সেকালে ঢাকার বন্যা-বিড়ম্বনা

Wed, Aug 30, 2017 12:42 AM

সেকালে ঢাকার বন্যা-বিড়ম্বনা

যদি আজকাল কানে আসে যে ‘গগনে গরজে মেঘ’, আর সঙ্গে টের পাওয়া যায় খানিক পরেই নামবে ‘ঘন বরষা’, তাহলে এই বাংলায় কারও মন আর বৃষ্টির আনন্দে নেচে উঠবে কি না সন্দেহ। কারণ, ভারী বৃষ্টিপাত গ্রামাঞ্চলে ডেকে আনছে কালান্তক বন্যা, নগর এলাকায়ও তার ভয়াল আবির্ভাব ঘটবে এমন শঙ্কাও রয়েছে। তাই বরং এহেন বন্যা-বিড়ম্বনার ভয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। অবশ্য অতি-বর্ষণের ফলে তৈরি হওয়া জানমালবিনাশী দুর্যোগ বন্যা ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা কিংবা যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতিসাধন—এই সব বিষম ঘটনা আজকের বাংলাদেশ কিংবা তৎকালের পূর্ববঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কিছু নয়। কথাটা অদ্ভুত শোনাতে পারে, কিন্তু তা ইতিহাসের নিরিখে সত্যি বৈকি। পূর্ববাংলার প্রধান নগরী ঢাকার নদীঘেরা ও খাল-বিলময় ভূগোলের দিকে তাকালে সেকালের বর্ষাকালেও জীবনধারণ এবং চলাচলের ক্ষেত্রে জনগণের বেহাল দশা যে হতো, তা অবিশ্বাস করার উপায় নেই। এস এম তাইফুরের গবেষণাগ্রন্থ গ্লিম্পসেস অব ওল্ড ঢাকায় শায়েস্তা খানের আমলে ঘটে যাওয়া ১৬৮৪ সালের দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ হিসেবে বন্যার কথাও বলা হয়েছে। তখন নাকি ঢাকার সব রাস্তা জলে ডুবে গিয়েছিল (ঠিক এখনকার মতোই!), বহু নৌকাও ভেসেছিল সেখানে।
মোগল আমল পার করে বহিরাগত কোম্পানির শাসন শুরু হওয়ার পরও ঢাকার চেহারা-সুরত একটুও পাল্টায়নি। ১৭৮৭ সালের মার্চ মাস থেকেই এই নগরীতে ঘনঘোর বৃষ্টির দেখা মিলছিল, তা জুলাই নাগাদ চলে। টানা বৃষ্টির ফলে নদ-নদীর পানি ভয়াবহভাবে বেড়ে যায় তখন, শুরু হয় বন্যা। ঢাকার অবস্থা তখন নাকি প্রায় ভেনিস নগরীর মতো হয়ে পড়েছিল, মন্তব্যটি ঐতিহাসিক যতীন্দ্রমোহন রায়ের। তবে ভেনিসের সঙ্গে মিল কেবল জলমগ্নতায়, ভেনিসের রোমান্টিকতা কিংবা সৌন্দর্যের তিলমাত্রও তখনকার পীড়িত-বিধ্বস্ত ঢাকার মধ্যে ছিল না। একসময়ের সিভিল সার্জন জেমস টেলর তাঁর টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিটিকস অব ঢাকা বইতে ওই সময়ের জলমগ্ন নগরীর বিবরণ দিয়েছেন এভাবে: ‘ঢাকার রাস্তাগুলো, সাধারণ মৌসুমের প্লাবনের সময় পার্শ্ববর্তী নদীসমূহের উচ্চতম সীমা থেকে কয়েক ফুট ওপরে থাকে; এখন তা এমনভাবে প্লাবিত হলো যে সেখানে স্বচ্ছন্দে নৌকা চালানো সম্ভব হয়ে উঠল।’ তিনি আরও জানান, শহরের অধিবাসীদের অনেকে তখন বাধ্য হয়ে এলাকা ত্যাগ করেছিল। আর যারা রয়ে গিয়েছিল, তাদের দিনযাপন করতে হতো ঘরের ভেতর বাঁশনির্মিত উঁচু চালায় বসে। সে সময় জলে ডুবে মারা পড়েছে ঘরের গবাদিপশুও। ঢাকার তদানীন্তন কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট ম্যাথু ডে ওই সময়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে লিখেছিলেন: ‘এ স্থানে দুঃখ-দুর্দশার এরূপ দৃশ্য চোখে পড়েছে, যা আমি সারা জীবনে কোথাও কখনো দেখিনি।’ ঢাকা শহরে এই জলাবদ্ধতা ও বন্যার ফলে পরবর্তীকালে ধেয়ে আসে দুর্ভিক্ষ, গোটা জেলারই ফসল অতিবৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখন প্রায় ষাট হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, এই তথ্য জানা গেছে ডে সাহেবের ভাষ্য থেকে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান