান