বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায় হাজারো রোহিঙ্গা

Wed, Aug 30, 2017 12:35 AM

বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায় হাজারো রোহিঙ্গা

 

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের গ্রাম জলপাইতলী। এর দুই শ গজ দক্ষিণে মিয়ানমারের ঢেকিবুনিয়া সীমান্ত এলাকা। এটি কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। এই ঘেরার বাইরে দুই সীমান্তের মধ্যবর্তী অংশে (নো ম্যানস ল্যান্ড) শতাধিক ঝুপড়িঘরে বসতি করেছে হাজারও রোহিঙ্গা। তারা যাতে বাংলাদেশ অংশে ঢুকতে না পারে, সে জন্য এপারে দাঁড়িয়ে নজরদারি করছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জলপাইতলী গিয়ে দেখা গেছে, দুই দেশের সীমানা ভাগ করে রাখা একটি ১০ ফুট প্রস্থের খাল পেরিয়ে রোহিঙ্গারা ঢেকিবুনিয়া থেকে জলপাইতলীর দিকে ঢোকার চেষ্টা করছে। বিজিবি ও পুলিশের সদস্যরা তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাচ্ছেন।

সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা। আশ্রয় হয়েছে তাঁদের খোলা আকাশের নিচে। সেখানেই ভাত খেতে বসেছে শিশুটি। ছবিটি গত সোমবার কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তের কাছ থেকে তোলা l এএফপিকথা হয় ঢেকিবুনিয়া থেকে আসা আয়েশা খাতুনের সঙ্গে। তিনি দুটি পোষা মুরগি হাতে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। ৫০ বছর বয়সী এই নারী বলেন, গত শনিবার রাতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঢেকিবুনিয়া গ্রামটি ঘিরে ফেলেন। এ সময় সেনাসদস্যরা তাঁর বাড়িতে ঢুকে তিন ছেলে নুর আলম (২৫), মো. আলম (১৮) ও নুর মোহাম্মদকে (১৬) ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে যান। ২৪ আগস্টের সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিন ছেলেকে চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ তিনটি জঙ্গলে নিক্ষেপ করে তাঁর ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাঁর বাড়িতে নয়, ওই রাতে ঢেকিবুনিয়া গ্রামের শতাধিক ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

আয়েশার পাশে দাঁড়ানো একই গ্রামের দিলদার বেগম (৪০) বলেন, সেনাসদস্যরা দুই দিন আগে তাঁর বাড়িটিও জ্বালিয়ে দেন। গতকাল ভোরে তিনি ছেলে রফিককে (২৫) নিয়ে পালিয়ে আসেন।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় খুঁজছেন বাংলাদেশে। কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরের প্রবেশমুখ আমতলী থেকে ছবিটি গতকাল বিকেলে তোলা l প্রথম আলোপালিয়ে আসা লোকজন জানান, রাখাইনে সেনাসদস্যরা অমুসলিমদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। আর রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু বিজিবি সদস্যদের বাধার কারণে তাঁরা ঢুকছে পারছেন না। তবে রাতের বেলা দুর্গম সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশ ঢুকে পড়ছে।

তুমব্রু সীমান্ত পরিদর্শনের সময় কাঁটাতারের বাইরে (নো ম্যান্স ল্যান্ড) তিনটি পাহাড়ি এলাকায় পৃথক তিনটি ঝুপড়ি বস্তি তৈরি করে আরও কয়েক হাজার রোহিঙ্গার বসতি লক্ষ করা গেছে। এ প্রসঙ্গে বিজিবির সদস্যদের বক্তব্য হলো, ওই এলাকা নো ম্যান্স ল্যান্ড। সেখানে যাওয়া নিষেধ।

দুপুর ১২টার দিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের রহমতেরবিল সীমান্তে গিয়ে দেখা গেল ভয়াবহ অবস্থা। নাফ নদীর তীরে ঝুপড়িঘরে অবস্থান করছে আরও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা। নাফ নদীর পাশেই রহমতেরবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের নিচতলায় বিজিবির এক সদস্য বসে মিয়ানমার সীমান্ত নজরদারি করছেন। নো ম্যান্স ল্যান্ডের দিকে যেতে চাইলে বিজিবির ওই সদস্য বাধা দিয়ে বলেন, ‘শহীদ হতে চাইলে ওদিকে যান ভাই।’

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছেন তাঁরা। কোলের শিশুটিকে নিয়ে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার কী আপ্রাণ চেষ্টা! গত সোমবার মিয়ানমারের মংডুর কাছে সীমান্ত এলাকা থেকে তোলা ছবি l এএফপিওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আজিজ বলেন, চার দিন ধরে সীমান্তে অবস্থান করছে চার হাজারের মতো রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের কয়েক শ গজ পেছনে মিয়ানমারের ঢেকিবুনিয়া গ্রাম। সেখানে সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটি আছে। প্রায় সময় সেখানে গোলাগুলির শব্দ হয়। রাতের বেলা আগুনের দাউদাউ শিখা জ্বলতে থাকে। গোলাগুলির শব্দে এপারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পালিয়ে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, নাইক্ষ্যংছড়ি ও উখিয়া সীমান্তের বিপরীতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ঢেকিবুনিয়া, চাকমাকাটা, ফকিরাপাড়া, তুমব্রু, মেধায়পাড়া, কুমিরখালী, বলীবাজার, টংবাজার, সাহাববাজার, মংচিঢং, রেইখ্যাপাড়া ও কাউচিবং গ্রাম। এসব গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা রোহিঙ্গা। ২৪ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাসী হামলার পর এসব গ্রাম থেকে রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আর অমুসলিম নাগরিকদের ওয়ালাদং পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে নিরাপদে রাখা হচ্ছে।

গভীর রাতে গৃহহীন রোহিঙ্গারা নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু, ঘুমধুম, রেজু আমতলী, ফাত্রাঝিরি, বড়বিল, আজুখাইয়া, উখিয়ার ডেইলপাড়া, করইবনিয়া, ডিগলিয়া, হাতিমোরা, দরগাহবিল, রহমতেরবিল, আনজুমানপাড়া দিয়ে বাংলাদেশ অনুপ্রবেশ করছে।

বেলা দুইটার দিকে উখিয়ার বালুখালী অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে দেখা গেছে, বৃষ্টিতে ভিজে কয়েক শ রোহিঙ্গা বালুখালীর এ শিবিরের একটি পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে।

চার মাসের মেয়ে রিভাকে কোলে নিয়ে শিবিরের বি ব্লকের ৫ নম্বর শেড এলাকায় দাঁড়িয়ে আছেন ইয়াসমিন আরা (২৫)। গতকাল ভোরে নাফ নদী পেরিয়ে তিনি টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায় আসেন। সেখান থেকে ইজিবাইকে আসেন বালুখালীর এই শিবিরে।

ইয়াসমিন আরা প্রথম আলোকে বলেন, ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় মগ সম্প্রদায়ের তিনজন তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এরপর তাঁর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। প্রাণ বাঁচাতে তিনি ছেলে জিহান (৩) ও মেয়ে রিভাকে (৪ মাস) নিয়ে বাংলাদেশ পালিয়ে আসেন। ইয়াসমিনের আশপাশে তখনো দাঁড়িয়ে শতাধিক রোহিঙ্গা। মাথা গোঁজার ঠাঁই না হওয়ায় তাঁরা খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন।

বালুখালী অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল এক দিনে ৭০০ পরিবারের প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা এই শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগের তিন দিনে এসেছে আরও চার হাজার রোহিঙ্গা। থাকা-খাওয়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছে।

গত বছরের অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যে হামলার ঘটনায় এই শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল ৪ হাজার ১৩ পরিবারের ২২ হাজার ৭৭৫ জন রোহিঙ্গা।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাড়ি আয়েশা খাতুনের। তিন ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে সে দেশের সেনারা। এরপর পালিয়ে আসেন তিনি। নিজের শেষ সম্বল দুটি মুরগিও সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত থেকে গতকাল দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম আলোবেলা চারটার দিকে কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরের আমতলা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, গতকাল ভোরে পালিয়ে আসা শত শত রোহিঙ্গা খোলা মাঠে বসে আছে। এখানে কথা হয় রাখাইন রাজ্যের ফকিরাবাজার থেকে আসা তসলিমা আরার সঙ্গে। তাঁর কোলে চার বছরের ছেলে নুর শহীদ। হাতে আরেক মেয়ে নুর কলিমা (৭)। তসলিমা (৩৫) বলেন, ২৮ আগস্ট দুপুরে সেনাসদস্যরা তাঁর স্বামী নবী হোসেনকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছেন। তাঁর নিকটাত্মীয় আরও চারজনকে গুলি করে হত্যা করেছেন। তাই প্রাণ বাঁচাতে তিনি ছেলেমেয়েদের নিয়ে পালিয়ে আসেন। তাঁর ভাষ্য, ‘এখানে মরলে অন্তত জানাজাটা পাব।’

তসলিমার সঙ্গে আসা একই গ্রামের রোহিঙ্গা মুহসেনা বিবি (২৮) বলেন, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করা হলেও বাংলাদেশে আশ্রয় হচ্ছে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছালেও মাথা গোঁজার ঠাঁই হচ্ছে না। আসলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে কেউ নেই। তিনি কান্নাকাটি করে আঞ্চলিক ভাষায় জানতে চান, ‘অ বাজি, এত নির্যাতন আর সহ্য নআর। আঁরা এহন হরে যাইয়ুম?’


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান