প্রতিবছর বই ছাপার দরকার নেই, সে টাকায় শিশুদের খাবার দিন..

Tue, Nov 7, 2017 12:16 AM

প্রতিবছর বই ছাপার দরকার নেই, সে টাকায় শিশুদের খাবার দিন..

মঞ্জুরে খোদা : নতুনবছর মানেই শিক্ষামন্ত্রী আবার প্রস্ততি নিচ্ছেন, ছেলেমেয়েদের মাঝে নতুন বই বিতরণের। অনেক অনিয়মের মধ্যে এটাও একটা সাফল্য যে, নিয়ম করে ঠিক সময়ে শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া হয়। এর সাথে যুক্ত আছে প্রকাশনা শিল্প, শ্রমশক্তি ও বিশাল পুঁজি। কিন্তু প্রতিবছর একই বই ছাপাতে তো অনেক অর্থের দরকার হয়। এর কি কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেই? শিক্ষার সীমিত বাজেটের বিপুল অর্থ প্রতিবছর খরচ না করলেই কি নয়? কিন্তু এ কাজের সাথে যুক্ত যে আমলাতন্ত্র, তারা কি সহজেই এ কাজটা করবে? প্রতিবছর শিক্ষাউৎসবের নামে বই না ছাপিয়ে, ভিন্ন ব্যবস্থা-পদ্ধতিও চালু করা যায়। যেহেতু প্রতিবছর একই বই নতুন মোড়কে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয়, তাহলে সেটা করা খুব সম্ভব।

সরকার শিশুদের হাতে হাতে পাঠ্যবইগুলো না দিয়ে বইগুলো স্কুলের লাইব্রেরীতে রাখবে। সেখান থেকে প্রতিদিন ছাত্রছাত্রীরা বইগুলো নিয়ে পড়বে এবং শিক্ষক পড়াবে। পাঠ্যবইয়ের স্কুলের লেখাপড়া ছেলেমেয়েরা স্কুলেই শেষ করে আসবে। শিক্ষকরা বাসার জন্য শিশুদের সামান্য “হোমওয়ার্ক” দেবে, সেটা তারা বাসা থেকে করে নিয়ে আসবে। এই পদ্ধতি চালুকরা গেলে প্রতিবছর আর বিপুল অর্থ খরচ করে বই ছাপাতে হবে না। বই ঠিকমত ছাপা হলো কি’না সেটা নিয়ে আর তাদের নির্ঘূম রাত কাটাতে হবে না। বরং সেই অর্থ বাচিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে খরচ করা যায়। ছেলেমেয়েদের টিফিনের ব্যবস্থা, খেলাধূলার ব্যবস্থা করা যায়। ভাঙ্গাচুরা স্কুলগুলোও মেরামত করা যায়।

কেউ বলতে পারেন প্রতিবছর পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন হলে, সেটা না ছাপিয়ে তো উপায় নেই! পাঠ্যপুস্তকের তথাকথিত গদবাধা পরিবর্তনের কোন প্রয়োজন নেই, যদি কোন মৌলিক পরিবর্তন না ঘটে। দুই-একটা গদ্য-পদ্য-অধ্যায় পরিবর্তনে শিক্ষার গুন-মানের কোন তারতম্য হয় না। বিধায় সেটা করা জরুরী নয়। আমলারা সেটা করতে আগ্রহী হয় তাদের স্বার্থ-সুবিধা-বাণিজ্য ও কমিশনের জন্য। আর সেটা করেই তারা তাদের এই অপকর্মকে যৌক্তিকতা দেয়। যদি পরিবর্তন করতেই হয় অন্তত ৫ বছর পরপর এই কাজটি করা যেতে পারে।

আমার ছেলে কানাডায় প্রাইমারী স্কুলে পড়ে, কিন্তু তার পাঠ্যবইয়ের চেহারা আমি আজ অবধি দেখিনি! ওরা স্কুলের লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে লেখাপড়া, অনুশীলন করে, ক্লাস টেস্ট দিয়ে, শিক্ষকের দেয়া সামান্য “হোম ওয়ার্ক” নিয়ে বাসায় ফেরে! যেটা করতে তাদের হেলেদুলে আধাঘন্টা থেকে একঘন্টা সময় লাগে। যতটুকু জানি পাশের দেশ শ্রীলংকায়ও একই ব্যবস্থা চালু আছে, সেখানেও স্কুলের বই ব্যবহার করেই ছেলেমেয়েদের পড়তে হয়। বিশ্বের উন্নত-উন্নয়নশীল অনেক দেশেই এই ব্যবস্থা চালু আছে। আমাদের দেশের আমলার শুধু মোটা মোটা খরচের পথ বের করে, কিন্তু কিভাবে খরচ কমিয়ে বা না করে, একটা ব্যবস্থাকে অগ্রসর করা যায় সেটা করতে পারে না, বা করতে চায় না!

শতশত আমলা ও নীতি নির্ধারকরা প্রতিমাসে সরকারী টাকায় বিদেশে শিক্ষন-প্রশিক্ষন যায়, কিন্তু তারা কি শিখে আসে, কি অভিঙ্গতা অর্জন করে, তার কোন প্রয়োগ দেখি না, উন্নয়নেও ভূমিকা দেখি না। তাদের আগ্রহ কেবল টাকাপয়সা ভিত্তিক প্রকল্পের দিকে। যেখানে স্বার্থ-সুবিধা ও কমিশন বাণিজ্য আছে। আমাদের সংকটের অনেক কিছুই হচ্ছে উপযুক্ত নীতি ও পদ্ধতির, অর্থের নয়! সেটা আসলে নির্বোধ জনগণকে বোঝানো হয়, কিন্তু আমলা-মন্ত্রীদের বিলাসিতার কোন ঘাটতি নেই। এখানকার এমপি-মন্ত্রীরা নিজেদের গাড়ী নিজেরাই চালায়, নিজেরাই নিজেদের কাজ করে, নিজেরাই নিজেদের বাগান পরিষ্কার করে। অফিসের কাজের পরে, সরকারী টাকায় ১ লিটার তেলও তারা খরচ করে না। আমাদের দেশের মত একেক জনের ৪০ জন করে বয়-বিয়ারা-বাবুর্চি নেই তাদের!

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মাস্টার মারামারি করলে আমাদের মন্ত্রী লজ্জা পান! কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ শিক্ষাখেত্রে হাজারও দূর্ণীতি-অনিয়ম হলেও তিনি অপমানিত বোধ করেন না। একজন ছাত্রকে যদি অসদাচণের দায়ে স্কুলে থেকে বের করে দেয়া হয়, তাহলে একজন শিক্ষককে কেন অসদাচরণের দায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হবে না? একজন বিচারপতিকে যদি টেচেহেচরে নামানো যায়, একজন শিক্ষককে চাকুরীচ্যুত করা হবে না? হবে না কারণ, দলদাস ও দলবাজি বলে কথা..!

শেষ কথা, আমাদের দেশের শিক্ষাখেত্রের যে পাহাড়সম সমস্যা আছে, সেই সমস্যা অন্তত অর্ধেক দূর করা সম্ভব, কেবল উপযুক্ত নীতি, পদ্ধতি, ব্যবস্থাগ্রহন ও প্রয়োগের মাধ্যমে। সে জন্য দরকার কিছুটা সততা ও দেশপ্রেম, যেটা বিদেশ থেকে আমদানী করা সম্ভব নয়!

লেখক: ড. মঞ্জুরে খোদা। সাবেক ছাত্রনেতা, গবেষক। ৭ নভেম্বর ২০১৭। কানাডা।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান