রোহিঙ্গা : আমাদের ‘মানবিক চেহারাটা’মুছে যাবে না তো?

Tue, Oct 3, 2017 11:07 PM

রোহিঙ্গা : আমাদের ‘মানবিক চেহারাটা’মুছে যাবে না তো?

শওগাত আলী সাগর: যুক্তরাজ্যের ১৩টি এনজিও যৌথভাবে একটি প্রচারনায় যাচ্ছে।বৃটিশ  টেলিভিশনগুলোতে প্রচারের জন্য ভিডিও তৈরি হয়ে আছে। সেই ভিডিওতে আছে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র। ‘ডিজএষ্টার ইমার্জেন্সী কমিটির(ডিইসি)’  নামে ইতিমধ্যে তারা নাগরিকদের কাছে সহায়তার জন্য হাত পাততেও শুরু  করেছে। বৃটিশ সরকার বলেছে, নাগরিকদের দেওয়া প্রথম তিন মিলিয়ন পাউন্ডের  সমান তারাও  যোগ করে দেবেন।

বৃটেনের শহরগুলোতে  বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য তোলা হচ্ছে- এই দৃশ্যটায় দোষের কিছু নেই। আমি ভাবছি ১৩টি এনজিও’র  সমন্বয়ে যে ভিডিও  ক্যামপেইন লন্ডনের টেলিভিশনগুলোতে প্রচারিত হবে- সেখানে কোন বাংলাদেশকে তুলে ধরা হবে? শরণার্থীদের  জন্য তহিবল সংগ্রহ করতে হলে তাদের দুরাবস্থার চিত্রটাই তো দেখাতে হবে।  রোহিঙ্গাদের জন্য ঘরের দরোজা খুলে দিয়ে, এক বেলা না খেয়ে থাকার ঘোষনা দিয়ে সারা বিশ্বে আমরা নিজেদের যে মানবিক চেহারাটা তৈরি করে ফেলেছিলাম, ক্ষুধার্ত, অসুস্থ রোহিঙ্গাদের আহাজারি সম্বলিত প্রচারনা আমাদের সেই মানবিক চেহারাটকে মুছে দেবে না তো?  

যুক্তরাজ্যের বেশ কয়েকটি এনজিও কক্সবাজারে শরণার্থীদের সহায়তায় নিয়োজিত আছে। ফলে সেখানকার সত্যিকার অবস্থা তারা জানে। জানে অন্যান্য দেশের এনজিওরাও। কানাডার সেভ দ্যা চিল্ড্রেনের হিউম্যানেটারিয়ান ম্যানেজার কাইল তার অভিজ্ঞতার বিবরন দিয়েছেন কানাডার পত্রিকা টরন্টো স্টারে। তিনি খোলামেলো বলেছেন, কক্সবাজার হচ্ছে এই পৃথিবীর নরক। রোহিঙ্গাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সেখানকার অবস্থাকে নরক হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি।

সেভ দ্যা চিল্ড্রেনের  এই কর্মকর্তাও বলেছেন, কক্সবাজারে এখন তহবিল দরকার। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন দেওয়ার, অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার, বিশুদ্ধ পানি দেওয়ার ব্যবস্থা দরকার। কিন্তু প্রয়োজন অনুসারে এগুলোর সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংকটের আশংকা করছেন তিনি। দুর্গত এলাকায় সহায়তা দিতে গিয়ে এখন তাকে তহবিল সংগ্রহের চিন্তাও করতে হচ্ছে। তাই তিনি কলম হাতে তুলে নিয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতার বিবরন দিয়ে কানাডা সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘ তো গত কয়েক দিন ধরেই অর্থের যোগান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে নতুন করে কোনো রাষ্ট্র কোনো সহায়তার কথা বলেছে বলে শুনিনি। জাতিসংঘ অনুনয় বিনয় করে যাচ্ছে,সেদিকে কেউ কান দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে এনজিওগুলো মাঠে নামছে সাহায্য সংগ্রহের জন্য।

এক বেলা কম খেয়ে রোহিঙ্গাদের খেতে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া বাংলাদেশ কি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের অবস্থার খোঁজ খবর রাখে? সরকারের মন্ত্রী নীতিনির্ধারকদের কথাবার্তায় সেটা মনে হয় না। কক্সবাজারে যে একটা সংকট তৈরি হয়েছে, সেই সংকট মোকাবেলায় এনজিওগুলো বিশ্বের দেশে দেশে সাহায্যের হাত পাততে শুরু করেছে- সেই খবর সরকারের কাছে আছে কি না তা পরিষ্কার না। কিন্তু বাংলাদেশ এ নিয়ে তেমন কোনো কথা বলছে না। তারাও কোথাও কোনো সাহায্য চাচ্ছে না। সত্যি। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার।

গত কয়েক দিনে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরের  সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া ঢাকার কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে টেলিফোনে কথা হয়েছে। প্রত্যেকেই সেখানকার অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা বলেছেন। কিন্তু ঢাকার মিডিয়ায় সেই দুর্ভোগের চিত্রটা নেই। ‘কেন নেই’- এই প্রশ্নও করেছিলাম কাউকে কাউকে। বেশ কয়েকজনই বলেছেন, রোহিঙ্গা শিবিরের বাস্তব অবস্থা লিখতে শুরু করলে সরকার ভাববে আমরা নেগেটিভ নিউজ করছি।

‘নেগেটিভ নিউজ’ এর অপবাদ এড়াতে ঢাকার সাংবাদিকদের অনেকেই কক্সবাজারের ‘নেগেটিভ অবস্থার’ সংবাদ পরিবেশন করছেন না। কিন্তু সেই সংবাদগুলো চলে যাচ্ছে বিদেশে। বিদেশি সংস্থার নির্বাহীরা সাক্ষাতকার দিয়ে, পত্রিকায় কলাম লিখে, বিবৃতি দিয়ে কক্সবাজারের নারকীয় দুরাবস্থার চিত্র জানাচ্ছেন বিশ্ববাসীকে। জানাচ্ছেন- কারন, তাদের অর্থ দরকার। তাদের এই ভাবনটা ভাবতেই হচ্ছে, কেননা তাদের সামনে লাখ লাখ ক্ষুধার্ত, অসুস্থ মানুষের হাত। সেই হাত তারা খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে পারছেন না।

ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার তহবিল যোগাতে উন্নত দেশগুলোতে সাহায্যকর্মীরা  কক্সবাজার নিয়ে যে ক্যাম্পেইনে নামছেন, সেই প্রচারনা আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে কোথায় দাঁড় করাবে- তে ভেবে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছি না।

লেখক: শওগাত আলী সাগর, নতুনদেশ এর প্রধান সম্পাদক।

আরো পড়ুন: কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এখন পৃথিবীর নরক


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান