শেকড় কোথায় আমার ?

Sat, Nov 4, 2017 1:06 AM

শেকড় কোথায় আমার ?

রেজাউল ইসলাম : আমি বাংলাদেশ থেকে এখানে চলে আসি মে ৮,২০১০ । আসার দিনটি ছিল আমার জন্য এক দিকে খুব বেদনার , আবার অন্য দিকে এক ধরণের আনন্দের । যাদের সঙ্গে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দিয়েছি তাদের ছেড়ে আসা যেন হৃদপিণ্ড থেকে অনেকটুকু অংশ কেটে বাদ দিয়ে দেওয়ার মত । আর প্রিয় মাতৃভূমি, তাকে ছেড়ে আসা হৃদয়ের গভীরে অনেক বড় ক্ষত চিহ্ন একে দেওয়ার মত । এই ক্ষত চিহ্ন আমার মত প্রতিটি প্রবাসীদের হৃদয়ে থেকে যায় ।নিরন্তর জ্বলতেই থাকে । অনেকেই এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, ভাল আছেন কিন্তু কোন না কোন বিষণ্ণ দুপুরে চোখ জলে ভরে উঠে । বুকের মধ্যে এক ধরনের হাহাকার অনুভূত হয় ।এক ধরণের শূন্যতা বোধ মনকে ছেয়ে ফেলে ।যেন, ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মন রে আমার। তাই জনম গেল, শান্তি পেলি না রে মন, মন রে আমার॥

সেই দিনটি এখনো আমার মনে আছে । শাহাজালাল বিমান বন্দরে আমি, আমার স্ত্রী আর মেয়ে অপেক্ষামান । আত্নিয়, পরিজন অনেকেই এসেছেন বিদায় জানাতে । যখন সময়ের কাটা ফ্লাইট ছেড়ে দেওয়ার সন্ধিক্ষণে এসে হাজির হোল, পা সরছিল না । কোন অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছি ? এই প্রিয় মানুষ গুলি তো সেখানে থাকবে না !! এটা তো যাত্রাবাড়ি টু গুলিস্থান নয় কিংবা টাঙ্গাইল টু ঢাকা নয় যে যখন ইচ্ছে এই প্রিয় মানুষ গুলিকে দেখতে ছুটে আসা যাবে । আমি প্রানহীন একটা দেহের মত গুটি গুটি পায়ে হেটে গেলাম কোরিডোরের দিকে । আমার মেয়েটি তার দাদুকে অনেক ভালবাসে । তখন অনেক ছোট ছিল । ও তো বুঝতে পারছিল না দাদুর কাছ থেকে সে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে । তবে সবার অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে কিছু একটা বুঝার চেষ্টা করছিল । এক সময় আমরা এই ভারাক্রান্ত মন নিয়েই প্রিয়জনদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলাম ।এক সময় প্লেন রানওয়ে থেকে চাকা উঠিয়ে নিল । প্লেনের জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম আমার প্রিয় দেশ, বাংলাদেশ ছোট হতে হতে এক সময় বিন্দুতে মিলিয়ে গেল । আমার দৃষ্টি শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত চেয়ে চেয়ে দেখেছে ।

প্রথমেই বলেছি এই আসাটাতে এক ধরণের আনন্দও ছিল । ইত্তিহাদ এয়ারওয়েজে করে এক সময় তিন ঘণ্টার ট্রানজিট নিতে আবুধাবি এসে পৌছলাম । এখানে এসে বেশ কিছু বাংলাদেশী পেয়ে গেলাম । মূলত এরা শ্রমিক । একটু ভাল জীবীকার সন্ধানে এখানে এসেছে ।তবে এদের সঙ্গে কথা বলে বেশ তৃপ্তি পেলাম । অনেক আন্তরিকতা দিয়ে , আপন জনের মত কথা বলেছে এরা । আমি কানাডায় যাচ্ছি শুনে একটু অবাকও হোল । অনেক কিছু জানতে চাইলো তারা । কিভাবে যাওয়া যায় , কি পদ্ধতি ইত্যাদি ইত্যাদি । আমি মোটেও বিরক্ত হইনি বরং আগ্রহ নিয়ে বলার চেষ্টা করেছি । এরা তো আমাদেরই মাটি জলে বড় হয়েছে । এদের রক্তে, হৃদয়ে বাংলাদেশের পলি মাটির ছোয়া লেগে আছে । তারপর এখান থেকেও বিদায় নিলাম । দীর্ঘ টার্মিনাল পাড়ি দিয়ে অন্য এক টার্মিনালে এসে প্লেনে উঠলাম । এয়ার হোস্টেজদের মন কাড়া হাসি আর অভ্যর্থনা আমার বিষণ্ণ মনে কিছুটা কি আনন্দ দিতে পেরেছিল ? মনে পড়ে না । শুধু মনে পড়ে , আমার মনে তখন ফ্ল্যাশ ব্যাকের মত কিছু ব্যাপার ঘটছিল । অনেক স্মৃতি মনের আয়নায় উকি দিয়ে যাচ্ছিল ।অনেক ধরণের ভাবনাও ঘুরে ফিরে আসছিল । নতুন জীবন , কি করবো ? কিভাবে শুরু করবো ? নানা রকম আগডুম বাগডুম ভাবনা মনকে বিচলিত করে তুলছিল । এয়ারহোস্টেজরা কিছুক্ষন পর পর হাবিজাবি কি সব অখাদ্য দিয়ে যাচ্ছিল । আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল , কি খাব ? আমি তাদের মেন্যু থেকে রাইস আর ল্যম্বের কারী দিতে বললাম । কিছুক্ষন পর সেই অখাদ্য দিয়ে গেল। আমার তখন মনে পড়ে যাচ্ছিল মায়ের হাতের রান্না । সেই রান্না কবে আর খেতে পারবো ? সত্যিই আমি জানি না । পৃথিবীর যে কোন রান্নার চেয়ে আমার মার হাতের রান্না সর্বশ্রেষ্ঠ। এটা আমি বাড়িয়ে না , হলফ করে বলতে পারি ।মা গো আমার তোমাকে আবার কবে দেখতে পাবো ? আমি খুব আবেগি মানুষ । জানি না , হয়ত এই সব ব্যাপারে সবই আবেগি ।

তারপর সেই স্বপ্নিল দেশ কানাডায় যেন সাত সমুদ্দুর তের নদী পাড়ি দিয়ে এসে পৌছলাম । প্লেনের চাকা রানওয়ে ছুবার আগে জানালা দিয়ে এক খন্ড স্বপ্ন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে । অপূর্ব এক দেশ !! ইমিগ্রেশন, লাগেজ কালেকশন ইত্যাদির ঝক্কি ঝামেলা শেষ করে পিয়ারসন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আসলাম । আমার আপন বড় বোন আর দুলাভাই অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য । বলে রাখা ভাল , আমার বড় বোন অনেক দিন থেকেই এখানে প্রবাসী হয়ে আছেন । এই প্রবাসে বোনকে পেয়ে কিছুটা বুকে বল ফিরে পেলাম ।মে মাস হলেও সেই দিন ছিল বেশ ঠান্ডা । প্রথমেই এক অচেনা আবহাওয়ার ছোয়া । গা শিরশির করে উঠলো । উফফ!যেন বরফের ছোয়া ! অনেক ফুল্লেল শুভেচ্ছা শেষে পিয়ারসন এয়ারপোর্টের রাস্তা ধরে আমাদের ভ্যান এগিয়ে চললো গন্তব্যের দিকে । কি মনোরম এক স্বপ্নিল শহর !! প্রশস্ত রাস্তা । উচু উচু বিল্ডিং !! আমার অবস্থা হয়েছে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা গ্রাম্য বালকের মত !! ‘ঢাকা শহর আইসা আমার নয়ন জুড়াইছে ... এর মত । তবে এখানে ঢাকার জায়গায় ‘ টরেন্টো হবে আর কি !!

তারপর দেখতে দেখতে কেটে গেল প্রায় ছয়টি বৎসর । পিআর কার্ড হোল । এক সময় সিটিজেন হোলাম । বুক ফুলিয়ে বলি, I’m Canadian !! আসলেই কি তাই ? অনেক গুলি কাগজের সমাহার আমি! পাসপোর্ট ! পাসপোর্টের নাম্বার ! এই তো আমি।নম্বর সর্বস্ব আমি । কিন্ত আসল পরিচয় কোথায় ? শেকড় কোথায় আমার ? সেই যে রানওয়ের মাটি ছাড়িয়ে যেখান থেকে প্লেনের চাকা উঠে গিয়েছিল , সেইখানে আমি , আমার আমিত্ব। আমার আসল পরিচয় ।আমি বাংলাদেশী/বাঙ্গালী।

মার্চ ২৬, ২০১৬

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান