বীথির কাছে চিঠি-৩৩

Mon, Oct 2, 2017 6:46 AM

বীথির কাছে চিঠি-৩৩

লুনা শিরীন :এখন  টরোণ্টোতে কতটা লম্বা সামার তোর আন্দাজ আছে ? রাত সাড়ে আটটা –বাইরে ঝকঝকে বিকেল,  আলো এখোনো বাকা হয়নি, মানে সন্ধ্যা হবে রাত দশটায়আমার এই নেইবারহুড-টা একটা সাজানো বাগান , এত বেশী সুন্দর আর গোছানো যে দেখলে আমার ভিতরে শুধুই কান্না তৈরি হয়, মনে হয় আল্লাহ যদি আমাকে এত সুন্দর জীবনযাপনের  জন্য যোগ্যই করলো তাহলে  সেটা উপভোগ করার জন্য আমি একা কেন ? এই প্রশ্ন কিন্তু আমার একার না বিথী, কিছুতেই আমার একার না, এই শহরেই , এই  ছোট্ট  বাঙ্গালী  কমিউনিটিতে আমি অন্তত ২০ টা মেয়েকে চিনি, যারা  শুধু একজন ভালো সঙ্গী চায় আর কোন কিছুই না।  সিম্পল আর কিছুই তারা চায় না। বলে – লুনা একজন মানুষ যে সুদু সৎ ভাবে আমার পাশে থাকবে, আমার ব্যাপারে  বিশ্বস্ত হবে এবং আমাকে ভালোবাসবে , তার বদলে আমি ও  একই রকম বা তার চেয়েও বেশী   প্রতিশ্রুতি দিতে ১০০ ভাগ প্রস্তুত । তুই বল বীথি, এই টুকু চাওয়া কি খুব বেশী একজন মানুষ হিসেবে ?

আমি বিকেলে পথ হাঁটছিলাম একা একা আর কথা বলছিলাম তোর সাথে , ভাবছিলাম কথাগুলো তুলবো খুব বিনয়ের সাথে, কোন হাম্বারা ভাব বা কোন জেদাজেদির জায়গা থেকে না , খুব শান্ত মন আর মাথা নিয়ে জানতে চাইবো আমি যা জানতে চাচ্ছি বা বুঝতে চাচ্ছি সেটা ভুল কিনা ? শুরুতেই বলে নেই বীথি ,সবাই কিন্তু আমরা মানুষ, ভুল সবাই করতেই পারি, কিন্তু যদি ভুল বোঝার পরে কেউ মনে করি -না আমি এভাবেই চালিয়ে যাবো , সেটা কি ঠিক  বিহেব ? যে বিহেব আমরা জেনে বুঝে করি সেটাকে কি দিয়ে  বুঝ দেই নিজের কাছে ? বীথি , তুই খুব ভালো করে চিনিস আমাকে, আমি আজকে এই বয়সে অনেক অনেক কিছু করবো কিন্তু জেনেশুনে অন্যায়কে সাপোর্ট করা বা নিজে সেটার সাথে দিনের পর দিন জড়িত থাকা সেটা কিন্তু আমি করবো না, তাতে যদি আমাকে বাকী জীবন এক একা পাগলের মতো রাস্তায়  দাড়িয়ে কাদতে হয় তাও সই, কিন্তু আমি অন্যায় মানবো না, বিশেষ করে সম্পকের বিষয়ে যে অন্যায়গুলো চলতে  থাকে সেগুলোকে মানবো না কিছুইতেই ।

কেন তোকে এত কঠিন করে বলছি জানিস- গত পরশু আমাকে এক লোক ফোন করলো,(বছর ৫/৬ আগে আমি এসব নিয়ে এত বিচলিত হতাম না, কিন্তু যে কোন কারনেই হোক ইদানিং এসব কে আর সহজ ভাবে নিতে পারি না ) আমার  লেখা পরে ভালো লেগেছে তাই কথা বলত চায় । বেশ ভাল কথা , প্রথমদিন কথা বললাম, দ্বিতীয় দিন, এর পরের দিন। বেশ কিছুদিন অফ , তারপর আবার। আমি ভাবলাম – আচ্ছা দেখি  তো কথা বলে—বললাম, আপনার তো বঊ বাচ্চা আছে তাই না ? হ্যা আছে । আচ্ছা – বলুন তো আপনার বঊ যদি ঠিক এইভাবে অন্য কোন লোকের লেখা পড়ে তার সাথে  খাতির জমানোর  চেষ্টা করতো আপনি পছন্দ করতেন কাজটা ? বিশ্বাস কর বিথি, আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি সন্মান রেখে ধীরে ধীরে কথা বলতে,এবং লোকটাকেও আমার ভালোই মনে হলো , আমাকে বলে – না লুনা আমি পছন্দ করতাম না। আমি আবার বললাম, দেখুন কথাটা কিন্তু আমি আপনাকে বলিনি, প্লীজ অন্যভাবে নেবেন না, এটা কিন্তু আমি  মানুষের জেনারেল হ্যাবিট নিয়ে কথা বলছি। আমি নিজেও তো এই কাজটা করতে পারি তাই না, আপনি –ই বলেন, আমাদের সবার –ই তো গোল হ্যাপি থাকা তাই না ? আমরা কেউ কি এভাবে হ্যাপি হবো কোনদিন? কি ছেলে কি মেয়ে ? কি স্বামী বা স্ত্রী ? আমি আরো বললাম, দেখুন আমার বয়স এখন ৪৫ , এখন আর আমার সেই সময় নেই যে বসে বসে বন্ধুত রচনা করবো তাই না ?  আপনার পুরো পরিবারের সাথে  আমার বন্ধুত হতেই পারে, কিন্তু সুদু আপনার  সাথে কি সেটা হতে পারে? সেটা কি  নৈতিক ?

বীথি,বিকেলের আলো কমে আসছে , জীবনের নানান প্রতিূকুলতা সারাক্ষণ ঘিরে থাকে। আমরা কেউ এই বাস্তবতার বাইরে না ,কেঊ না, একটার পর একটা চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়াচ্ছে সামনে,যত দিন যাচ্ছে, ততই ভাবছি, ভার কি বেশী হয়ে  যাচ্ছে আমার ? আমি কি একাই সুদু  ভারী পাথরকে ঠেলে  ঠেলে পথ পাড় হচ্ছি ? না বীথি , আমি একা না, আরো অনেক রকমের , বিচিত্র রকমের  জীবন আছে মানুষের। কত বেশী টানাপড়েন আছে এক জীবনে মানুষের ভবলে বার বার নামাজের পাটি নিয়ে বসতে ইচ্ছে হয় আর নিজেকে বলতে হয় – আল্লাহ তোমার দরবারে শুকরিয়া। ওই যে বললাম, ২০ টা মেয়ে , তার ভিতরেই একটা  মেয়ের নাম মুনা, কি ভীষন ভালো আর মিষ্টি মেয়ে ভাবতে পারবি না, অনেক দিন একা থাকার পরে মুনা বিয়ে করেছিলো ভালোবেসে, মাত্র ২ বছর সংসার করার পরে এক  তীব্র বরফের রাতে মুনার পাশে সুয়েই স্বামী রতন মারা যায়। একা ঘরে স্বামীকে নিয়ে অপ্পেখা কোরতে হয়েছিলো মুনাকে,সব কাজ নিজেকেই সারতে হয়েছিলো । আমাকে বলে—লুনা , বাস্তব যে এত কঠিন আমি বুঝতে পরলাম অনেক পরে, যতক্ষণ রতন মরে পরে ছিলো আমি কাদতে পারিনি, সুদু নানা জায়গায় কল করেছি, কেদেছি দুদিন পরে । বলেই  হেসে ফ্যালে মুনা, বলে জানো তুমি ,কান্না এখন হাসির মতো হয়ে  গ্যাছে । আমি ভাবতেই পারিনা , মানুষের জীবনেই এমন কষ্ট আসে যা কষ্টের চেয়েও ভয়াভহ তার নাম একাকীত্ব লুনা । একথা বলেই মুনা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে , তুমি জানোই না  একাকীত্ব কাকে বলে, কারন তোমার ছেলে একটা প্রান,যে তোমার শরীরের অংশ, যে ঘরের ভিতরে আছে ,আর তুমি জানো যে ও আছে, কারন তুমি আছো , বেচে থাকার জন্য তোমার আর কি  চাই লুনা ? কিন্তু এই আমাকে দেখো, নিজের সাজানো বাড়িতে ফিরতে আমার গা হীম হয়ে আসে—এর নাম কি ভালো থাকা লুনা ? বলেই মুনা ওর লাল সিয়েনা গাড়িতে স্টার্ট দেয় । বীথি – মুনা চলে যাবার সাথেই সাথেই আমি নাইয়াকে জড়িয়ে ধরি,সামনে  ২৬ শে জুন নাইয়া ডালাস যাবে সামার কাটাতে,আমি কি করে বাড়ি ফিরবো বীথি ? তুই-ও মুখ ফিরিয়ে নিবি না তো বীথি ?

২১ শে জুন, ২০১৪

আগের পর্ব : বীথির কাছে চিঠি-৩


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান