বীথির কাছে চিঠি-৩৭

Wed, Nov 1, 2017 8:19 PM

বীথির কাছে চিঠি-৩৭

লুনা শিরীন : বীথি, ১৯৯৬ সাল,আমি তোকে রেখে, সেই কলাবাগানের খোলা ছাদের বাড়ি রেখে, ধানমন্ডি স্কুলের বিশাল মাঠ আর ঢাকার জমজমাট পরিবেশ ছেড়ে চলে আসলাম সাভারে, পি এ টি সি শুন্য  হাহাকার পরিবেশে। মাত্র   গুটিকয়েক  পরিবারের সাথে আমরাও । বিপিএটিসি তখন সত্যিকার অর্থেই বিরানভুমি।

আমি  ক্লাস টেনে পড়ি । জাহাঙ্গীরনগর  স্কুল / কলেজে  ভর্তি হবার আগেই জেনেছিলাম,ঢাকার প্রথম দশটা  স্কুল কলেজের ভিতর সেটা একটা , মনে আছে তোর ? তোর বড়ভাই দুলু ভাই বলেছিলো – লুনা তো ঐ স্কুল / কলেজে চান্স পাবে না, ওটা অনেক ভালো স্কুলদুলু ভাই একটুও ভুল বলেনি,যা হবার তাই হলো,আমি ক্লাস টেনের হাফ-ইয়ারলি, প্রিটেস্ট এবং টেস্ট তিনটা পরীক্ষাতেই প্রথম বছর এবং পরের বছর –মানে আরো একবার ক্লাস টেনে ড্রপ দিয়ে মোট ৬ টা  পরীক্ষায় অঙ্কে একবারো ১৫ উপরে মার্কস পেলাম না । আমাকে নিয়ে  স্কুল মহা ঝামেলায় পড়ে গেলো। কি করে আমি এসএসসি ফাইনালে বসবো ? আমার এই ৪০ ঊর্ধ্ব জীবনে সবচেয়ে বিপদের দিনে,নিজের ফেলে আসা বিপদের দিনগুলোর কথা ভেবে নিজেকে  শান্ত রাখি, নিজেকে বলি—নিশ্চয়ই বিপদে পথ বের হবে নইলে আমি বা মানুষ টিকে আছে কি করে ? আজো অনেক অনেক বিপদ পাড়ি দিচ্ছি, তাই সেই দিনের কথা মনে পড়ছে ভীষণ

তারপর শোন – অঙ্ক নিয়ে  তোলপাড়, কোন শিক্ষক যদি আমার অঙ্কের দায়িত্ব নিয়ে,আমার হয়ে স্কুলকে গ্যারান্টি লিখে না দ্যয় তাহলে আমার  ম্যাট্রিক ফাইনালে বসা হবে না। সেই সময় আমাদের স্কুলে দুজন সামসুদ্দিন স্যার ছিলেন, দুজনই অঙ্কের পন্ডিত –একজন কবি  মোঃ রফিকের বাবা, যাকে  প্রিঞ্চিপাল স্যার বলা হতো , অন্যজন সামসুদ্দিন স্যার , ময়মন সিংহ বাড়ি। এই  স্যার আমাকে চেনেন না, জানেন ও না,একবারেই না । কিন্তু কি কারনে সেদিন ঊনি আমার জন্য রিটেন দিয়েছিলেন,এই ৩০ বছরে সেটা জানা হলো না।  এই  স্যার বদলে দিলেন আমার জীবন,অঙ্কে আমি  শেষমেশ ৭৬ পেয়ে পাশ করলাম। কিন্তু স্যার বাকী জীবনের জন্য আমাকে বলে গেলেন, শুধু চেষ্টা  দিয়ে মানুষ যেতে পারে বহুদূর ।

জানিস,আ্জকে সারাদিন স্যারকে ভেবেছি আমি প্রিঞ্চিপাল স্যার  বলেছিলেন – তুই কোনদিন  অঙ্কে পাশ করবি না, আর সামসুদ্দিন স্যারকে সেকথা  বলতেই তিনি বিনয়ের সাথে খাস নেত্রকোনার ভাষায় আমাকে বললেন – যে  ছাত্র ৭০ পায় তারে ৮০ পাওয়ানো সোজা , কিন্ত যে ২০ পায় তারে ৫০ পাওয়ানোর কাজ কেউ লইতে চায়না,যে মাথায় ত্যাল আছে , সেইখানে ত্যালের কাম কি ? তুই পড় , তোরে আমি অঙ্কে পাশ দিয়া দিমুনে । কোথায় আছেন আমার সেই স্যার ? মাটির নীচে চলে গেলে কি মানুষ ভালোবাসার ডাক শুনতে পায় ?

বীথি – আজকে সারাদিন ভেবেছি, আমারও ও বিপদ কেটে যাবে , আমি ও পথ খুঁজে পাবো, পেতেই হবে।  কিন্তু সময় যে কখনো কখনো  স্থির মনে হয় রে, কি করি বলতো ? কিছু ভালো লাগছে না জানিস, মনে  হচ্ছে আর কতটুকু হাঁটলে একটু আলো পাবো ? এমন  অনেক অনেক দিন রাত্রি আমি পাড় হয়েছি বীথি।  কোনকালেই আমার জীবন খুব সরল ভাবে আগায়নি, সেই জীবন আমার না, অনেকেরই না । গত তিনদিন হলো আমার  গাড়ির ইন্সুরেন্স খুজছি, এই একটা দেশ আইন দিয়ে এমনভাবে বাধা আছে যা কল্পনা করলেও  অসহায় লাগে , কানাডাতে আইন মানে আইন—কোন ডলার বা কোন ক্ষমতা দিয়ে সেই আইনের ফাক  গলানো যায় না, সবার জন্য এক আইন। এই সময়গুলোতেই শুধু আমার নিজের দেশের কথা মনে পড়ে আর ভাবি যদি কানাডাতে আমি ফেল করতাম স্যার কি বাঁচাতে পারতেন আমাকে ? আমাকে শান্ত থেকেই পথ খুঁজতে হবে, তাহলে বিচলিত হচ্ছি  কেন ? আমার  চেষ্টাই আমাকে বাঁচাবে সেই ক্লাস টেনের মতো । আদর বীথি ।

১১/০৬/২০১৪

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিঠি-৩৬


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান