ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ ও মুক্তি যুদ্ধ

Thu, Nov 9, 2017 11:21 PM

ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ ও মুক্তি যুদ্ধ

খসরু চৌধুরী : ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের  অর্থনীতি ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ৬ দফা আন্দোলন পাকিস্তান ও পূর্ববাংলার অর্থনীতির ভাগাভাগির বিকট অসাম্য পূর্ববাংলার মধ্যবিত্তকে দারুন ভাবে নাড়া দেয়। অনেক অপচয় করে ১৯৬৮ সালে আইয়ূব খাঁ তার ক্ষমতা দখলের দশ বছর' ‘ডিকেড অফ প্রগ্রেস' পালন করে। এটি মানুষের চোখ অনেকটা খুলে দেয়।এ সময় বামপন্থী ছাত্র সংগঠন গুলো ১১ দফা নিয়ে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলে। এন এস এফ, ইসলামী  ছাত্র সঙ্ঘ ছাড়া বাদবাকী সংগঠনগুলো এ আন্দোলনে শামিল হয় ।

১৯৬৬ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের প্রধান নেতৃত্ব জেলে বন্দী থাকায় আওয়ামী লীগ বড় আন্দোলনে যেতে পারছিল না। কিন্তু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেবার পাঁয়তারা করলে ফুঁসে ওঠে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন গুলো। পাকিস্তান সরকার ১১ দফা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছিল ;তাতে যোগ দেন মওলানা ভাসানী। মওলানা সাহেব ও তার সহযোগীরা আন্দলনে যত প্টু - নির্বাচন করা , সরকার গঠন করে প্রশাসন চালনার জ্ঞানগম্মি তাদের ছিল না। আওয়ামী লীগ সহজেই এই আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে পারলো। ।আমাদের ফরিদপুর শহরেই শুধু না ,গ্রামে গঞ্জেও এই আন্দোলনের রেশ ছড়িয়ে পড়ছিল । প্রবল পরাক্রান্ত মুসলিম লীগের ' তখতে তাউস' ভেঙ্গে পড়ছিল । প্রশাসন ভেঙে পড়ছিল ,গ্রাম এলাকায় গোষ্ঠীবদ্ধ খুনোখুনি বেড়ে গিয়েছিল। চলছিল এক শাসনের অবসানে অন্য শাসন প্রতিষ্ঠার আবাহন ।

এ সময় ফরিদপুরে এমন একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে যার প্রতিক্রিয়ায় ফরিদপুরে রাতারাতি মুসলিম  লীগের শাসন অবসৃত হয়। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারীর শেষের দিকে শহরের অম্বিকা ময়দানের সামনের  রাস্তায় ২৩ বছরের প্রতিবাদী যুবক সুফি কে হত্যা করে মুসলিম লীগ ও এন এস এফের গুন্ডা বাহিনী। সুফি ভাইকে আমি ভালভাবে চিনতাম। তিনি কোন দল করতেন না। তার একটি বাহিনী ছিল ( আলম , হাফেজ হান্নান, মিলন, বাবলু, ভবতোষ) যারা নিয়মিত ব্যয়াম করতো আর অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়াত । তাদের সঙ্গে প্রায়ই লাঠালাঠি হত ফরিদপুর শহরের মুসলিম লীগের প্রধান পাণ্ডা সোবাহান মোল্লার দল,কমলাপুরের গুণ্ডা বাহিনী আর এন এসেফের গুন্ডা যহুরুল ( অভিনেত্রী ডলি যহুরের স্বামী ) ও তার দলের সঙ্গে। সে দিন ভোরের দিকে ৭টি রিকসায় ১৫ জনের দল নিয়ে যহুরুল যাচ্ছিল ভবতোষের বাড়ী দখল করতে। ঐ রাস্তা ধরে সুফিভাই একাই একটা কাঠের রুল হাতে প্রাতভ্রমনে বেড়িয়েছিলেন। যহুরুলের দল হকি স্টিক , রাম দা ,কাত্রা নিয়ে বের হয়েছিল । শের আলী বলে একজন সুফিভাইকে গালি দিলে সুফিভাই রুখে দাঁড়ান অভিমন্যুর মত। যহুরুলের দল সুফি ভাইয়ের উপর । আলা গুণ্ডা কুপিয়ে সুফিভাইকে মেরে ফেলে। এর প্রতিক্রিয়া হয় বারুদের স্তুপে আগুন স্ফুলিঙ্গ পড়ার মত।

জনগণ সুফি ভাইকে খুব পছন্দ করতেন। খুনের ঘটনা ঘটে ভোর ছটার দিকে। সাড়ে আটটার দিকে হাজার হাজার মানুষ দোকান পাট বন্ধ করে রাস্তায় এসে মুসলিম লীগের আস্তানা পুড়িয়ে দেয়। প্রবল প্রতাপ থানার ও সি মমিন ভুইয়া পালিয়ে আমাদের বাসায় আশ্রয় নেয় স্বপরিবারে। আব্দুর রহমান বকাউল, খলিল উকিলের বাড়ী আক্রান্ত হয়। ডিসি বাধ্য হয়ে সোবাহান মোল্লার বাড়ীতে আগুন দেবার নেতৃত্ব দেন। জান্তা পুলিশ এক হয়ে আসামী ধরতে বের হয়ে পড়ে। জনতার মহা জাগরণের এমন শক্তিশালী মুর্তি আমি আগে- পরে কখনো দেখিনি ।এর পর মার্শাল ল' চালু হলে আমি মাধ্যমিক পাশ করে রাজেদ্র কলেজে ভর্তি  হই।

চলবে..

লেখক: খসরু চৌধুরী, লেখক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান