ব্লু হোয়েল আতংক: অনলাইন জগতের আচরণ, নিয়ম- নৈতিকতা

Tue, Oct 10, 2017 8:07 PM

ব্লু হোয়েল আতংক: অনলাইন জগতের আচরণ, নিয়ম- নৈতিকতা

নাসরিন শাপলা: "Blue Whale" গেমস নিয়ে নর্থ অ্যামেরিকায় পুলিশের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের সতর্কীকরন চলছে অনেকদিন থেকেই। এখন সেই উন্মাদনা বাংলাদেশে তান্ডবের আকারে পৌছে গেছে। যথারীতি ফেসবুকে ঝড় উঠেছে (বাংলাদেশের কারেন্ট ইস্যুর সূচক হিসেবে আপাতত ফেসবুকই ভরসা )। কম্পিউটারের 'C' ও জানেনা আমার আম্মাও এক ফোন কনভারসেশনের মাঝখানেই তিন তিনবার এই বিষয়ে সতর্ক করলেন। আম্মার একটা ফেসবুক একাউন্ট থাকলে আমি নিশ্চিত 'Blue Whale " গেমস বিষয়ে হাতে হাতে ঘোরা ম্যাসেজখানা আমাকে গোটা দশেকবার ইনবক্স করে সাথে ব্যক্তিগত ম্যাসেজে লিখতেন, "দ্যাখো, আমি কথা বললে তো পাত্তা দাও না। তোমরা তো সব বেশী বোঝ। এখন? সবাই তো এটা নিয়েই বলছে.....ইত্যাদি ইত্যাদি "। বিরাট বাঁচা বেঁচে গেছি।

তবে আম্মাকে হেসে উড়িয়ে দিলেও আমি জানি, আম্মার কথা কিন্তু সত্যি। বুঝুক আর না বুঝুক, এই Blue Whale গেমস নিয়ে বাংলাদেশের সবাই এখন প্রচণ্ড আতঙ্কিত। যেমন আতঙ্কিত হয়েছিলো কিছুদিন আগে সন্তান ISS এ যোগ দিয়ে উগ্রবাদী হয়ে যাবার, তারো আগে মাদকে আসক্ত হয়ে যাওয়ার। এমন খুঁজলে আরো হাজারো কারন খুঁজে পাওয়া যাবে পিতামাতার সন্তানকে নিয়ে আতঙ্কিত হবার।

তবে লক্ষ্য করলে এইসবগুলো সমস্যার মাঝে একটাই কমন ফ্যাক্টর পাওয়া যাবে, আর সেটি হলো চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের জন্য নতুন। ফলে এদের কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে, সেটাও আমাদের অজানা। অজানা বিষয় নিয়ে আতংক একটু বেশীই ছড়ায়। চারিদিকের দিশেহারা ব্যাপারটা মূলত এই জন্যই।

আমার অবজারভেশন বলে Computer litteracy বিষয়ে বাংলাদেশের বাবা-মাদের মোটামুটি দুটো দলে ভাগ করা যায়। প্রথম দলের বাবা মাদের Computer litteracy একেবারেই নেই বা থাকলেও সেটা না থাকার পর্যায়েই পড়ে। আর দ্বিতীয় দলের বাবা-মায়েদের যথেষ্ট Computer litteracy থাকা সত্ত্বেও সময় বা সদিচ্ছার অভাবে তারা তাদের এই স্কীলটি সন্তানকে বড় করার কাজে ব্যবহার করছেন না। প্রথম দলকে নিয়ে আদৌ কিছু করার আছে কি না, সেই বিষয়ে আমি সন্দিহান। আমার প্রশ্নটা দ্বিতীয় দলের কাছে। আপনারা কিভাবে জেনে শুনে সন্তানের হাতে কম্পিউটারের মতো শক্তিশালী একটি অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন কোন প্রপার ট্রেনিং এবং মনিটরিং ছা্ড়াই?

আচ্ছা বাদ দিলাম টেকনলজির কথা, আজ না হয় শুধু এথিক্সের কথাই বলি। বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে আপনি আপনার সন্তানকে শেখান রাস্তায় কিভাবে সাবধানে চলতে হবে, বড়দের সাথে কেমন আচরন করতে হবে, কিভাবে অসৎসঙ্গ থেকে নিজেকে দূরে থাকতে হবে। প্রতিদিনের জীবনের পাশাপাশি, অনলাইন জগতেও যে কিছু আচার-আচরন, নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয় সেটা কি একবারও আপনার সন্তানের সাথে বসে আলোচনা করেছেন? যেহেতু জগতটা ভার্চুয়াল, সুতরাং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ ধরে নেয় এখানে মানুষের মতো আচরণ করাটা খুব একটা জরুরী নয়। এখানে বেনামে একাউন্ট খুলে অন্যকে গালী দেয়া যায়, মেয়েদের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ করা যায় এমনকি ভূয়া পরিচয়ে অন্যকে ধোঁকাও দেয়া যায়। যেহেতু এগুলো আচরণ থেকে সামাজিকভাবে হেনস্থা হবার সম্ভাবনা কম, তাই এগুলো বিষয়ে পিতামাতার মাঝে অপেক্ষাকৃতভাবে সচেতনতাও কম।

এর সাথে ভয়াবহভাবে যোগ হয়েছে ফেসবুক, টুইটার কিংবা ইন্সট্যাগ্রামের মতো সোশাল মিডিয়া। যেখানে লাইক আর বন্ধুর সংখ্যাই নির্ধারন করে একজনের সোস্যাল স্ট্যাটাস। আজকাল শুনি বাসার কাজের বুয়া আর ড্রাইভারেরও ফেসবুক একাউন্ট আছে। সেটা থাকতেই পারে-তাতে আমার কোন আপত্তি থাকবার কথা নয়। ধরে নিচ্ছি ইনারা সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক। আমার আপত্তিটা তখনই যখন আমি আমার আত্নীয় এবং বন্ধু মহলের অনেকেরই ১৩ বছরের কম বাচ্চাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দেখি। কারো কারো তো প্রোফাইল পিকচার হলো হাতে ফিডার নিয়ে বালিশে শুয়ে দুধ খাচ্ছে :).

আপত্তিটা আমার এখানেই। ফেসবুকের নিয়ম অনুযায়ী একাউন্ট হোল্ডারদের বয়স হতে হবে কমপক্ষে ১৩ বছর। আপনার বাচ্চা বা আপনি যখন আপনার বাচ্চার হয়ে তার নামে ফেসবুকে একাউন্টটি খুলছেন, তখন হয় আপনি বাচ্চার বয়স নিয়ে মিথ্যাচার করছেন, অথবা আপনার বাচ্চাটির মিথ্যাচার করা দেখেও সেটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। আবার অনেক ছেলেমেয়েকে দেখি ফ্রেন্ড লিষ্টে বাবা-মা থাকা সত্ত্বেও তারা ভয়াবহরকম আপত্তিকর ছবি আপলোড অথবা অভব্য আচরণ করছে। বাবা-মা হয়তো বাচ্চাদের অবজার্ভ করছেন, এটা বোঝানোর জন্যই তাদের ফেসবুকে ফ্রেন্ড হয়েছেন। কিন্তু যেহেতু তিনি নিয়মিত মনিটর করছেন না, সেক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের মনে হতেই পারে, বাবামা তো দেখছেই আমি কি করছি। যেহেতু উনারা কিছু বলছেন না, তার মানে আমি ঠিক পথেই আছি। এটাও কিন্তু খুবই ভয়াবহ একটি বিষয়। তাই মনিটরিং বা ট্রেনিং যেটাই বলি না কেন communication টা essential

আমি কোন বিশেষজ্ঞ নই। তবে একজন মা হিসেবে আমি শিখতে চেষ্টা করছি। প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙছি, আবার নতুনভাবে গড়ছি। লেখাটা পুরোটাই আমার ব্যাক্তিগত পর্যবেক্ষন। কারো কোন ভিন্ন মতামত থাকলে অনুগ্রহ করে জানাবেন। আমি শিখতে আগ্রহী। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার যুদ্ধে আমরা সবাই সহযাত্রী।

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান