বীথির কাছে চিঠি-৩২

Mon, Sep 25, 2017 5:25 AM

বীথির কাছে চিঠি-৩২

লুনা শিরীন :বীথি, কি খবর ,আছিস ক্যামন ? মাঝে লিপি আপার কাছে শুনলাম চাচী নাকি ভীষন অসুস্থ্,ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আবার চাচীকে দেখতে গিয়ে তুই নাকি রিকসা থেকে পরে গিয়ে হাতের হাড় ভেঙ্গেসিছ ? কি সব খবর । বিদেশে বসে শুনলে ভাবি – কি অনিরাপদ দেশে  প্রিয়জনদের ফেলে নিরাপদ জোনে বসে কথা বলি। প্রায়ই নিজেকে হিপোক্রেট মনে হয় । আসলে কি জানিস , কমবেশি অসৎ ,হিপোক্রেট,পলিগ্যামি আমরা সবাই,এখানে শুধু মাত্রা-টা নিয়ন্ত্রন করা  দরকার,আর কতটুকু করলে নিজেকে অপরাধী না ভাবতে হয় সেটা ভাবা দরকার ।

 আমার এক বন্ধু আছে  তমাল নাম, মনে আছে তোর বীথি ? মেয়ে মানুষের সাথে ভালোবাসার  রোগ ওর অনেক পুরোন , মানে এই বিষয়ে ওকে ডিগ্রী দেয়া যায় । আমার মনে হয় , পড়াশোনা , চাকরি,  এগুলো যেমন  ধীরে ধীরে যোগ্য হবার একটা ব্যাপার থাকে,তেমনি ছোটবেলা থেকে ছেলে পটানো বা মেয়ে পটানোও একটা স্কীল বা যোগ্যতা। আমরা জীবনের পথে হাটতে হাটতে বুঝে যাই কতটুকু করলে ওই কাঙ্খিত  মানুষকে আমি কতটুকু নিজের নিয়ন্ত্রনে আনতে পারবো । সেদিন তমাল এর সাথে এইসব নিয়ে কথা হচ্ছিলো  দীর্ঘক্ষণ । সেই ক্লাস টেন থেকে তমাল আসা /যাওয়া করে আমাদের বাসায়,আমরা দুইবোন-ই ওর বন্ধু – তাই তুই তোকারী তে গত ৩০ বছরে এই সম্পর্ক অনেকটাই কাছের । তমালের লেট ম্যারেজ,নানান পথের পানি খেয়ে তমাল আজকে  প্রেমের ব্যাপারে  বোদ্ধা  দার্শনিক। কোন কথা স্বীকার / অস্বীকারে ওর বাধা ছিলো না ছোটবেলা থেকেই, আজকে আরো নেই। কিন্তু তারপরও আমার মনে হোতো  তমালের ভিতরে অসামান্য কোন গুন আছে, নইলে জীবনের কাছে ঠেকে গেলো না কেন ও ? সেই চিন্তা থেকে সেদিন ওর সাথে আলাপ জুড়লাম , অনেক কথা,সম্পর্ক, চাওয়া / পাওয়া , ইত্যাদি। একসময় ও নিজেই বলল – লুনা একটা কথা মনে রাখিস, অনেক অনেক মেয়ের সাথে আমার রিলেশন ছিলো, বলতে পারিস গত ২০ বছরে অন্তত ২৫ জন। কিন্তু আজ অব্ধি একটা মেয়েও বলতে পারবে না, আমি  ভাল না বেশে কারো সাথে সেক্স করেছি, ট্রাষ্ট মি লুনা,ইচ উমেন, আই লাভ দেম ফার্ষ্ট অ্যান্ড  দেন উ বিক্যাম ক্লোস,ভালবাসা ছাড়া এ যাবত আমি কাঊকে ছুঁয়ে দেখিনি, সো আমার ভিতরে আর যাই থাকুক অপরাধবোধ নেই।

ভীষন সফল ছেলে তমাল,পটাপট ইংলিশ বলে,ভালো পরিবারের শিক্ষিত ছেলে। ও আরো একটা কথা,আই মীন ইট লুনা– আমা্র  কাছে প্রতিটা  রিলেশন আলাদা আলাদা করে রেসপেক্টেড,কারো সাথে আমি সারা জীবন থাকছি কি থাকছি না সেটা কিন্তু  ভিন্ন বিষয়,তুই সেটা গুলিয়ে ফেলবি না,সেটা আমরা ঠিক করে নিয়েছি সময়ের প্রেক্ষিতে।কিন্তু এটা মনে রাখিস, আমি প্রতিটা রিলেশন এর ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিলাম । কখনো একজন থাকতেই আরেকজনের  দিকে হাত বাড়াই নি --

বিথি,তমালের কথাগুলো মেলালাম নিজের জীবনের সাথে,ভাবলাম, এই তো নীতিবান মানুষ , প্রতিটা মানুষের-ই  নিজস্ব  প্রিঞ্চিপল আছে , সেটা থাকতেই হয়, সবচেয়ে বড় অপরাধীও  ক্রাইম করার আগে ভেবে নেয় কেন সে এই কাজ করছে ? কি তার উদ্দেশ্য ? কিন্তু সেই অপরাধী-ই আবার সময় পেরুলে নিজেকে ঘুরে দ্যাখে,ভাবে কি করলাম আমি? কেন করলাম ? বিহব্ল হয়ে  পরি আমরা নিজেদের কাছেই, দিশা পাই না কোথায় যাবো ? কার কাছে গিয়ে নিজেকে হাল্কা করবো ? কি করে ফিরিয়ে আনবো ফেলে আসা সময়কে ? আমরা সবাই তাই বীথি, সময় পাড় হয়ে গেলে পিছন ফিরে তাকাই। তমাল সেদিন অনেক অনেক বার নিজেকে ঘুরে ফিরে তুলে ধরেছিলো আমার কাছে , কিন্তু একবারো ভেঙ্গে পড়েনি ও, নতুন বিয়ে করা তমালের বউ রুমানার সাথেও আড্ডা  হোলো অনেকক্ষণ,আমাকে বলে, আমি জানি লুনা তুমি তমালের  প্রেমিক লিস্টে  নেই, তুমি ওর বন্ধুর লিস্টে আছো,বলেই হো হো করে হেসে উঠে রোমানা,আমি বলি – আসলে কি জানো, আমি চান্স পাইনি, যদি দেশে থাকতাম, একবার চেষ্টা করতাম হয়তো, কি আর করা বলো ।

রুমানা / তমালের সাথে আড্ডা দিয়ে ক্যামন  ব্যাথা করছিলো বুকের ভিতর। কত কত বন্ধু দিয়ে ভরে থাকা এই  জীবন, কিন্তু সময় সময় একাকীত্ব এমন  ভয়াবহ আকার নেয় কেন? নিজেকে দিক-শুন্য লাগেমাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে  বোতল   থেকে পানি খাই , শুন্য  চোখে অন্ধকার দেখি,আর ভাবি  প্রিয় দেশ ,প্রিয় মানুষ , ফেলে আসা সৃতি দিয়েই বাকী জীবন কাটাতে হবে। জীবন আসলেই একটা ট্রেড বীথি , বিদেশে থাকবো, নিরাপদে থাকবো, উন্নত দেশে জীবনযাপন করবো আবার সত্যিকার বন্ধুও পাশে পাবো,এ কি তামাশা নাকি ? সবকিছু  কি এক জীবনে কেউ পায় ? আমিই বা এর ব্যাতিক্রম কেন হবো ? নিজের দিকে খেয়াল নিস বীথি,আদর ।

৮/৬/২০১৪

আগের পর্ব: বীথির কাছে চিঠি-৩১


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান