নদী শাসন নিয়ে কথা   

Tue, Oct 10, 2017 2:29 PM

 নদী শাসন নিয়ে কথা   

 মোঃ এমদাদুল  হক বাদশা : নদী মাতৃক বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও  নদী ভাঙ্গন রোধ এবং নৌ-চলাচলের সুবিধার্থে ড্রেজিং এর  জন্য সরকার সব সময়ই  অনেক অর্থ ব্যয় করে থাকে । এতে  কিছু কাজ হয় কিন্তু এই  গরীব দেশে মহান আল্লাহপাক প্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ সাধারণ বাঁশ-চাটাই-গাছপালা-পাটের রশি ইত্যাদি দেশীয় অতি স্বল্প  মূল্যের জিনিসপত্র দিয়েও যমুনা, ব্রহ্মপুত্র,  পদ্মা/গঙ্গা, আপার মেঘনা, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বান্ডালিং করে নদী শাসন, নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ,  নাব্যতা বৃদ্ধি এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ  সম্ভব! এতে  ড্রেজিং থেকে প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ অর্থ  ব্যয় হবে । এটাকে  প্রাকৃতিক ড্রেজিং(Natural  Dredging)   বলা হয় ।  তবে ড্রেজিং অবশ্যই করতে হবে কারন সব নদীতে সব সময় বান্ডালিং করে ভাল ফল পাওয়া যবে না । এ ব্যাপারে বুয়েটের ওয়াটার এন্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউট+নদী গবেষোণা ইন্সটিটিউট এবং বিআইডব্লিউটিএ  নৌপথ  সংরক্ষণ ও  পরিচালন বিভাগের প্রাক্তন কর্মকর্তাদের যথেষ্ট বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে । গত ৩০ আগস্ট বুয়েটের আইডব্লিউএফএম ইন্সটিটিউটের প্রফেসার সাইফুল ইসলাম দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় লিখেছেন Dredging can be conducted natural ways such as applying  Bandalling techniques  which use locally available materials like Bamboo, wood etc. Other low-cost natural dredging options can be explored  to improve  water conveyance capacity  of the river and reduce flood peaks .   বান্ডালিং এর উপর বুয়েটের পানি সম্পদ ও বন্যা নিয়ন্রণ ইন্সটিটইউটের  ৩ জন বিশেষজ্ঞ+জাপানের কিওটো বিশ্ব বিদ্যালয়ের  প্রফেসার হাজিমি নাকাগাওয়া ও প্রফেসর  তাইসুকি ইশিগাকি ২০০৪-০৫ সালে ফরিদপুরস্থ নদী গবেষণা ইন্সটিটিউটের  সহযোগিতায় গবেষণা করে মতামত  ব্যক্ত করেন যে, নৌপথের নাব্যতা সংরক্ষণের জন্য ড্রেজিং করা  বান্ডালিংযের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশী ব্যয় বহুল এবং যমুনা/ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা/গঙ্গা, আপার মেঘনা, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে ড্রেজিং টেকসই হয় না কারণ তা এক বছরও  টিকে না । বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ছিল—“ নদীর নিরাপদ নাব্যতা+গভীরতা সংরক্ষণের জন্য ড্রেজিং এর চেয়ে বান্ডালিং অনেক কম ব্যয় সাপেক্ষ যমুনা-পদ্মা/গঙ্গা-সুরমা-কুশিয়ারার  মত পলিমাটিযুক্ত নদীগুলোতে ড্রেজিং করে এক মৌসুমও টেকসই রাখা সম্ভব নয় নদীর নাব্যতা অব্যাহত রাখার জন্য বান্ডাল অথবা ড্রেজিং ও  বান্ডালিং এর  যৌথ কার্যক্রম গ্রহন করা যেতে পারে বান্ডালিং এর সাহায্যে নদীর গভীরতা ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যেতে পারে

  বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বান্ডালিংযের  প্রয়োজনীয়তা  সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ্ররা  আরও  বলেন যে, এই দুর্দশা লাঘবের জন্য  বান্ডালিং কাজের নীতিমালার উপর ভিত্তি করে ক্রমান্যয়ে দীর্ঘ মেয়াদী ভিত্তিতে নদীর গতিপথ শিতিশীল করার পদক্ষেপ গ্রহন করা যেতে পারে ।  স্পার-ডাইক-লাইক স্ত্রাকচার ( Spur-dyke-Like structures  (Rahman & Muramoto, 1999) স্থাপনের দ্বারা নদীর স্বাভাবিক  গতি প্রবাহ বাঁধা প্রাপ্ত হয় এবং পরবর্তীতে এসব  প্রতিবন্ধকতা অনেক বড় আকারে ক্ষতির কারণ হয়ে থাকা। ফলে জল-প্রবাহ দীর্ঘ মেয়াদীভাবে    স্থিতিশীল হতে পারে না নদীর পার্শাভিমুখীন ডিরেকশনে বান্ডালিং এর ফলে নদীর স্বাভাবিক  গতি প্রবাহ অনেক কম ক্ষতিগ্রস্থ হয় বিধায় নদীপথ সমন্বয় সাধন ও  তীরভূমি উন্নয়নের জন্য অনেক সময় পায় পলিমাটিযুক্ত নদীতে বান্ডালিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে নদীর নাব্যতা এবং গভীরতা  বৃদ্ধি  পায় .    বান্ডালিং করে উপরোক্ত  নদীগুলোতে ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত গভীরতা বৃদ্ধি করা সম্ভব. এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর তীর ভাঙ্গন রোধ, নৌচলাচল সুগম করা এবং মৎস চাষ  ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও  রক্ষা করা যাবে । কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে সরকার ড্রেজিং এর উপর জোর দিতে যেয়ে কম খরচে বান্ডালিং এর  কথা ভুলে গেছে বিধায় গত ২-৩ বছর যাবত বিআইডব্লিউটি এর আরিচা থেকে চিলমারী-দইখাওয়া (সীমান্ত) এবং  সুরমা-কুশিয়ারা নদীতে ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত, অতি অল্প ব্যয়ে বান্ডালিং করে নাব্যতা বৃদ্ধির  কাজটি ছেড়ে দিয়ে নদীগুলির নাব্যতা হ্রাসে অবদান রাখছে । নদী গবেষণা ইন্সটিটিউটের এক পরিসংখানে দেখা যায় যে, যমুনা নদী তীর রক্ষার জন্য প্রিত মিটার বান্ডালিংযের জন্য ব্যয় হয় মাত্র ৭০ ডলার আর আরসিসি স্পার এর জন্য ৯৫০ ডলার, রিভেটমেন্টের  জন্য ৩৮০০-৪০০০ ডলার, সলিড স্পারের জন্য ২৫০০ ডলার, সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্ট এর জন্য প্রতি মিটারে  খরচ পড়েছে ২১,০০০ ডলার এবং যমুনা ব্রিজের গাইড বাঁধের জন্য প্রতি মিটারে ব্যয় হয়েছে ৩৩,০০০ ডলার ।  

   বি আইডব্লিউট  বছরে মাত্র ৪০-৫০ লক্ষ টাকার বাজেট দিয়ে আবার অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জটিল প্রক্রিয়ার ফলে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশী বিধায় মাঠ কর্মকর্তারা কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার কারণে গত ৩ বছর যাবত বান্ডালিং হচ্ছে না—ফলে নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে এবং বন্যার ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ।  অথচ ১৯৮৮ সালে হল্যান্ডের ডি এইচ ভি রিপোর্টে  বান্ডালিং এর উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ  করে তখনকার বাৎসরিক ২০ লক্ষ টাকা থেকে ২ কোটি  টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য বিদেশী বিশেষজ্ঞ্ররা  জোর  সুপারিশ করা স্বত্বেও  কর্তৃপক্ষ বান্ডালিং এর জন্য গুরুত্ব  দেয়নি । গত অর্থ বছরে নদী গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালকের অনুপ্রেরণায় আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ৬৫ লক্ষ টাকার একটি বান্ডালিং  প্রকল্প নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধের জন্য দাখিল করি কিন্তু ৬৫ লক্ষ টাকার মধ্যে  মাত্র ২ লক্ষ টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যার প্রায় অর্ধেক চলে যায় আনুসাঙ্গিক ব্যয়ে । অথচ অনান্য প্রকল্পের জন্য কত হাজার হাজার কোটি  টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে । কিন্তু ড্রেজিং সহায়ক বান্ডালিং এর  জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে ১ হাজার কোটি টাকার কাজ হওয়ার  সমুহ সম্ভাবনা রয়েছে । আমাদের মাননীয় প্রধান্মন্ত্রী এসব গবেষণামূলক অতিব জরুরী অপরিহার্য কাজের জন্য বিশেষ গুরুত্বারোপ  করা সত্যেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বান্ডালিং কাজে ন্যুনতম বরাদ্দ দিতে চান না ।।   সত্যিই সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ !!!

   দেশের  বৃহত্তর সার্থে অবিলম্বে খুব কম খরচে নদী শাসন, নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ এবং  নিরাপদ্ ভাবে  সারা বছর নৌ- চলাচলের সুবিধার্থে  নৌপরিবহন, পানি সম্পদ, বিজ্ঞান ও  প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বুয়েট, নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট ও বিআইডব্লিউটিএর  নৌপথ  সংরক্ষণ-পরিচালন বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে  যৌথ সভা করে  স্বল্প  ব্যয়ে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বান্ডালিং কাজে প্রয়োজনীয়  অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য জোর  সুপারিশ করছি । আল্লাহপাক যাদের ক্ষমতা দিয়েছেন তাদেরকে দেশের সার্থে কাজ করার তওফিক  এনায়েত  করুন ।।  আমীন+ছুম্মা আমীন।।  কারণ আল্লাহপাক তাওফিক না দিলে কেউ নেক আমলও  করতে পারে না এবং  গুনাহ থেকেও বাঁচতে  পারে না ।।  

  লেখক  নদী গবেষক, সাবেক পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ.  emdadulbadsha@yahoo.com


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান