ফেলে আসা পথ, ফেলে আসা দিন

Wed, Aug 30, 2017 12:39 AM

ফেলে আসা পথ, ফেলে আসা দিন

হাঁটা হয়নি ও পথে, যাওয়া হয়নি ওখানে

ঠিক বাস থেকে নেমে সাহেবগঞ্জ বাজার ঘুরে আমির চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ির ঠিক পেছন দিয়ে
হিজল ফুলের গন্ধ শুকতে শুকতে একদম নদীর ধারে চলে যাওয়া।
মাঝে মাঝে ঠিক ওখানে গেলেই কেমন ঝুম ঝুম বৃষ্টি নামত
বৃষ্টির বড় বড় ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গন্ধ ভরা হিজল ফুল, ফুলগুলো টুপটুপ করে পড়ত
কখনো ছাতা থাকত কখনো থাকত না, কিন্তু ছাতা মাথায় থাকলে কী আর
সেই অনুভূতি আমাকে আজও এমন তাড়িয়ে বেড়াত।

সেই কবে সাঁতরে পাড়ি দিয়েছি আমার প্রিয় শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের ফুলজোর নদী
বহুদিন খেয়ে নৌকার দাঁড় বাইনি নিজের হাতে কিংবা ধীরেন মাঝির ডাক শোনা হয়নি
বৃষ্টিতে কিংবা রোদে, আষাঢ়ে কিংবা চৈত্রে, নদীতো নদীই আমার প্রাণের নদী।
সেই ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরেই ছোট ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে শেওলার জলে
গা ভিজিয়ে খুদে চিংড়িমাছ খুঁজে বেড়ানো, সেকি শুধুই মাছের নেশায় নাকি নদীর নেশায়?
হয়তো দুটোই।
আচ্ছা সেই বয়সের ছেলেমেয়েরা এখনো কি অমন করে নদীর জলে গা ভেজায়?
খুব জানতে ইচ্ছে করে।

আরও একটু কৈশোরে কিংবা পড়ন্ত শৈশবে সেই যে দলবেঁধে খোকা কাকার বড়ই গাছে ঢিল ছোড়া,
খুব মনে পড়ে। আচ্ছা কোথায় এখন কার্তিক, রেজাউল, আক্তার, বিশু কিংবা হারুন, কেমন আছে ওরা?
আচ্ছা ওরাও কি আমার মতো এমনি করেই ভাবে?
হয়তো না কারণ ওদের অনেকেই ওই পথেই হেঁটে যায় প্রতিদিন
আমার না দেখার তৃষ্ণা আর ওদের প্রতিদিনের দেখা কি এক হতে পারে?
অনেকগুলো বছরইতো পেরিয়ে গেল, ওদেরও নিশ্চয়ই চুলে পাক ধরেছে।
এমনকি হতে পারে না আবার সবাই মিলে খোকা কাকার বড়ই গাছে ঢিল ছুড়ব।

আরও একটু শৈশবে, বাবার পিছে পিছে মাছ ধরার খালই নিয়ে দৌড়ানো।
অথবা বড়ভাইয়ের সঙ্গে রাতের আঁধারে আলোর ফাঁদ পেতে মাছ ধরতে যাওয়া
আর পিছলে পড়ে ভাইয়ের বকুনি খাওয়া। বাড়ির পেছনের মেটেল বিলে এখনো কি অযুত শাপলা ফোটে?
কলমি ফুলের মৌ মৌ গন্ধে এখনো কি চারপাশ আচ্ছন্ন হয়?
আর সেই যে বিলের মাঝখানের উঁচু ঢিবিটা যার দুপাশে কতগুলো বরুণ গাছ।
হয়তো এখনো সাদা বরুণ ফুলে ছেয়ে যায় চারদিক।
আর ঠিক সেই সময়েই ঢিবির ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে দূরে বহু দূরে
নদীর ওপারে অস্তগামী লাল সূর্যের চলে যাওয়া?
এমন সূর্যাস্ত আমি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি।

এখন আর বিশ্ববিদ্যালয় আগের মতো লম্বা বন্ধ হয় না, আমরা পেয়েছি কয়েকবার।
কী দারুণ সেই দিনগুলো। ব্যাগ গোছাও, পালাও পালাও, বাস ধরো তারপর সোজা বাড়ি।
বাড়ি ফেরার কী যে নেশা ছিল তখন।
বাড়ি টানত, নদী টানত, বন্ধুরা টানত আরও টানত আমার মা।
এসব কিছু এখনো টানে, আগের মতো, না-না আগের চেয়ে আরও বেশি টানে অনেক বেশি।
যাওয়া হয়নি অনেক দিন। মনের ফ্রেমে সব আগের মতোই। একটুও ম্লান হয়নি।
সেই স্মৃতিগুলো এতটাই প্রখর যে কখনো মনে হয় আচ্ছা হঠাৎ যদি আমাকে
কেউ রাতের অন্ধকারে আমার ফেলে আসা শৈশব কৈশোরের কোনো একটি প্রিয় জায়গাতে ফেলে আসে
আমি কি বাড়ি ফিরতে পারব? খুব পারব।

আবার গেলে বৃষ্টিভেজা ওই হিজল ফুলের গন্ধ নেব প্রাণ ভরে, দুহাত ভেজাব শেওলা ঢাকা নদীর জলে
মেটেল বিলে শাপলা কুড়াব, বরুণ-কলমির ফুলে রাখব আমার দুই চোখ
দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে সূর্যাস্ত দেখব যতক্ষণ না গোধূলির লাল আভা দিগন্তে মেলায়,
খোকা কাকার বড়ই গাছে আবারও ঢিল ছুড়ব
মাঝরাতে নদীর পাড় থেকে একদৌড়ে বাড়ি যাব, সঙ্গে বিশুও থাকবে
বাবাগো-মাগো বলে ভূতের ভয়ে চিৎকার দিয়ে সারা পাড়া জাগিয়ে দেবে আরও একবার।
এবার আমি একা না সঙ্গে থাকবে আমার খুব প্রিয় কয়েকজন
আমার শৈশব আর কৈশোরের সোঁদা মাটির গন্ধ যাদের কখনোই আগে উন্মাতাল করেনি।

*নুরুল হুদা পলাশ: সাস্কাতুন, সাস্কাচেওয়ান, কানাডা।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান