৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৪২ | সাপ্তাহিক  | ২১ জুন ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

আরশিতে দেখা কলমে লেখা -১০/ কাকাজান এসেছেন টরন্টোতে !

সাজ্জাদ আলী

সপ্তাহদুয়েক হলো কাকাজান শহরে এসেছেন। উঠেছেন টরন্টো ডাউন টাউনের এক বনেদি হোটেলে। কতদিন থাকবেন বা কেন এসেছেন, -সেটা স্পষ্ট নয়! জিজ্ঞাসার জবাবে বলেছেন, “তোমাদের দেখতে এসেছি”। বলেছেন বটে তবে দেখতে যে আসেননি সেটা বেশ পরিস্কার। শহরে আমার থেকেও তাঁর নিকটাত্মীয়রা আছেন। এসে অব্দি তাঁদের কারো সাথে কোন যোগাযোগ করেননি। শুধু আমাকেই ফোন করে কক্ষ নম্বর জানিয়ে বলেছেন, “হারবার ক্যাসেল” হোটেলে চলে এসো।

 

কাকাজান বাড়াবাড়ি রকমের ধনাঢ্য মানুষ। স্বনামে-বেনামে দেশে-বিদেশে তাঁর সম্পদের পাহাড়। হাতখোলা স্বভাবের মানুষ তিনি। দূরসম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনদেরও বিপদে আপদে অর্থ সাহায্য করে থাকেন। বিনিময়ে স্বজনেরা যেন তার কাছে “নতজানু” হয়ে থাক, -এটুকুই তাঁর চাওয়া। তাঁর সম্পদ অর্জনের প্রক্রিয়া অতীব অস্বচ্ছ। সরকারি উঁচু পদে “ঘুষের চাকুরি” করে অবসরে গিয়েছেন। চাকুরি জীবনে ঘুষ খাওয়ার কোন সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি! ঢাকা শহরের অবৈধ টাকাওয়ালাদের তথাকথিত উঁচু সমাজে “ঘুষখোর” হিসেবে তাঁর খ্যাতি আছে।

 

দরিদ্র পিতার অতি মেধাবী সন্তান তিনি। অন্যের বাড়িতে লজিং-মাস্টার থেকে লেখাপড়া শিখতে হয়েছে তাঁকে। তবে জীবনের সব পরীক্ষাতেই তিনি একেবারে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম ছিলেন। পাঠ-অভ্যাসটি তাঁর এখনও অটুট। সুপন্ডিত তিনি। ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সব বিষয়েই মৌলিক পান্ডিত্য আছে তাঁর। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, একেবারে স্যুটেড-বুটেড দর্শনধারী! এক জীবনে চরম দরিদ্র অবস্থা থেকে পরম বিত্তশালী হয়ে উঠাটা (সম্ভবত) কাকাজান মানিয়ে নিতে পারেননি। শোনা যায় মদ, জুয়া, নারী থেকে শুরু করে অবৈধ উপার্যনের টাকাওয়ালাদের যত রকমের চারিত্রিক দোষ থাকতে পারে, কাকাজানের তার সবই আছে। আল্লাহপাক দোষ আর গুনের এক বিচিত্র বিন্যাস ঘটিয়েছেন তাঁর মধ্যে! পরিচিত মহলে পান্ডিত্য ও হাতখোলা স্বভাবের জন্য তিনি আদৃত হলেও, “পাছে লোকে কিছু বলে” -ব্যাপারটা তাঁর ক্ষেত্রে শতভাগ খাটে।

 

কর্তব্য মতো আমি তাঁর হোটেলে গিয়ে ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করলাম। বাসায় চলেন কাকাজান, টরন্টো এসে আপনি হোটেলে উঠেছেন, -এটা জানলে আম্মা আমার হাঁড় আর মাংস পৃথক করে ছাড়বেন। তাঁর লেক-ভিউ স্যুইটের জানালার ধারে বসে মিটমিট করে হাসছেন আর আমার খাতির-যত্ন উপভোগ করছেন। খানিক বাদে অনেকটা সন্ন্যাসীদের মতো হাত উঁচু করে আমাকে ইশারায় থামতে বললেন। মুখে বললেন, ওটা নিয়ে ভেবো না ভাবীকে যা বলার আমি বুঝিয়ে বলবো, তিনি বুঝবেন। তুমি এক কাজ করো, আগামী পরশু সন্ধ্যায় তোমার বাড়িতে আমার জন্য রাতের খাবারের আয়োজন করো। মাংস নয়, ঝাল কম দিয়ে রত্নাকে মাছ রাঁধতে বলো; বছরখানেক হলো আমি মাংস ছেড়েছি। আর আত্মীয়দের সবাইকে সেদিন তোমার বাসায় আসতে বলো, ওখানেই সকলকে দেখবো। কাকাজানের ব্যক্তিত্বটা এতই দৃঢ় যে তাঁর কথার উপরে কথা বলে কোন লাভ হয় না।

 

অগত্যা আদেশ পালনের জোগাড়-যন্তর শুরু করলাম। শহরে বসবাসরত আমাদের আত্মীয়দের এবং কাকাজানের বন্ধুস্থানীয় দুচারজনকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলাম। বিকাল নাগাদ সবাই এসে পৌঁছুলেন, কিন্তু তাঁর দেখা নাই। হাত-ফোনটি বন্ধ রেখেছেন, হোটেলের রিসেপশনিষ্ট জানালো ঘন্টাদুয়েক আগেই বেরিয়েছেন তিনি। কাকাজানের অপক্ষায় অতিথিদের নিয়ে আমার বাসার সামনের বারান্দাটুকুতে বসে গালগল্প করছি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার নামার পরে একখানা লিমুজিন ট্যাক্সিতে চড়ে তিনি এলেন। বারান্দায় দাঁড়িয়েই স্বভাব মতো সকলের কুশল জানলেন। পায়ে হাত ছুঁয়ে সালাম করায় স্মিতহাস্যে রত্নাকে বললেন, বাহ্ বৌমা এতগুলো বছর বিদেশে থেকেও দেশী-আদব তো ভোলনি! প্রশংসা শুনে সে তো খুশিতে বাকবাকুম!

 

বেলা ডোবার সাথে সাথে তাপমাত্রা পড়ে যাওয়ায় বাইরে শীত লাগছিলো। একে একে সবাই ঘরে গিয়ে বসলেন। বারান্দার একধারে অতিথিদের ১৫/২০ জোড়া পাদুকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেখানে একখানি টুলে বসে পা থেকে জুতাজোড়া খুলে কাকাজান আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা ঘরের মধ্যে রাখ। আমি ওটা বারান্দার এক কোনে রেখে ঘরের দরজা ঠেলে ধরে তাঁর ঢুকবার পথ সুগম করলাম। কিন্তু তিনি ঘরে না ঢুকে আমাকে আবারো বললেন, জুতো জোড়া ঘরের ভিতরে রাখ। আমি বললাম অসুবিধা নাই কাকাজান, জুতাটুতা আমরা বাইরেই রাখি। আপনি ভেতরে আসুন। তিনি বললেন না না ওটা অনেক সখ করে আমি সিংগাপুর থেকে আনিয়েছি; তুমি ভেতরে নিয়ে রাখ। বারান্দায় পড়ে থাকা আরো বিশ জোড়া সমমানের পাদুকার দিকে ইংগিত করে আমি আত্মবিশ্বাসের সুরে বললাম, কাকাজান আমাদের জুতা এখানেই থাকে, অসুবিধা নাই আপনি ভেতরে চলেন তো।

 

অতিথিরা সবাই ঘরের মধ্যে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আর আমরা গত তিন-চার মিনিট যাবৎ বারান্দায় দাঁড়িয়ে জুতো-বচসা করছি। আমার মাথায়ই খেলছে না যে, জুতা কেন তিনি ঘরের মধ্যে নিয়ে রাখতে বলছেন! কিন্তু কাকাজান তাঁর সিদ্ধান্তে অটল! মোজা পায়ে বারান্দায় ঠায় দাঁড়িয়ে তিনি! জুতা ঘরে নিতে আমি ইতস্তত: করছি, আর তিনিও বারান্দা ছাড়ছেন না। বললেন, বলা তো যায় না, দামি জুতোজোড়া এখানে থাকলে খোয়াও যেতে পারে! তিন/চার জোড়া জুতা আমার এভাবে হারিয়েছেও, তুমি ওটা ভিতরেই রাখো।

 

আমি বললাম কাকাজান বুঝতে চেষ্টা করুন, আমাদের এখানে জুতা চুরি হয় না। দেখুন বারান্দায় রাখা সব জুতাই দামি। এ দেশে (প্রায়) সবারই এ রকম কয়েক জোড়া করে জুতা থাকে; কে নেবে আপনার জুতা? আর কেনই বা নেবে? আরো বললাম, ভুল করে ঘরের দরজায় তালা না দিয়ে (শুধু ঠেলে রেখে), গত মাসে আমরা বাসার সবাই তিন দিনের জন্য অটোয়া বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে বাড়ির সব কিছু অক্ষত পেয়েছি। আমাদের এলাকাটি খুবই নিরাপদ, চুরি ছ্যাচড়ামির বালাই নেই।

 

আমার অতি কথনে তিনি বেশ বিরক্ত! খানিকটা উঁচু গলায় বললেন, না না তুমি ওটা ভিতরে নাও! রত্না এতক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের সংলাপ শুনছিলো। স্বভাব মতো এবার সে পরিস্থিতির কন্ট্রোল নিয়ে নিলো। জুতো জোড়া হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বিড়বিড়িয়ে বললো, সব সময় বেশি কথা বলে, আর বেশি বোঝে! কাকাজান আপনি ভেতরে আসুন তো, অযথাই আপনারা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। তো আমিও পিছু পিছু ঘরে ঢুকলাম। মনে মনে বললাম, এই মানুষটি এত যে দেশ বিদেশ ঘুরলো, এত মোটামোটা পুঁথি পাঠ করলো, তবুও তাঁর “বাংলাদেশী মেন্টালিটি” বদলালো না!

 

গালগল্প শেষে রাত্র দ্বিপ্রহরে কাকাজানকে হোটেল লবিতে নামিয়ে দিয়ে এলাম। আমাকে বললেন, আরো দিন সাতেক আছি তোমাদের শহরে। এর মধ্যে একদিন শহরটা ঘুরিয়ে দেখাবে। তো কাজের চাপ কম দেখে একদিন তাঁকে নিয়ে বেরুলাম। যাত্রার শুরুতেই তিনি নির্দেশনা দিলেন যে বিভিন্ন এথনিক কমিউনিটির ভিলেজগুলো দেখতে চাই। প্রথমেই গেলাম চায়না টাউনে, তারপরে লিটল ইতালি ভিলেজ এবং সেখান থেকে জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার। প্রথম বিপত্তি ঘটলো শ্রীলংকান অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে। একটি ফাস্ট ফুডের দোকানের দরজায় “এক ডলারে পাঁচটি সিঙ্গাড়া” সাইবোর্ড লেখা দেখে দোকানটিতে ঢুকে পড়লাম।

 

খরিদ্দারদের লম্বা লাইন, অন্তত দশ জনের পেছনে আমরা। লাইনে দাঁড়িয়েই আমি ফোনের মধ্যে ই-মেইলগুলো চেক করছি, আর সময় ক্ষেপণের জন্য কিছু একটা নিয়ে রত্না আর কাকাজান কথা বলছিলেন। কিছু বাদে তিনি জানতে চাইলেন কি কিনবে এখান থেকে? বললাম, এখানে প্রতি ডলারে পাঁচটা সিঙ্গাড়া পাওয়া যায়। গাড়িতে চলতে চলতে খাবো। কাকাজান অংক কষতে শুরু করলেন! স্বগতোক্তি করে বললেন, কানাডিয়ান প্রতি ডলার বাংলাদেশি ৬০ টাকা, তাহলে প্রতিটি সিঙ্গাড়ার দাম দাঁড়ালো ১২ টাকা! একেবারে আঁৎকে উঠলেন তিনি! বলো কি? এতো গলাকাটা দাম! বললাম, কাকাজান কানাডিয়ান প্রেক্ষিতে এই দোকানের সিঙ্গাড়া খুবই সস্তা। দেখছেন না লোকেরা কেমন লাইন দিয়ে কিনছে। তিনি বললেন, আরে না না ওরা গলাকাটা দাম নিচ্ছে! দাঁড়াও আমি দেখছি ব্যাপারটা!

 

খানিকটা শংকিত হয়ে পড়লাম, তিনি আবার কি দেখবেন! পরিস্থিতি হালকা করতে বললাম, মাত্র দু-এক ডলারেরই তো ব্যাপার! কি আর যাবে আসবে, বাদ দিন। আরে না, দু-ডলার বলে কথা না! দাম ন্যায্য হওয়া চাই। প্রতি ডলারে অন্তত আটটি করে সিঙ্গাড়া পাওয়া উচিৎ। কাউন্টারে টাকা দেবার সময় তুমি চুপ থেকো, আমি কথা বলবো। এই রে সেরেছে! উনি কি আবার দামাদামী শুরু করবেন নাকি! তাঁকে পরিস্থিতি অনুধাবন করাতে আস্তে আস্তে বললাম, কাকাজান এটাতো নিয়মের দেশ, এখানে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই নিয়ম মেনে চলে।

 

তিনি শ্লেষের সুরে বললেন, তা তোমাদের দেশের “নিয়মটা” কি শুনি? সিঙ্গাড়া ক্রয়েচ্ছু লোকদের পকেট খালি করে দেওয়া? তাঁর এই মনোভাবে ভেতরে ভেতরে খুবই বিপন্ন বোধ করলাম। সত্যি সত্যিই যদি উনি কাউন্টারে গিয়ে দামাদামী জুড়ে দেন, তো লজ্জার আর সীমা থাকবে না! ক্যাশ কাউন্টারের মেয়েটা তো হতভম্ব বনে যাবে। আর সারা দোকানের সব লোকেরা তো ওনার অদ্ভুত আচরণ “হা” করে গিলবে! কিভাবে যে ওনাকে কানাডিয়ান কালচারটা বোঝাই, তাই ভাবছি। মাবুদ এ যাত্রা রক্ষা করো। রত্নার মুখেও দেখি শঙ্কা ও অস্বস্তির বলিরেখা!

 

কাকাজান রাশভারি মানুষ, এক কথা দুবার বললে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তবুও সাহস সঞ্চয় করে বললাম, এখানকার দোকানে পণ্যের যে দাম লেখা থাকে সেটিই চুড়ান্ত। ক্রেতার দাম পছন্দ হলে কিনবে, না হলে অন্য দোকানে যাবে। পন্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ দোকানির স্বীকৃত অধিকার, আর সে পণ্য কেনা বা না কেনা খরিদ্দারের ইচ্ছাধীন। এদেশে কেউ কারো অধিকার বা ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বাধ সাধে না। কাকাজান তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আমার আব্বার নাম নিয়ে বললেন, তুমি তাঁর ছেলে তো! দামাদামী তোমার রক্তে নেই, ও তুমি বুঝবে না! সিঙ্গাড়ার দামের ব্যাপারটা আমি দেখছি দাঁড়াও। মনে মনে প্রমাদ গুণলাম! আশু-বিব্রতকর পরিস্থিতি যেন দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম। কাকাজান কি করতে যাচ্ছেন তা তিনি বুঝতেও পারছেন না, অথচ দোকানের এতগুলো লোকের সামনে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যাবে!

 

আমার সর্ব সংকটের ত্রাতা “রত্না” আবারো হালটি ধরে এ যাত্রা রক্ষা করলো। ঐ লাইনে দাঁড়ানো অবস্থাতেই সে হঠাৎ উত্তেজিত ভঙ্গিতে কাকাজানের কাছে আমার নামে নালিশ শুরু করলো। বলতে থাকলো, দেখেন তো কাকাজান ও একেবারেই খাওয়া-দাওয়া কন্ট্রোল করে না। ওর রক্তে উঁচু মাত্রায় কলোষ্টোরোল আছে এবং হাই ব্লাড প্রেসারও আছে; আর ও কিনা এখন এই ডুবো তেলে ভাজা সিঙ্গাড়া কিনে খাবে! এই তোমার সিঙ্গাড়া খেতে হবে না, বের হও এখান থেকে। বলে ঠেলেঠুলে আমাকে দোকান থেকে বের করে আনলো। বাসা থেকে ফ্রুট-সালাদ বানিয়ে এনেছি, গাড়িতে গিয়ে খাবে। চলেনতো কাকাজান, গাড়িতে ওঠেন! এই “ফ্রুট-সালাদ” ব্যাপারটা কাকাজানেরও মনোপুত হলো। ওটি আমার কখনওই খাদ্য বলে মনে হয়নি, তবে আজ খেতে খারাপ লাগবে না। বাঁচা গেল! নিজ মনে আওড়ালাম সহস্র শুকরিয়া তব চরণে মালিক! তোমার বান্দাকে তুমি রক্ষা করলে!

 

গাড়িতে বসেই রত্না জানতে চাইলো, এবার কোন দিকে যাবো বলো? বললাম, বাঙ্গালী পাড়ায় যাও। সেখানে বাংলায় লেখা সব সাইনবোর্ড,- “দেশে টাকা পাঠানো হয়”, “একঘন্টার মধ্যে ফটো”, “ইসলামী বই পাওয়া যায়”, “সাপ্তাহিক বাংলা কাগজ”, -ইত্যাদি দেখে কাকাজান তো একেবারে অভিভুত! দোকানগুলোতে ঢুকছেন-বেরুচ্ছেন, দোকানী-খরিদ্দারদের সাথে বাংলায় কথাবার্তা বলছেন। রাস্তায় হাঁটাহাটি করা বঙ্গনারি-পুরুষদের দেখছেন। হয়তো কারো সৌজন্য সালামের জবাবে “ওয়ালীকুমসালাম” বলতে পেরে দারুন সুখ পাচ্ছেন! বাংলাদেশি একটি গ্রোসারী দোকানের পণ্য সামগ্রী দেখে কাকাজানের তো চক্ষু ছানাবড়া! আরে তোমাদের এখানেতো দেখছি লাক্স সাবান, খেজুরের পাটালি, কাঁচামরিচ, পটল, ধনেপাতা, পান-সুপারি, সবই পাওয়া যায়! আমি মাথা ঝেঁকে বললাম, জ্বি কাকাজান। একখানা লাক্স সাবান হাতে নিয়ে বললেন, এটা কিনবো, হোটেলের সাবানের গন্ধ ভাল না।

 

সাবানের দাম পরিশোধ করতে ক্যাশ রেজিষ্টারে আমরা লাইনে দাঁড়িয়েছি। একটাই মাত্র কাউন্টার, সামনে ৩/৪ জন খরিদ্দার। ধীর গতিতে লাইন এগুচ্ছে। আমাদের কেবলই সামনের খারিদ্দার কাউন্টারের লোকটিকে বললেন, একটি “দশ ডলারের ফোনকার্ড” দিন তো। কাউন্টার পারসন তার পেছনের দেয়ালে লটকানো ফোন কার্ডগুলোর মধ্য থেকে “দশ ডলার” লিখিত একখানি কার্ড এগিয়ে দিলো। খরিদ্দার একমুঠো র‌্যাজ পয়সা পকেট থেকে বের করে ফোন কার্ডের দাম পরিশোধ করলো। দোকানদার দ্রুত পয়সা গোনা শেষ করে বললো, আরো আট আনা দেন। খরিদ্দার বললো, গত সপ্তাহেই তো এই দশ ডলারের কার্ড সাড়ে সাত ডলারে কিনলাম, আজ বেশি চান ক্যান? দোকানির রুক্ষ জবাব, দাম বাইড়ছে আরো আট আনা লাইগবো। বিরক্ত খরিদ্দার পকেট থেকে বাড়তি পয়সা বের করে কাউন্টারের উপর ঝনঝন করে ফেলে কার্ড নিয়ে দোকান থেকে নিস্কৃত হলো।

 

কাকাজান আমার দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, কি মিয়ার ব্যাটা তোমাদের দেশে দশ ডলারের ফোনকার্ড তো দেখি আট ডলারে বিকোয়। দামাদামী নাই বলছিলে না? আমার লজ্জিত মুখখানা নত হয়ে পড়লো! কাকাজানকে কি করে বোঝাই যে, সারা কানাডার মধ্যে শুধুমাত্র বাংলা দোকানে গিয়েই বাঙ্গালীরা দামাদামী করে! আমরা কানাডা থাকি বটে, কিন্তু এদেশের “স্টান্ডার্ড” হতে পারিনি এখনও!

 

(লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration