এস কে সিনহা ট্র্যাজেডিঃ ইতিহাসের অমোচনীয় দাগ

Tue, Oct 3, 2017 7:46 AM

এস কে সিনহা ট্র্যাজেডিঃ ইতিহাসের অমোচনীয় দাগ

মাসকাওয়াথ আহসান : প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তাঁর স্বাভাবিক ছুটি কাটিয়ে আসার পর আবার এক মাসের ছুটি নিলেন। বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিক বলে বর্ণনা করলেন সরকারের এটর্নি জেনারেল। তিনি জানালেন, ষোড়শ সংশোধনীর সঙ্গে এ ছুটির কোন সম্পর্ক নেই।

বিচারপতি এস কে সিনহা ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণে; বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরার প্রেক্ষিতে তাঁকে নানা অসাংবিধানিক ভাষায় আক্রমণ করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা থেকে উলু-খাগড়া কর্মী-সমর্থকের একটি বড় অংশ। একজন প্রধান বিচারপতি একটি রায়ের পর্যাবেক্ষণে নিজস্ব অভিমত উপস্থাপনের কারণে এমন হিংস্র ও আদিম রোষের শিকার হবার ঘটনা পৃথিবীতে এই প্রথম। সভ্য জনপদের কোন মানুষ কল্পনাই করতে পারবে না যে একজন প্রধান বিচারপতিকে এমন অভব্য ভাষায় গালাগাল করা যায়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি সার্বভৌম স্তম্ভ এর বিচার বিভাগ। গত সেনা সমর্থিত এক এগারো সরকারের সময় নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির একটি রায়ের পর্যবেক্ষণ লেখারও স্বাধীনতা নেই; এটি প্রমাণিত হলো আওয়ামী লীগের এই টুটি চেপে ধরা আচরণ ও প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে সরে যাবার পরিবেশ সৃষ্টি করার কারণে। সুতরাং বিচার বিভাগ পরাধীন এই বাস্তবতা উপলব্ধির স্মারক প্রধান বিচারপতির এই অসহায়ত্ব।

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ষোড়শ সংশোধনীর পর্যবেক্ষণে ঠিক যেরকম গণতন্ত্রহীনতা ও একনায়কত্ব আর মেধার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনায় বিশীর্ণ বাংলাদেশ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন; তা খুব অল্প সময়ের মাঝেই প্রমাণ করে ফেললো যেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ।

প্রধান বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করে বললেন, আমরা যদি সত্যিই আমাদের জাতির জনকের পরিকল্পিত সোনার বাংলা গড়ার ব্যাপারে আন্তরিক হই; তাহলে আমাদের আমিত্ব বা আমিই সব এই মনোভাব বর্জন করতে হবে। বক্তব্যটি ইংরেজিতে লেখা; ফলে অধিকাংশ মানুষ সেটার অর্থ বুঝলো না। পবিত্র কোরান শরিফ আরবিতে লেখা হওয়ায় যেমন অধিকাংশ মানুষ এর অর্থ বোঝে না; ফলে এর অর্থ বিকৃত করে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করে ধর্ম-ব্যবসায়ী মোল্লারা; ঠিক একই রকম ঘটালেন রাজনীতি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে প্রধান বিচারপতির ইংরেজিতে লেখা পর্যবেক্ষণের অর্থ বিকৃত করে।

প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ অভিযোগ আনলো, প্রধান বিচারপতি বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করেছেন। এই "অবমাননা" শব্দটি সবচেয়ে বেশীবার ব্যবহৃত ধর্ম ও রাজনীতি ব্যবসায়। সুতরাং "বঙ্গবন্ধু" অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে তাকে তুমি-তুই-তোকারিসহ গালাগাল করে আওয়ামী লীগ এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে; যেন প্রধান বিচারপতি "গণশত্রু"। এটাই আওয়ামী লীগের অত্যন্ত পরিচিত প্যাটার্ণ। দলটি ইতিহাসে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখলেও সমসাময়িক সভ্যতার আলো আহরণ করতে পারে নি। ফলে ফিরে গেছে মধ্য যুগে।

এরপর প্রধান বিচারপতিকে আওয়ামী লীগের প্যাটার্ণ অনুযায়ী "গান্ধা কইরা দিতে" তাঁর নাম বিএনপি জামাত আর ছাই ফেলতে ভাঙ্গাকূলা পাকিস্তানের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে "গভীর ষড়যন্ত্রের" গল্প হাজির করে ক্ষমতাসীন দলের গুজব সেনারা। গ্রামে মাতবর শ্রেণীর লোকেরা একটু শিক্ষিত-সচেতন-স্পষ্টবাদি মানুষকে টাইট দিতে বা গ্রামছাড়া করতে মেথরকে দিয়ে ঐ মানুষটির বাড়ির দরজায় মল-ভান্ড ঢেলে দিয়ে আসে। সেই "গু"জবের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কাউকে বিএনপি-জামাত-পাকিস্তানের চর বলে ট্যাগিং-এর গুজবের বেশ মিল। এছাড়া মাতবর সাহেবের লোকেরা টার্গেট করা লোকটির বাড়ির সামনে মুখে মাফলার বা গামছা বেঁধে ঘোরাঘুরি করে; গভীর রাতে লোকটির টিনের চালে ঢিল পড়ে। এরপর লোকটির বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়। এইসব সব ফর্মূলাই আওয়ামী লীগ ব্যবহার করে "নিরংকুশ আমিত্ব"-র নেশাটা জারি রাখতে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মে বিশ্বাসী একজন মানুষ প্রধান বিচারপতি হলেন। বিশ্বব্যাপী সুনাম হলো। বাংলাদেশ সব-ধর্মের মানুষের সম্মিলনে একটি সভ্য-আলোকিত সমাজ; এমন একটি ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হলো; প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে বিচার বিভাগের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করে ইতিবাচক কাজটি আওয়ামী লীগই করলো। কিন্তু ঐ যে আমিত্বের নেশা; নিরংকুশ প্রাধান্যের আসক্তি; তা আবার আওয়ামী লীগকে নিয়ে গেলো আদিম প্যাটার্ণে। ফলে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পক্ষে তাঁর দায়িত্ব পালন সম্ভব হলো না।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে "মানবতার মা" বলে স্বীকৃত হয়েছেন বিশ্বপরিসরে। বিশ্বসভায় প্রধানমন্ত্রীর সমবয়েসি জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যারকেল, বা ছেলের বয়েসি ক্যানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। উনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেই পারেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ব্যাপারটা কেমন; প্রধান বিচারপতি কেমন সম্মানিত মানুষ কিংবা কোন ব্যক্তির সঙ্গে মতের অমিল হলেই তাকে বিরোধী রাজনৈতিক বলয়ের লোক বা অন্যদেশের চর বলা যায় কীনা! "উইচ হান্টিং" গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই কীনা।

বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব নেতৃত্বে যেমন এগিয়ে গিয়েছেন; উনার দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি-শাসন সংস্কৃতি সেই অগ্রসরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কীনা। আর এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সঙ্গে আওয়ামী লীগের এই অনভিপ্রেত আচরণ; এবং তাঁর দায়িত্ব পালনের পরিবেশ না থাকা এবং ছুটি থেকে ফিরে আবার ছুটিতে যাবার ট্র্যাজেডি ইতিহাসের কালোদাগ হয়ে রইলো। এর জাস্টিফিকেশান বা যৌক্তিকতা উপস্থিত করা প্রায় অসম্ভব। এমনকি আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ায় ছুটি নিলেও; তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া কালো ঘটনাটি ইতিহাস থেকে মোছা যাবে না।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান