বীথির কাছে চিঠি-৩৮

Wed, Nov 8, 2017 5:44 PM

বীথির কাছে চিঠি-৩৮

লুনা শিরীন : প্রায় সময় এমন হয় যে তোকে লিখতে বসার আগে দুই-তিন বা চার-পাচ রকমের ঘটনা মাথার ভিতরে দোল খেতে থাকে।  লাইনগুলো , ঘটনাগুলো , তোর কাছে একান্তে লেখার বিষয়গুলো সাজাতে থাকি। আর নিজের মনের সাথেই কথা  বলতে  থাকি, ভাবি কি লিখবো ? কতটুকু লিখবো , লেখা কি ঠিক হবে ? লেখা কি উচিত ? কি হবে লিখে ? এসব ভাবনা । আবার ভাবি , লিখলে ক্ষতি কি , কেন লিখবো না, আমি তো বলেইছি , এই কথা বলার জায়গাটা আমার একান্ত নিজের,তবুও  যখন খুব অপরিচিত কেঊ,বা খুব ব্যাস্ত কেউ,ফোন ধরেই বলে, কি ব্যাপার লুনা ,তোমার বীথির খরব কি ? তোমার মন ভালো তো ? আমি তখন নিজের ভিতরেই একটু নড়ে বসি , ভাবি আরে এই মানুষটাও আমার লেখা পড়ে, আমার কথা মন দিয়ে শোনে ? তখন নিজের দায়িত্ব বেড়ে যায় ,ভাবি তাহলে কি লেখার সময় সাবধান হওয়া দরকার ?

 অনেকদিন আগে বিথি, সেই ১৯৮৪ /৮৫ সাল হবে, আমি তখন  ক্লাস টেনে,থাকি সাভারে বিপিএটিসিতে – মোহাম্মদ সাদিক নামে একজন ফাউন্ডেশন কোর্সে এসছিলেন সেইসময়, আমরা সাদিক মামা ডাকতাম।  তিনি আবার কবিও , সেইসময়  তিনি পিএটিসি,র সেই নতুন ক্যাম্পাসে কবিতার পাঠের আয়োজন করেছিলেন । এসছিলেন কবি নিরমেলন্দু গুন, কি কারনে জানিনা আমাদের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব ছিলো, আমি  কবি গুনকে প্রশ্ন করেছিলাম –আপনি কি কবিতায় মনের সব কথা  বলতে পারেন ? উত্তরে লিখেছিলেন গুন—না কিছুই বলতে পারি না,একবারেই না, যা বলতে  চাই তার ঠিক বিপরীত কথাগুলো আমি কবিতায় লিখি ।

জানিস বীথি – আজকে প্রায় ৩০  বছর ধরে কথাটা আমাকে ভীষন টানে ,আমি লিখছি তাও ২০ বছর হয়ে  গ্যাছে। কত লক্ষ লক্ষ বার যে কথাটা আমার মনে হয়েছে,আসলেই তাই,যা তোকে বলতে চাই –তা কি বলি আমি কখনোই ? কেউ কি আমরা বলি কাঊকে ? কেন বলতে পারি না ? কিসের পিছুটান ? এই তো জীবন, ফুরিয়েই তো যাবে একদিন তবুও খুলে  মেলে ধরতে পারি না নিজেকে ,কিন্তু কেন ?

গতকাল ছেলেকে দিয়ে আসলাম আমেরিকাতে, কানাডার বর্ডার এর কাছেই বাফেলো এয়ারপোট, আজকে এই  মুহুরতে যেমন সকাল সাড়ে নয়টা, তেমনি গতকাল এই মুহুরতে নাইয়া ছিলো আমার পাশের  সীটে – আমি অবাক হয়ে আমার-ই ঔরসজাত সন্তানকে দেখে বার বার ভাবছিলাম, এই কি আশ্রয় যাকে ধরে আমি বেচে আছি ? বা আমি যাকে নিয়ে ভাবি এই জীবন কেটে যাবে ? আসলেই কি তাই ? কারো কি কাটে ? নাকি নিজের জীবন নিজেকেই কাটাতে হয় ? একটা অদ্ভুত কথা কি – এইসব দেশে, মানে আমেরিকা /কানাডাতে বাচ্চারা ভিন্নভাবে চিন্তা করতে  শেখে । বাসের দুলুনিতে নাইয়াকে দেখলাম  ঘাড় কাত করে গুমাচ্ছে , আমি ওর মাথাটা নিয়ে আমার  ঘাড়ের কাছে দিতেই  ও বলল – তুমি আমাকে জাগিয়ে দিলে কেন ? আমি বলি, তুমি আরাম করে ঘুমাও ,ও বলে না, আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম, তুমি আমাকে বিরক্ত করে ঘুম ভাঙ্গালে কেন ? বীথি – এটা কিন্তু সবখানেই,আমার সাথে নাইয়ার ফারাক, আমি যেটা ভালবেসে করি তার অনেককিছুই ওর জন্য কাম্য না, সেটা যে খারাপ তা কিন্তু বলছি না , কিন্তু এটাই ও শেখে, ওকে বলা হয় জীবন-টা তোমার ,তুমি জীবন –টা এনজয় করবে নিজের মতো করে। এই সমাজ  ওকে তাই শেখায় প্রতিমুহূর্তে । এই যে আমি শুণ্য বাড়িতে নাইয়াকে রেখে প্রতিদিন অফিসে যাই,আমার কাছে  যা সুন্যতা মনে হয়, কিন্তু ওর কাছে এটা ভীষন আনন্দের – কারন ও আমাকে নিয়ত-ই বলতে থাকে, আই নীড মাই ওন টাইম – এর অর্থ কিন্তু এই না বীথি, যে আমার ছেলে খারাপ, আমার ছেলে ফাকা সময় পেলে পড়াশোনা করবে না, বা আমাকে আড়াল করে কোন কিছু করবে, তা কিন্তু একবারেই না। যেসব ভাবনা  নিয়ে আমি নিয়ে আমি বড় হয়েছি, তার অনেক-কিছুই  নাইয়ার ভিতরে  নেই।  কারন ও একটা ভিন্ন সমাজে ও পরিবেশে বড় হচ্ছে ।

এই কয়েকদিন আগেই একবার বললাম, যাও বাবু, তোমার পড়াশোনা করতে হবে না, তুমি বই খাতা ফেলে দাও, আমি ই  তোমাকে দেখবো – ছেলে সঙ্গে  সঙ্গে খুশি হয়ে  হয়ে গেলো, আমরা দুজনই  ফ্লোরে শুয়েছিলাম, নাইয়া বলে—আম্মু, আর উ সিরিয়াস ? আমি বলি, হ্যা বাবু আমি সিরিয়াস,সত্তিই তাই বীথি, আমি ভাবি, কি হবে লেখাপড়া করে বড় হয়ে,তার চেয়ে আমার কাছে থাকুক, বাচার জন্য হলেও তো আমাকে আশ্রয় করবে ? নাইয়া দেখি, একটু উঠতে গিয়ে আবার শুয়ে পড়লো, আমাকে বলে, নাহ আম্মু –আমাকে গুড এডুকেশন পেতেই হবে, আই নীড এ বেটার লাইফ ।

ভাবতে পারিস বিথি, মাত্র ১৪ বছরের ছেলে,বেটার লাইফ বুঝে গ্যাছে,আর আমার ৪৫ বছরেও জানা হোলো না এই জীবন কি শুধুই আমার ভালোর জন্য নাকি আমার আরো কিছু কাজ ছিলো ? আমি কি শুধুই নিজে ভালো থাকবো নাকি কাঊকে নিয়ে ভালো  থাকবো ? সেই অতি প্রাচীন নানী / দাদীর মতো এখনো এই শুন্য ঘরে একা একা ঘুরতে ঘুরতে মনে হয় ,কিসের ভালো থাকা ? কিসের আনন্দ ? কতদুউরে প্রিয় দেশ,কতদুউরে প্রিয় মানুষেরা,এর নাম বুঝি ভালো থাকা ? আদর বীথি

২০/০৬/২০১৪

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিঠি-৩৭


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান