বীথির কাছে চিঠি-৩৫

Wed, Oct 18, 2017 11:56 AM

বীথির কাছে চিঠি-৩৫

লুনা শিরীন : বীথি, সরদার স্যার (সরদার ফজলুল করিম) কে নিয়ে লেখার একটা তাগাদা থেকেই এই লেখার শুরু। প্রথমেই কয়েকটা ব্যাপার বীথি। ১ নাম্বার, এই যে লেখার শুরুতেই আমি সরদার স্যার লিখে আবার স্যারকে চেনাবার জন্য পুরো নামটা লিখলাম, এই সীমাবদ্ধতা কিন্তু আমার ,একান্ত আমার। কারন আমি ১৫ বছর স্যারের পিছনে পিছনে ঘুরে অনেককে বলতে শুনেছি—কে তোমার এই স্যার যে তাকে চিনতেই হবে ? আর তাকে না চিনলেই তুমি ক্ষেপে যাবে, কেন চিনতে হবে ? কি এমন মানুষ উনি? আমি অনেক অনেক দিন এই নিয়ে তর্ক করে বুঝেছি, আমরা অন্ধ আছি তাই সরদার স্যারের আলো আমরা ধরতে পারবো না। বাংলাদেশের মতো দেশে স্যার হচ্ছে সেই মানুষ যিনি নিশ্চিন্তে আমাদের মতো অধমদের সাথে চলেছেন ৮৯ বছর ।

২ নাম্বার , তোকে লেখার সুত্র ধরে যেহেতু আমার লেখা আরো দুই একজন মানুষ পড়বে, তাই তোকে বলে দেই, আমি কিন্তু এমন মানুষ  না যে সরদার স্যারকে চিনে ভাজা ভাজা করে ফেলেছি। স্যারকে নিয়ে কথা বলার জন্য যোগ্য লোক আমি, তা কিন্তু মোটেও না। একবারেই না। বরং স্যার অনেকদিন আমার মতো  অপদার্থকে সময় দিয়েছেন- কেন দিয়েছেন ,সেটা ভেবে আকুল হই আজো। ৩ নাম্বার,নিম্ন মধবিত্ত পরিবারের মেয়ে, তার উপরে নিজের বিদ্যায় আস্থা কম,সারাজীবন নানারকমের  পৈতা খুজে বেড়ানো অভ্যাস, কাকে ধরলে একটু নিজেকে বড় করা যাবে, এমন স্বভাব থেকেই স্যারকে পাওয়া। কিন্তু ওই যে বলে কথায় বলে, ছাই এর গাদার ভিতরেই মানিক পাওয়া যায়,তেমনি বাংলাদেশের মহান ও আদর্শবাদী  মানুষ খোজার এই প্রক্রিয়াতেই কিন্তু সত্যিকার কিছু গুনী মানুষকে চিনেছিলাম,যার ভিতরে আমার  ব্যাক্তিগত জীবন দিয়ে দেখা পিত্রতুল্য এই  গুনি দার্শনিক জীবনের  সেরা মানুষ হয়ে উঠে।

সবশেষে বীথি – স্যার এর বই পড়ার চেয়েও যেহেতু স্যারের ব্যাক্তিগত জীবনে আমার বেশী যাতায়াত ছিলো তাই আমি চেষ্টা করবো একটু দূরে দাড়িয়ে কথা বলতে, যাতে বেশী লাগামহীন কথা না বলি। তুই একটু ক্ষমা দিয়ে আমার এই লেখা দেখিস প্লীজ ।

১৯৯৫ সাল , শ্যামলী ২ নাম্বার রোডে থাকেন স্যার। পাশের বাসা বা কোন দোকান থেকে ফোন আসলো আমাদের কাছে (আমি ও নাইয়ার বাবা) রিক্সা থেকে পড়ে পা ভেঙ্গে ফেলেছেন সরদার স্যার। আমরা ছুটে গেলাম ,স্যারকে টাক্সিতে করে নিয়ে  পঙ্গু হসপিটালে । বড়জামাই  শাকিল ভাই থাকাতে কোনভাবে জেনারেল বেডে একটা সীট পাওয়া  গেলো। নানান রকমের আর্থিক প্রতিকুলতায় স্যার ২০/২৫ দিন থাকলেন, আজকে যারা মহান  শিক্ষক বা কমরেড , বা সবচেয়ে আদর্শ মানুষ বলে ফুলের মালা দিচ্ছেন  লেখা লিখছেন, সেদিন কিন্তু তেমন কাঊকেই দেখিনি।  ওই ১৫ দিন আমি নিজে হাসপাতালে  স্যারের  কাছে রাতে থাকতাম । আমি ফ্লোরে থাকতাম বিছানা করে আর স্যার থাকতেন  উপরে লোহার বেডে। স্যার এর জন্য কেউ সেদিন এগিয়ে আসেননি।  কারন স্যার এর  টাকার গরম ছিলো না,আর মিথ্যা ক্ষমতার চর্চা  কোনদিন স্যার করেননি । একদিন ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে আমি বললাম—এই কি আপনার পাওনা দেশ থেকে স্যার ? স্যার কি  মানুষ না দেবতা ,ভাবলে অবাক হতে হয়  । আমাকে বললেন – আমার কিছুই পাওনা না – এত আশা করো ক্যান তোমরা ?  নির্মোহ হইতে  শেখো । আমি আবার  দমে গেলাম ।

এবার আবার ১৯৯৬ সাল,একটা বিখ্যাত পত্রিকায় নিজের লেখা নিজেই পৌঁছে দেবার জন্য স্যার ভাঙ্গা  রাস্তা দিয়ে যেঁতে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পেলেন ।  আমি আবার বললাম, কেন স্যার আপনার লেখা নেবার জন্য পত্রিকা অফিস থেকে কাউকে পাঠানো যায়  না ? আমি তো অন্য  শিক্ষকদের বাসায় দিনের পর দিন মানুষকে বসে থাকতে দেখেছি, তারা তো লেখা না দিয়ে , সেই স্টাফদের সাথে কথা না বলে তাদের বিদায় দিয়ে দেন। কেন করে তাদের সাথে এমন বিহ্যাভ  পত্রিকার মালিক? কারন তাদের বড় বাড়ি আছে , তাদের বিলাতের ডিগ্রী আছে , তারা চটাস চটাস ইংলিশে কথা বলে, তাদের বড় বড় কনসালটেন্সি থাকে, তাদের ছেলে মেয়েরা গাড়ি চড়ে , তারা দামী কাপড়  পড়ে , আর গা দিয়ে ফুর ফুরে  গন্ধ বের হয় , তারা এ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া কথা বলে না‌-- তাই তাদের দাম বেশী, আর আপনার এইসব কিছুই করতে হয় না তাই আপনার লেখা আপনি পৌঁছাইতে যান? আপনার পত্রিকার এডিটর না সাবেক কমিউনিস্ট,  আপনারে  নিয়ে কথা বলার সময় তো আদর্শ ঝড়ের মতো আসে, কিন্তু কামের বেলায় ? আমারে  সোজা  জবাব  দেবেন স্যার , আমি আপনার কাছে স্পষ্ট উত্তর শুনতে চাই ?

 এমন সময় চাচী এগিয়ে আসতেন, বলতেন—আরো একটু ভালো করে বলো লুনা ।  স্যার আমাকে বললেন – এত মাপ দাও ক্যান তোমরা ? আমার কাজ আমি করবো , সবার কাজ সবাই করবে, এইডা বোঝ না ক্যান – এইসব আছে বইলাই তো আমাগো যুদ্ধ আছে,  লড়াই করার নামই তো জীবন । আমি আরো তেড়ে যেতাম – আর কত স্যার ? ৩৫ বছর তো হইলো , অনেক তো যুদ্ধ করলেন, আর কবে  হিসেব মিলবে ? স্যারের সেই নির্মল হাসি,মানুষ কি এত নিস্পাপ হয়  বীথি ?– স্যার আমাকে বলেন—মাত্র ৩৫ বছর , এখোনো  ৩৫ হাজার বছর বাকী আছে, এখুনি অস্থির হইছো তুমি ? তোমরা এত তাড়া কর ক্যান তাই বুঝি না ।

 আর না বীথি, এমন অনেক অনেক দিন রাত্রি – সেই শ্যামলীর ডেরা থেকে ইন্দিরা রোড , আবার সেখান থেকে আরো একটা বাসা‌ -- ২০০৪ সালে চলে আসলাম কানাডায় – স্যার বললেন, তাইলে তুমি আমার  ছাইড়া যাইবা। চাচী চলে গেলেন, ২০১০ এ বা ২০০৯ -- । কত কত স্মৃতি , কত ভালোবাসা, কত কথা, কত আলোচনা , সব সব যেনো বানের জলের মতো ভেসে আসছে আমার সামনে, গত দুদিন শুধুই নেট খুলে স্যারের নিঊজ পড়ি আর ভাবি, আহহ –সবাই  হয়তো আমার মতোই  স্বার্থপর –চলে যাবার পরে আবেগপ্রবন হতে বাধা  কোথায় ? অনেক ভালোবাসা স্যার । -লুনা , ১৬ /০৬/২০১৪

আরো পড়ুন : বীথির কাছে চিঠি-৩৪


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান