বেঁচে থাকি যদি আবারও যাবো ফিরে - কোন একদিন ইলিশের খোঁজে।

Wed, Sep 13, 2017 11:42 PM

বেঁচে থাকি যদি আবারও যাবো ফিরে - কোন একদিন ইলিশের খোঁজে।

শওকত মিলটন : সাবওয়েটা তখন ডন ভ্যালীর উপর। ব্রডভিউ স্টেশন ছাড়ার পর আমি সব সময় উন্মূখ হয়ে থাকি কখন সুরঙ্গ থেকে পাতাল রেল জমিনের উপর দিয়ে যাবে। কখন নজরে আসবে ক্রিসেন্ট লেকের মতো এক ফালি জলপ্রবাহ- নাম ডন রিভার! নামে নদী হলেও আমার প্রিয় বরিশালের লাকুটিয়া খালের চেয়েও ছোট তার প্রস্থ।

 লাকুটিয়া খালের কথা উঠলেই লাকুটিয়ার জমিদার বাড়ীর কথা মনে পড়ে। লাকুটিয়ার জমিদাররাই এই খাল কেটেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, বিলাসী বজরায় বাড়ী থেকে কীর্তনখোলায় এসে স্টিমারে ওঠার সুবিধার জন্য এই খাল কেটেছিলেন। ডন রিভার ছোট হলেও আকর্ষনীয় এর উপত্যকার সবুজ বৃক্ষরাজি। এটা আমাকে খুব টানে। এই ডন ভ্যালীর উপর সেদিন পাতাল রেলটা উঠতেই গন্ধটা তীব্রভাবে আমার নাকে লাগলো। সাথে সাথে আমার শরীরে আবেশ ছড়ালো, না এমন গন্ধ আমার পাশে বসা সহযাত্রীর গা থেকে আসছে না। এ গন্ধটা পাওয়া যায় মেঘনায়, দুপুর হবো হবো করে এমন সময়। জেলে নৌকায় ঢেউয়ের তালে তালে রান্না করা ইলিশ আর কাঁচা কলার ঝোলের গন্ধ। আমি আত্মসমর্পণ করি গন্ধের কাছে, আর গন্ধ আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। আবিষ্ট আমি হিজলার বালুর চরে। মেঘনায়, যার উত্তাল যৌবণের প্রেমে না পড়ে কেউ থাকতে পারে না। আমি নিজের অজান্তেই শিহরিত হই, প্রেমে নয় স্মৃতিবিলাসে। দিব্য চোখে দেখি, স্বাস্থ্যবতী এক ইলিশ আর সবুজ ছোলা ফেলে দেয়া কাঁচা কলা হলুদ ঝোলে টগবগ করে ফুটছে। বাটা মরিচ আর মশলায় দারুন সুবাস। কাঠের চুলোর লাল টকটকে আগুন সারথী তার। দুপুরের জোয়ারে জাল ফেলে অলস সময়ে মোটা লাল চালের ভাত কলাইয়ের থালায় কাঁচকলা ইলিশ ঝোলে ডুবে থাকবে। লহমায় থাকবে তৃপ্তির স্বাদ। সেই স্বাদ অনেক গূনী রাধুঁনীর রান্নাতেও আসে না। আহা তেমন স্বাদের দেখা মেলে শুধুই জেলে নৌকায়। ইলিশের আঁশটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে মেঘনায়। নৌকা থেকে নৌকায় অথবা সব জেলে নৌকা থেকে বাতাসে। বাতাসে নারী শরীরের গন্ধ অথবা ইলিশের। জেলেদের জালে নারী ইলিশেরই দেখা মেলে।

তুমুল এক বর্ষায়, মাঝ রাতে, এক মাছ ঘাটে বয়স্ক এক জেলে বলেছিলেন ইলিশ হচ্ছে মৌমাছির মতো। তবে স্বভাবে উল্টো। দলে এক দুটো পুরুষ থাকে, বাকীরা নারী। তবে কি ইলিশ সৌদি বাদশাহ, হেরেম নিয়ে সাঁতরে বেড়ায়! বুঝতে পারি গন্ধ ভূতটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মগজের কোষে কোষে বড়ই অদ্ভুত তার পদচারনা। আবার হঠাৎ আরিচা-দৌলতদিয়া ফেরীর মাছের গন্ধ, ওদের রান্নায় কিছুই তেমন থাকে না-কখনও কখনও শুধুই হলুদের বাড়তি স্বাদ। তারপরও ধোঁয়া ওঠা মোটা চালের গরম ভাতে সেই টাটকা মাছের ঝোলের স্বাদ অন্যরকম। পদ্মা পেরোবার ঘাট পাটুরিয়া থেকে সরে শিমুলিয়ায়। মোশাররফ নামের দারুন এক মানুষ ছিলেন আগের ঘাটে। ভাতের হোটেল চালাতেন তিনি। সুফী ভক্ত। তাঁর দোকানে বহুবার সকালে তাজা ইলিশ, ইলিশের ডিম আর শুকনো মরিচ তেলে ভাজা। ইলিশের গন্ধে মৌ মৌ করতো। সাথে পাতলা মসুর ডাল। মোশাররফের দোকানের এই মাছ ভাজার স্বাদও অন্যরকম। মাছের উপরটা মচমচে আর ভেতরটা মোলায়েম, মাখনের মতো। আমার সাথে স্বজন, আকাশ এমনকি রাসেলও একাধিকবার। আমরা কেউ এক পিস মাছে সন্তষ্ট হতাম না। প্রথমবার আমার আর স্বজনের মাছ খাওয়া দেখে মোশাররফের পিচ্চি মেছিয়ারের ভিরমী খাওয়ার অবস্থা! আর মোশাররফ বেশ অনেকটাই দাম কমিয়ে দিয়েছিলেন। মোশাররফের খুব ইচ্ছে ছিলো আমি একদিন ওর বাড়ীতে দাওয়াত খাই। হয়নি, কোনদিন যদি আবার সুযোগ পাই- যাবো। জানি না মোশাররফের ভাতের হোটেলটা আছে কিনা! এখনও তাঁর হোটেলে বিশেষ কায়দায় ইলিশ কাটা হয় কি না- ইলিশের টুকরো, ডিম পদ্মার জলে গা ধুয়ে বিশাল তাওয়ায় তেলের পুকুরে সাঁতরে বেড়ায় কিনা! হয়তো আছে, হয়তো গাঙ্গের জলে ভেসে গেছে।

পদ্মার ওপাড়ে ছিলো এক ভাগ্নের দোকান। সে আমাকে মামা জ্ঞানে প্রায় অজ্ঞান ছিলো। আমার টেবিলের আশপাশে ভীড় জমতে দিতো না-যেমনটা কাওড়াকান্দি ঘাটে ছিলো খুবই স্বাভাবিক। সেখানেও কড়কড়ে ইলিশ ভাজার সাথে মুরগীর ডিম ভাজি, ঘন ডাল এবং শীতের আশপাশের সময়টায় নিয়মিত থাকতো কলাই শাক। শুকনো মরিচ ভেজে, সেই মরিচ ভেঙ্গে কলাই শাক ভাজি। ধোঁয়া ওঠা মোটা চালের ভাতে কলাই শাক ভাজি মেখে মুখে দিলেই অন্য রকম স্বাদ। এক লোকমা পেটের ভেতর নামছে আর কান থেকে গরম বের হচ্ছে, শীত উধাও। এখানেই, ভাগ্নের নাম বিহীন মূলি বাঁশের বেড়ার ভাতের হোটেলে সব শেষ ইলিশের সেরকম একটা খাওয়া দিয়েছিলাম আমি আর রাসেল- বরিশাল যাবার পথে। বোধহয় তিন/ চার পিস করে ইলিশ ভাজা, একটা করে ইলিশের ডিম, কলাই শাক ভাজি, ডিম ভাজি আর এক বাটি ঘন ডাল- এক একজনের ভাগে। সেই স্বাদ যেন এখনও মুখে লেগে আছে। আমরা খাওয়া শেষ করে নড়তে পারছিলাম না। আমার কৈশোরে একবার কদম রসুল নামে লঞ্চে নানা বাড়ী পটুয়াখালী থেকে ঢাকায় যাচ্ছি। সম্ভবত আমার নানু, আম্মা, মেঝখালা আর বাবু মামা। মামা সব সময়ই রসনা বিলাসী, যেমনটা নানা ছিলেন। দুপুর দূটোয় তখন পটুয়াখালী থেকে লঞ্চ ছাড়তো, পরদিন ১০/১১টায় ঢাকা। আমরা টিফিন ক্যারিয়ার ভরে খাবার দাবার নিয়ে এসেছি, সব বরিশাইল্যারা যেমন করে। লঞ্চ সবে ছেড়েছে আর ইলিশ ভাজার সেকি মৌ মৌ গন্ধ। মামা খবর নিয়ে এলেন বড় বড় ইলিশের টুলরো ডুবো তেলে ভাজা হচ্ছে। সবাইকে গরম গরম ইলিশ ভাজা দিয়ে ভাত খেতে মামা উসকালেন। আর যায় কোথায়! আমার মা, খালারা এমনিতেই নাচুনে বুড়ি-আমার মা একটু বেশীই ছিলেন। সাথে মামা ঢাকে বারি দিলেন আর কি! আমিও মামার সাথে লঞ্চের নীচতলায় রেস্তরাঁর রান্নাঘরে হাজির। চোখে এখনও ভাসে, বেশ বড় বড় ইলিশের টুকরো ডুবো তেলে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। আমরা মনে হয় প্রায় দুটো ইলিশ সাবার করেছিলাম। সাথে শুধু পাতলা ডাল। এমন বড় ইলিশ এখন আর রেস্তরাঁর হেঁশেলে দেখা মেলে না।

লিখি আর ঢোক গিলি, পাতাল রেলে আমি আর আমার মগজের কোষগুলো কেওড়াকান্দি ঘাটের ভাগ্নের হোটেলের, মোশাররফের ভাতের হোটেলের, কদম রসুল লঞ্চের, মেঘনার বালুচরে জেলেদের নৌকায় রান্না করা ইলিশের স্বাদ নেয়, মুখ তেতো-দিন ভর না খাওয়া মুখে। আমি ইলিশের মতো হয়ে গেলাম, সারা জীবন শুধু সাঁতরে গেলাম- সাগর থেকে নদী, নদী থেকে বাজারে। বেঁচে থাকি যদি আবারও যাবো ফিরে-কোন একদিন ইলিশের খোঁজে। পাতাল রেল থেমে গেছে, চলে এসেছি ঘরহীন ঘরের পথে। গন্ধ ভূতটা এখনও মগজের কোষে কোষে ধরে রেখেছে ইলিশের গন্ধ, তাজা-ভাজা, ঝাল-ঝোল।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান