একমাত্র জাসদই পালন করতে পারে ৭ নভেম্বর, বিএনপি নয় 

Sat, Oct 7, 2017 5:41 AM

একমাত্র জাসদই পালন করতে পারে ৭ নভেম্বর, বিএনপি নয় 

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহল্ম: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত ও চাকুরীরত কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তা। কেউ কেউ একে সামরিক অভ্যুত্থান বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। আসলে ১৫ আগস্ট দেশে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হয়নি, হয়েছে উচ্সৃঙ্খলতা, অরাজকতা ও দুস্কৃতিকারী দ্বারা অতর্কিত হামলা। যারা সেদিন এই কাজটি করেছিল তাদের প্রায় সকলই সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে আগে থেকেই বহিষ্কৃত ছিলেন। তাদের এই বেক্তিগত আক্রোশকেই কাজে লাগিয়েছিল দেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্টি, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি ও সি আই এ। কারণ এইসময় বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক পথে পা রেখেছিল যা সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা কখনো মেনে নিতে পারেনি, ভালো চোখে দেখেনি।

 

১৯৭৫ জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যখন সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ হিসেবে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাকশালে যোগদান করেছিলেন। তবে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর চেয়ে সিনিয়র হওয়া সত্তেও তাকে সেনা প্রধান না করাতে তিনি প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর উপর খুবই মনক্ষুন্ন ছিলেন। অনেকে মনে করেন জিয়াকে সেনা প্রধান করলে হয়তো তিনি অনেক আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করতেন। কারণ জিয়া ছিলেন একজন ক্ষমতালোভী, উচ্চুবিলাসী বেক্তি। অতীতে তার বিভিন্ন কার্যকলাপে তা প্রমানিত করেছে। এবেপারে জেনারেল শফিউল্লাহ সুইডেনে রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন আমার সাথে এক সাক্ষাতকারে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই জিয়া ছিলেন অত্যন্ত উচ্চভিলাষী। তিনি একসময় জেনারেল ওসমানীকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই মুক্তিযুদ্ধের সেনা প্রধান হতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়ার বিভিন্ন ভূমিকা উচ্চভিলাষী ও ক্ষমতালোভী হিসেবে প্রকাশ পায়। জিয়া জেনারেল ওসমানীকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে সফিউল্ল্হার সাথে আলাপও করেন বলে তিনি জানান। শফিউল্লাহ সরাসরি জিয়ার এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। শফিউল্লাহ বলেন, জিয়া আমার কাছে এধরনের একটা প্রস্তাব দিলে আমি রেগে গিয়ে এবিষয়ে আমার সাথে আর কথা না বলার জন্য বলি। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল জিয়া। এইসময় মুক্তিযুদ্ধের সরকারের প্রতি জিয়ার আনুগত্যতা নিয়ে সরকারের মধ্যেও ছিল নানা প্রশ্ন বলে জেনারেল শফিউল্লাহ মন্তব্য করেন।

 

১৯৭১ সালে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকালে জিয়া নাকি নিজেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেক্তি হিসেবে একবার ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের চাপের মুখে তিনি তা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। জিয়ার এসকল ভূমিকার কারণে মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা জিয়াকে খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও একজন ক্ষমতালোভী অফিসার হিসেবে দেখেন। শুরু থেকেই জিয়ার প্রতি এধরনের সন্দেহ থাকার কারণে বঙ্গবন্ধু সরকার জিয়াকে সেনা প্রধানের দায়িত্ব না দিয়ে শফিউল্লাহকে দিয়েছিল। আর এটাই জিয়া কখনই সহ্য করতে পারেননি। তিনি শুধু সময় ও সুযোগের সন্ধানে ছিলেন। চতুর জিয়া কখনই তার এই মনক্ষুন্নতা প্রকাশ করেননি। তবে ভেতরে ভেতরে গোপনে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে সেনা বাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেন বলে  অনেকে  মনে  করেন। আর এজন্য কৌশলে সেনাবাহিনী ও রক্ষী বাহিনীকে জড়িয়ে নানা অপপ্রচার চালানো হয়েছে। অনেকের ধারণা এসকল অপপ্রচার কারা করছে সে বেপারে জিয়া ভালো ভাবেই অবগত ছিলেন।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালীন সামরিক বাহিনীতে তার বিরুদ্ধে কয়েকবার বের্থ অভ্যুত্থান হয়েছে। এই কারণে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঐসময় একে অপরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে। পরবর্তিতে অভ্যুথানকারী এসকল মুক্তিযুদ্ধা অফিসারদের জিয়া ফাসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন। জিয়ার হুকুমে নিহত অনেক অফিসারের পরিবার এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাদের এখন এবেপারে এগিয়ে এসে সবকিছু তুলে ধরে জিয়ার আসল চরিত্রের মুখোস উন্মোচন করা উচিত বলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি মনে করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কৌশলে জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল না করলে দেশে এত সামরিক অফিসার কখনো হত্যা হতো না বলেই পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। শুধুমাত্র ক্ষমতাকে আক্রে রাখার লক্ষে তিনি যাকেই সন্দেহ করেছেন তাকেই ঠান্ডা মাথায় হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার এই হত্যা শুরু হয় কর্নেল (অব:) তাহেরকে ফাসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। অথচ এই তাহেরই তাকে একসময় জেল থেকে মুক্ত করেন। পরবর্তিতে জিয়া কর্নেল (অব:) তাহেরকে ফাসিতে ঝুলিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বাংলাদেশ দুতাবাসে চাকুরী দিয়ে পুরস্কৃত করেন। এখানেই পরিষ্কার হয়ে আসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জেনারেল জিয়ার সম্পর্কতা।

 

তবে তাহেরের ৭ নভেম্বরের সিপাই বিদ্রোহের বেপারে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি নিজেই নিজের ফাদে পড়েন বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। সেদিন সাধারণ সিপাইদের উচকিয়ে দেওয়ার কারণে কেন্টনমেন্টের ভেতরে তারা অনেক অফিসারকে হত্যা করে। এতগুলো নিরীহ অফিসার হত্যার জন্য অনেকে সরাসরি কর্নেল (অব:) তাহেরকে দায়ী করে থাকেন। এইসময় অনেক অফিসার কেন্টনমেন্ট থেকে প্রানের ভয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। কর্নেল তাহের ৭ নভেম্বর সিপাইদের নিয়ে বিদ্রোহ না করলে কারাগারে বন্দী জিয়াকে বঙ্গবন্ধু হত্যার দোষে বিচারের সন্মুক্ষীন করা হতো। খালেদ মোশাররফ তাকে সরাসরি হত্যা না করে গ্রেফতার করার কারণই ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার সকল রহস্য জিয়ার মুখ থেকে বের করে আনা। কিন্তু সেই সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। কর্নেল তাহেরের সিপাই বিদ্রোহ সবকিছু উলট পালট করে দেয়। পরবর্তিতে জিয়ার বিচার হওয়াতো দুরের কথা উল্টো তাকে বীরের মত মুক্ত করে এনেছিলেন কর্নেল (অব:) তাহের। চতুর জিয়া মুক্তির পর আর অপেক্ষা না করে সুযোগ বুঝে তার জীবন রক্ষাকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব:) তাহেরকে ফাসিতে ঝুলিয়ে দেন।

 

ঐতিহাসিক দৃষ্টি কোন দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে ৭ নভেম্বর আসলে ছিল জাসদ সমর্থিত কর্নেল (অব:) তাহেরের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া একটি সিপাই বিদ্রোহ। যার নাম দেওয়া হয়েছিল সিপাহী জনতা বিপ্লব। এই তথাকথিত বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি শুধু বন্দী জিয়াকে মুক্ত করে সেনা প্রধান বানাতে পেরেছিলেন আর কিছুই নয়। সেনা প্রধান হওয়ার পর জিয়া কৌশলে কর্নেল (অব:)  তাহেরের সিপাহী জনতা বিপ্লবের অন্যান্য পরিকল্পনাগুলো আর সফল হতে দেননি। সুতরাং কর্নেল (অব:)  তাহেরের সিপাহী বিদ্রোহের কারণে ৭ নভেম্বরকে জাসদের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন বলা যেতে পারে, কিন্তু বিএনপির জন্য কিছুই ছিল না। অথচ মিথ্যা ইতিহাসের বদৌলতে দিনটিকে এখন পালন করছে বিএনপি। তারা বলছে এই দিন তাদের নেতা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনা হয়েছিল। একেবারে সত্য কথা। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কে করেছিল এই মুক্তি? এইদিন বিএনপি কেন ভুলেও কথাও তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মুক্তিদাতা কর্নেল (অব:) তাহেরের নাম উচ্চারণ করে না। পচাত্তরের পরবর্তিতে এভাবেই দেশের জনগনকে এক বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিএনপির জন্য যদি ৭ নভেম্বর পালন করতে হয় তাহলে সবার আগে শ্রদ্ধার সাথে কর্নেল (অব:) তাহেরকে স্মরণ করতে হবে, যিনি তাদের নেতাকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি কি তা করছে ? করছে না। কারণ সত্য সামনে আসলে  তাদের নেতা জিয়াকে মরণোত্তর বিচারের কাঠ গড়ায় দাড়াতে হবে। যে দাবি আজ হাসানুল  হক ইনু সহ জাসদের নেতারা করছেন।

 

সব কথার শেষ কথা হলো ৭ নভেম্বর ছিল কর্নেল (অব:) তাহেরের নেতৃত্বে একটি সিপাই বিদ্রোহ, বিএনপির কোনো দিবস নয়। দিনটি জাসদ নেতা কর্নেল (অব:) তাহেরের সিপাহী বিদ্রোহের দিন। এজন্য একমাত্র জাসদই পালন করতে পারে ৭ নভেম্বর, বিএনপি নয়। বিএনপি যদি জিয়ার মুক্তি দিবস উপলক্ষে ৭ নভেম্বর পালন করে তাহলে জিয়ার মুক্তিদাতা কর্নেল (অব:) তাহেরকে তাদের শ্রদ্ধা ও সন্মানের সাথে স্মরণ করতে হবে। এখন আর মিথ্যা ইতিহাস রচনা করে জনগনকে ধোকা দেওয়া যাবে না। সুতরাং বিএনপির ৭ নভেম্বর পালন থেকে দুরে সরে আসাই হবে সবচেয়ে উত্তম কাজ। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে বিএনপি আর কতদিন রাজনীতি করবে?


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান