নজরুলের অসম্পূর্ণ প্রেম

Wed, Aug 30, 2017 12:40 AM

নজরুলের অসম্পূর্ণ প্রেম

নার্গিসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মিলনের পূর্ণতা পায়নি। বিয়ের রাত না ফুরাতেই বিদায় নিয়েছিলেন নজরুল। বলে গিয়েছিলেন শ্রাবণ মাসে ফিরবেন। কিন্তু কত কত ‘শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এল না।’ নজরুল তখন প্রেমে পড়েছেন দোলনচাঁপার। কুমিল্লার দৌলতপুর থেকে কান্দিরপারের দূরত্ব আর কতটুকু। কিন্তু নার্গিস চেয়ে চেয়ে দেখলেন, তাঁর বঁধুয়া আনবাড়ি গেলেন তাঁরই ‘আঙিনা দিয়া’। সৈয়দা আসার খানমের নাম পাল্টে তাঁকে নার্গিস নামে ডেকেছিলেন নজরুল, আবার দুলি বা দোলনচাঁপাকে প্রমীলা নামটিও দিয়েছিলেন তিনি। ১৯২১ সালে ছেড়ে এসেছিলেন নার্গিসকে, ১৯২৪ সালে বিয়ে করলেন প্রমীলাকে। অবশ্য বিয়ে করলেন কথাটি যত সহজে উচ্চারিত হলো, তত সহজে সবকিছু সমাধা হয়ে যায়নি। ভিন্ন®দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে যত রকম চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়, সব পেরিয়েই নজরুলের সংসারে এসেছিলেন প্রমীলা। ওদিকে নজরুল যে আর কখনো তাঁর কাছে ফিরবেন না, এই সোজাসাপ্টা হিসাবটা বুঝে নিতে নির্বোধ মেয়েটির (পড়ুন নার্গিস) সময় লেগেছিল ১৭ বছর।

আমাদের প্রিয় কবির নামের আগে ‘বিদ্রোহী’ তকমা জুড়ে দিয়ে একটি ছাঁচে বেঁধে ফেলার চেষ্টা আমরা যতই করি না কেন, তিনি নিজেই কিন্তু ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী’। কৃষ্ণের বাঁশরী শুনে রাধার জগৎসংসার মাথায় উঠবে এটাই তো চিরন্তনের গল্প। নজরুলের জীবনেও তাই নানাভাবে এসেছেন নারীরা। কখনো রানু সোম (প্রতিভা বসু), কখনো নোটন মৈত্র বা জাহানারা চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর তৈরি হয়েছে নানা মাত্রার সম্পর্ক। এসব সম্পর্কে তিনি জড়িয়েছেন সহজে, আবার বাঁধন ছেড়ার সহজাত নৈপুণ্যে বেরিয়েও এসেছেন। শুধু কিছু অসাধারণ গান ও কবিতা এসব সম্পর্কের সাক্ষী হয়ে স্থায়ী থেকে গেল পাঠক-শ্রোতার হৃদয়ে।

কিন্তু ফজিলাতুন্নেসার ব্যাপারটি অন্য রকম। এই একটি সম্পর্ক রূঢ় প্রত্যাখ্যানের রূপটি চিনিয়েছিল কবিকে। সমুদ্রের ঢেউভাঙা জলের মতো নজরুলের নিবেদন স্পর্শ করতে চেয়েছে ফজিলাতুন্নেসার চরণ, কিন্তু কী আশ্চর্য উপেক্ষার শক্তি ছিল শ্যামাঙ্গী তরুণীর! তিনি ফিরে তাকালেন না, বরং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ-অবহেলায় ক্ষত-বিক্ষত করেছেন কবির হৃদয়!

এ-সংক্রান্ত নজরুলের মোট আটটি চিঠি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তার মধ্যে কাজী মোতাহার হোসেনকে লেখা সাতটি এবং ফজিলাতুন্নেসাকে লেখা একটি চিঠিতে যে ব্যথিত-অপমানিত, কাতর ও গ্লানি-জর্জরিত নজরুলকে পাওয়া যায়, তা তুলনারহিত। এখানে বলা বোধ হয় অপ্রসাঙ্গিক হবে না, বন্ধুকে লেখা চিঠিগুলোর প্রাপক কাজী মোতাহার হোসেন হলেও তিনি চাইতেন—এই চিঠিগুলো ফজিলাতুন্নেসাও পড়ুক। তাঁর চিঠিতে সেই আগ্রহের কথা উল্লেখ আছে।

এবার ফজিলাতুন্নেসার পরিচয় ও নজরুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের সূত্রটি তুলে ধরি।

প্রথমেই এ কথা জানিয়ে রাখা যাক, ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী। তাঁর বাবা আবদুল ওয়াহেদ খান টাঙ্গাইলের করটিয়ার জমিদারবাড়িতে চাকরি করতেন। তবে ধারণা করা যায়, মেয়েকে ঢাকায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি তাঁর ছিল না। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসার জীবনের লক্ষ্য যেমন ছিল সুদূর; সেই লক্ষ্য পূরণে তাঁর সাহস ও একাগ্রতাও ছিল বিস্ময়কর।

সেই আমলে রক্ষণশীল সমাজে একজন মুসলিম মেয়ের পক্ষে ঢাকায় একা থেকে (মাঝে মাঝে তাঁর বোন শফিকুন্নেসা তাঁর সঙ্গে থাকতেন) বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কতটা দুরূহ ছিল, আজকের দিনে তা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা বৃত্তি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু যে পড়াশোনা করেছেন তা নয়, গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান পেয়ে তাঁর মেধারও প্রমাণ রেখেছেন।

১৯২৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে অতিথি হিসেবে ঢাকা এসেছিলেন নজরুল। এই সংগঠনের সম্পাদক কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ধমান হাউসের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এ সময়ে ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। নজরুল হস্তরেখা দেখে ভাগ্য গণনা করতে পারেন শুনে নিজের ‘ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ’ জানতে আগ্রহী হয়েছিলেন ফজিলাতুন্নেসা। সোৎসাহে বন্ধু মোতাহারকে নিয়ে তাঁর বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন নজরুল। পরিচয় ও হস্তরেখা বিশ্লেষণ পর্যন্ত ব্যাপারটা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এর পরের ঘটনাটি রহস্যময়। সেই রহস্যের কিনারা এখনো হয়নি। তবে কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিচারণায় এটুকু ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এরপর কোনো এক রাতে ফজিলাতুন্নেসার দেওয়ানবাজারের বাড়িতে একা গিয়ে হাজির হয়েছিলেন নজরুল। এই বিদূষী নারীর কাছে প্রেম নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু এতকাল যে তরুণীদের সঙ্গে সান্নিধ্যের সুযোগ তাঁর হয়েছিল, ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন তার ব্যতিক্রম। অন্য ধাতুতে গড়া এই নারী তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তাঁকে। প্রত্যাখ্যানের ভাষা ও আচরণ ছিল রীতিমতো কঠোর। এই আঘাত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল কবিকে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান