৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের প্রথম প্রতিবাদ

Thu, Nov 2, 2017 10:23 PM

৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের প্রথম প্রতিবাদ

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু : ১৯৭৫ জানুয়ারীতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কর্তৃক শোষিতের গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষকে সামনে রেখে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গঠন করা হয়েছিল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। যার সংক্ষিপ্ত নাম বাকশাল। বাকশাল গঠনের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বর্জুয়া গণতন্ত্র থেকে সরে এসে একটি সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সংসদে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি করা। এই সময় বাকশালের অধীনে বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নামও পরিবর্তন করা হয়েছিল। অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের মতো বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল জাতীয় ছাত্রলীগ। প্রতিটি অঙ্গ সংগঠনের আহ্বায়কের নামও ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

জাতীয় ছাত্রলীগের আহ্বায়ক শেখ শহিদুল ইসলাম (বর্তমানে মহাসচিবজে পি) ও যুগ্ন আহ্বায়ক ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি)। ঠিক একইভাবে ঢাকা শহর জাতীয় ছাত্রলীগ কমিটির নামও ঘোষণা করা হয়। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন সৈয়দ নুরুল ইসলাম (পরবর্তিতে কাদের সিদ্দিকী তাকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে) ও যুগ্ন আহ্বায়ক ছিলেন কামরুল আহসান খান (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী)। ১১ সদস্য বিশিষ্ট ঢাকা মহানগরীর এই আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য হিসেবে ঐসময় আমাকে ঢাকা মহানগরের সকল কলেজ সংগঠনগুলো দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। একই কমিটির সদস্য হিসেবে আমি ছাড়াও এই দায়িত্ব পালন করেন খন্দকার মোহাম্মদ জুলিয়াস (সাবেক সচিব) ও আব্দুর রউফ শিকদার(বর্তমানে মিরপুর আঞ্চলিক আওয়ামী লীগ নেতা)। এইসময় ঢাকা মহানগরের সীমানা ছিল সাভার থেকে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত। প্রতিদিন এক কলেজ থেকে আরেক কলেজ, এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় সভা সমিতিতে আমাদের খুবই বেস্ত থাকতে হতো। আমরা মূলত বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠন, শোষিতের গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা সর্বত্র প্রচার করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেদিন কখনো কোনো সময়ই কল্পনা ১৫ আগস্ট এমনি একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর উপর কোনো আক্রমন হতে পারে।

অবশেষে ঘাতকরা খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে ১৫ আগস্ট ভোরে হত্যা করলো। আমি তখন ঢাকার সোবানবাগ সরকারি কলোনিতে থাকতাম। সেদিন ছিল শুক্রবার। পবিত্র জুম্মার দিন। কলোনির বন্ধুদের সাথে সোবানবাগ মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করে বাসা থেকে গা ঢাকা দিলাম। চলে এলাম মোহাম্মদপুর বাজার সংলগ্ন ফুফুর বাসায়। এখান থেকেই গোপনে সকলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। মমতাজ হোসেন ভাই (সাবেক রাষ্ট্রদূত), চট্টগ্রামের এস এম ইউসুফ ভাই (সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের দাদা মুকুল বোস, রবিউল আলম মুক্তাদির চৌধুরী ভাই (বর্তমানে এম পি), ডাক্তার মোস্তফা জালাল ভাই(সাবেক এম পি) আব্দুস সামাদ পিন্টু (বর্তমানে মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডিং কাউন্সিলের সদস্য), মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ভাই (সাবেক এমপি) ভাই, খ ম জাহাঙ্গীর ভাই (সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমানে এম পি) ওবায়দুল কাদের ভাই (বর্তমানে মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক), ইসমত কাদির গামা ভাই,(বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ কমান্ডিং কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারমেন) শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর ভাই,(বর্তমানে বিএনপি নেতা), তেজগাঁও কলেজের তাহের, তিতুমীর কলেজের রফিক, কবি নজরুল কলেজের কামাল মজুমদার (বর্তমানে এমপি) ঢাকা কলেজের ইউনুস, রউফ, লালমাটিয়া কলেজের পারভীন (বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী) ও নাজমা(বর্তমানে টরন্টো প্রবাসী)সহ আরো অনেকের সাথে নুতন করে গোপনে যোগাযোগ সৃষ্টি হলো। এই সময় খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পক্ষে দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সকল এমপিদের এক সভা আহবান করলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ এমপিদের একত্রিতভাবে সাক্ষাত করার জন্য মোশতাকের এই উদ্দেস্য যাতে সফল না হয় এজন্য আমরা গোপনে সভা করে ঢাকায় অবস্থানরত সকল এমপিদের কাছে হুমকি চিঠি বিলি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম।

ঢাকায় অবস্থানরত এমপিদের কাছে আমাদের এই চিঠি বিলি করাতে অনেক উপকার হয়েছিল। সেদিন মোশতাকের ডাকে অনেক এমপিরা সারা দেননি। তারা যাননি মোস্তাকের ডাকা সভায় যোগদান করতে। এই সময় আমাদের জাতীয় নেতারা সকলেই বলতে গেলে কারাগারে। ছাত্রলীগের যারা সেদিন নিজের জীবনকে বাজি রেখে সংগ্রামে নেমেছিলেন তাদের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়, কেউ হয়তো এখন আর বেচে নেই কিংবা রাজনীতিতে সক্রিয় নেই। আবার অনেকে হয়েছেন এমপি মিনিস্টার। তবে আমাদের সেদিনের সেই গোপনীয় ঐক্য ও আন্দোলনের কথা হয়তো আজ অনেকেই অবগত নয়।

অন্যদিকে ৭৫ পরবর্তিতে যারা গা ঢাকা দিয়েছিলেন, কোনো সাংগঠনিক কাজ না করে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন তাদের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা এবং মন্ত্রী হয়েছেন এবং এদের অনেককে এখন বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে অন্যের উপর দোষ চাপানোর গলাবাজি করতে দেখা যায়। এসকল নেতাদের অনেককেই ঐসময় আওয়ামী লীগের এই দুর্দিনে সাথে পাওয়া যায়নি। ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস যে মুকুল বোস সেদিন নিজের জীবনকে বাজি রেখে গোপনীয় আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তাকে একসময় সংস্কারপন্থী আওয়ামী লীগার হিসেবে দল থেকে দুরে সরিয়ে রাখা হয়েছিলl পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং বর্তমানে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করা হয়েছেl অথচ একসময় তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক। পচাত্তরের পরবর্তিতে এই মুকুল বোস বিশেষ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে এক নিষ্ঠুর টর্চারের শিকার হয়েছিলেন। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। মুকুল বোস একজন পরীক্ষিত আওয়ামী লীগ নেতা। আওয়ামী লীগের বর্তমান সভানেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হয়তো একথা জানা নেই। কারণ তিনি তখন ছিলেন দেশের বাহিরে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মমতাজ হোসেন, সাবেক মন্ত্রী খ, ম জাহাঙ্গীর এম পি, রবিউল আলম মুক্তাদির চৌধুরী এম পি, সাবেক এম পি ডাক্তার মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন সহ আরো অনেকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে সেদিন আমাদের গোপনীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেনl কারো কারো ইশারায় দুঃসময়ের এসকল পরীক্ষিত নেতাদের বর্তমানে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছেl এসকল পরীক্ষিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা প্রয়োজন ছিলl বঙ্গবন্ধু কন্যা কর্তৃক ওবায়দুল কাদের ভাইকে সাধারণ সম্পাদক করার পর আমি মনে করেছিলাম তিনি এসকল পরীক্ষিত ছাত্রলীগ নেতাদের দলীয় প্রধানের সাথে পরামর্শ করে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়ে আসবেনl কারণ তিনিও ছিলেন এই গোপনীয় সংগ্রামের সাথীl কিন্তু আজ পর্যন্ত এধরণের পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নিl তাহলে কি ওবায়দুল কাদের ভাই সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়ে সাথী সংগ্রামী বন্ধুদের কথা ভুলে গেলেন ?

 

শুরুতেই যে কথা লিখছিলামl এমনিভাবে ১৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের চক্ষুর আড়ালে আমরা গোপনে বিভিন্ন স্থানে মিলিত হতে থাকি। একসময় ৪ নভেম্বর মৌন মিছিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। তখন বঙ্গভবনে খুনিরা টেংক ও অস্ত্র শস্ত্র হাতে মোস্তাককে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে দেশ পরিচালনা করছিলো। জুনিয়ার এই কয়েকজন সামরিক অফিসার তখন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াকে সামরিক বাহিনী প্রধান করলেও ক্ষমতা তাদের হাতেই ধরে রেখেছিলো। জিয়া ছিলেন একজন নাম মাত্র সেনা বাহিনী প্রধান। কিন্তু খুনিদের সেই হিংস্রতা আমাদের থামাতে পারেনি।

৪ নভেম্বরকে সামনে রেখে ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে প্রচারপত্র বিলির সিদ্ধান্ত হলো। আমার উপর দায়িত্ব দেওয়া হলো সকল কলেজে কলেজে ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে এসকল প্রচারপত্রগুলো পৌছে দেওয়ার। যদিও জানি এই সময় এধরনের কাজ খুবই বিপদজনক তবুও সেদিন আমাদের অনেকেই ভয়কে ভয় মনে করি নাই, জীবনকে জীবন মনে করি নাই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শই ছিল আমাদের সব চেয়ে বড় শক্তি। এখানে উল্লেখযোগ্য যে ৪ নভেম্বর ছাত্রলীগের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে যে মৌন মিছিলটি বের হয়েছিল তার সিদ্ধান্ত হয়েছিল অনেক আগে। এই সময় আমরা ৩ নভেম্বরের অভুত্থান সম্পর্কে কিছুই অবহিত ছিলাম না। সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন একটা কিছু ঘটবে তার কোনো ধারনায় আমাদের ছিল না।

৪ নভেম্বরের মৌন মিছিলের প্রচার পত্রগুলো নিয়ে আসতে একদিন রিক্সা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে এসে হাজির হলাম। এখানে মুকুল বোসের (মুকুলদা) কাছে ছিল প্রচারপত্র। তিনি এইসময় জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। অত্যন্ত লুকিয়ে পেকেটে করে মুকুল দা আমার হাতে প্রচারপত্রগুলো তুলে দিলেন। আমার সাথে ছিল বন্ধু হেলাল। হেলাল রাজনীতির সাথে জড়িত না হলেও সেদিন আমার সাথে এই ভয়ংকর কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। আমাদের সব সময়ই ভয় ছিল টিকটিকি (ডি বি পুলিশ)। আমি প্রচারপত্রের পেকেট রিক্সার সিট্ উঠিয়ে নিচে রেখে দিলাম। তারপর বাসায় এসে একটি বেগে ঢুকিয়ে ঢাকার বিভিন্ন কলেজের নেতাদের কাছে বিলি করার জন্য পৌছে দিয়েছিলাম। এছাড়া ঢাকা আইডিয়াল কলেজের ছাত্র নেতাদের সাথে নিয়ে চলন্ত বাসের পেছন থেকে ছুড়ে মেরেছিলাম। প্রচার পত্রগুলো বলাকা সিনেমা হল ও নিউমার্কেটের আসে পাশেও আমরা বিলি করেছিলাম। প্রচারপত্রে পরিষ্কার করে লেখা হয়েছিল ৪ নভেম্বর আমাদের মৌন মিছিলের কথা। অর্থাত ছাত্রলীগের মিছিলের কথা।

ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ তখন আতঙ্ককে অপেক্ষা করছে। ৪ নভেম্বর ছাত্রলীগ আসলে মিছিল করবে কিভাবে? আসলেই কি সেদিন ছাত্র লীগ তাদের মৌন মিছিল করতে পারবে? সকলের ঘরে ঘরে শুধু মাত্র একটি কথা, একটি প্রশ্ন,এ কি করে সম্ভব? এই সময় মিছিল বের হলেতো মিলেটারীরা চুপ করে বসে থাকবে না? বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তখন ক্ষমতায়। কি হবে ৪ নভেম্বর? পারবে কি ছাত্ররা মিছিল করতে?

সেদিন আমরা ছাত্রলীগ কর্মীরা গোপনে সভা করে শপথ নিয়েছিলাম জীবন বাজি রেখে হলেও ৪ নভেম্বরের মৌন মিছিলকে আমরা সফল করে তুলবই। ৩ নভেম্বর হঠাত করেই খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে দেশে সামরিক অভ্যুথান হলো। আকাশে উড়ছিল মিগ ২১। বিমান বাহিনী আকাশে বিমান উড়িয়ে খালেদ মোশারফের অভুত্থানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল। কি থেকে কি হয়ে গেল। এধরনের কিছু একটা ঘটতে পারে তা কখনোও ভাবিনি আমরা। নেতৃবর্গের সাথে যোগাযোগে জানতে পারলাম, হউক না অভুত্থান, আগামীকাল ৪ নভেম্বর আমাদের মৌন মিছিল তবুও হবে। তোমরা সময়মতো এসে জমায়েত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়।

৪ নভেম্বর সকালে যথারীতি রিক্সা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওয়ানা হলাম। পথে কলাবাগান স্টাফ কওয়াটারের কাছে আসতেই দেখলাম মিরপুর রোডের রাস্তার দুইপাশে ভারী অস্ত্র হাতে মাথায় হেমলেট পরে সৈনিকরা দাড়িয়ে আছে। দেশ এইসময় কিভাবে চলছে জানিনা। আদৌ কোনো সরকার আছে কি না তাও জানিনা। রিক্সা করে বটতলায় এসে দেখি ইতিমধ্যে অনেকেই এসে জড়ো হয়েছেন। দেখতে দেখতে লোকে লোকারণ্য বটতোলা। একসময় আমাদের মৌন মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতোলা থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিকে রওয়ানা হলো। মিছিলের সামনে একধারে মুক্তিযোদ্ধা নায়ক খসরু ভাই তার মোটর সাইকেল নিয়ে মিছিল নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বড় একটা ছবি মিছিলের একেবারে সামনে হাত দিয়ে ধরে রেখেছেন দুজন ছাত্রলীগ কর্মী। মিছিলের সন্মুখে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন ভাই, রাজ্জাক ভাই সহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।

নীলক্ষেত পুলিশ ফাড়ির কাছে মৌন মিছিল আসতেই পুলিশ আমাদের বাধা দিল। পুলিশের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা জানালেন মিছিল আর সামনে যেতে পারবে না। উপরের নিষেধ আছে। হঠাত এধরনের বাধা পেয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা উত্তেজিত হয়ে পড়লো। একসময় পুলিশের সাথে ধাক্কা ধাক্কি শুরু হলে পরিস্থিতি চরম অবস্থা ধারণ করে। আওয়ামী লীগ নেতারা তখন পুলিশের টেলিফোনে সরাসরি যোগাযোগ করলেন স্বরাষ্ট্র সচিব সালাউদ্দিন সাহেবের সাথে। নেতাদের আলাপের মধ্য দিয়ে পরবর্তিতে আমাদের মিছিল করার অনুমতি দেওয়া হলো। মিছিল ধীরে ধীরে কলাবাগান পর্যন্ত আসলে এখানে মিছিলে এসে যোগদান করেন সামরিক অভ্যুথানের নেতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের মা ও ভাই আওয়ামী লীগ এম পি রাশেদ মোশারফ। আমাদের মিছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে এসে দাড়ালো। ভিতরে তখন প্রবেশ নিষেধ। পুলিশ পাহারায় ছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবন। বন্ধ গেটের সামনে বঙ্গবন্ধুর ছবির প্রতিক রেখে হাত তুলে মোনাজাত করা হলো। এখানে লেকের পাশে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন ভাইসহ অনেকে বক্তব্য রাখলেন। এভাবেই পচাত্তরের ৪ নভেম্বর ছাত্র লীগের মৌন মিছিল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পরিচালিত এই মিছিলটি ছিল বৃহত্যাকারে প্রকাশ্যে প্রথম প্রতিবাদ।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান