৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৫০ | সাপ্তাহিক  | ২৩ আগস্ট ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হোক জয়!

ঋতু মীর

প্রার্থনার, নিবেদনের, সমর্পণের, নিমগ্নতার জন্যই গান। আমার বসবাস, বেঁচে থাকা, আনন্দ, বেদনার অনেকটাই জুড়ে থাকে হৃদয়ে গানের পাখীদের অবাধ আনাগোনায়,  সবুজ পাতার ডালে তাঁদের মধুর ধ্বনির কলতানে । নাহিদ কবির কাকলী আমার চিরচেনা সেই গানের পাখী। বুদ্ধিদীপ্ত কপালে একরাশ কালো চুলে চিকচিকে শিশির বিন্দু ঘাম হিমানীর মত লেগে, চোখে কোন সুদূরের ডাক, অভিব্যক্তি অনন্ত রহস্যের গভীর নীরবতায় ছাওয়া। আমি বলি –‘দপদপে সৌন্দর্য!’ কাকলী হাসে শিশুর আনন্দে, বলে-তুমি ভালোবাসতো তাই ...। গানকে অন্তরে ধারণ করে, জীবনের নিরন্তর সঙ্গী করে বেঁচে থাকার উদ্ভাসিত আনন্দে বিলীন এক শিল্পী কাকলী। গানের মাঝে জীবনকে দেখার, উপভোগ করার অলৌকিক ক্ষমতায় আলোকিত মানুষই পারে অন্তরে, কণ্ঠে, সর্বাঙ্গে গানকে ধারণ করতে। কাকলী তাদেরই একজন। গানের জগতে বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গানে ওর বিচরণ অনেকদিনের। গানের প্রতি নিষ্ঠা, ভালবাসায়, শুদ্ধ, শোভন সংস্কৃতি চর্চায়, পরিমিতিবোধে অনন্য কাকলীর কণ্ঠে গান আসে আপন মাধুর্যে, আসে সুর, তান, ছন্দ, লয়ের অপরূপ খেলার গতিময় আনন্দে।

 

রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা নিয়ে গত ৬ অগাস্ট হোপ ইউনাইটেড চার্চ মিলনায়তনে ‘বিমল আনন্দে জাগো’ র মনছোঁয়া সেই অনবদ্য সন্ধ্যা নিয়েই আজকের লেখার এই প্রয়াস। মুগ্ধতার মাত্রা যখন আকাশ ছোঁয় তখন সত্যিই তা প্রকাশের ভাষা থাকেনা।  ‘বিমল আনন্দে জাগো’র আয়োজন আমাকে মুগ্ধতার নির্বাক আনন্দের সেই স্তরে পৌঁছে দিয়েছে।  ব্যতিক্রমধর্মী এই আয়োজনে হল ভর্তি বোদ্ধা দর্শকের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আনন্দ আমাকে অভিভুত করেছে। ছিমছাম, অনাড়ম্বর মঞ্চের স্বস্তিদায়ক আবহ শুরুতেই মনোযোগ কাড়ে। মঞ্চে সবার মধ্যে এক পরিবারের একাত্মতা, পারস্পরিক সমঝোতা এবং সহযোগিতায় ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টা সত্যি প্রশংসনীয়। মঞ্চে প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান এবং ভুমিকায় সজাগ এবং যত্নশীল ছিলেন। সাদা শাড়ি, চুলে সাদা ফুলের স্নিগ্ধ পবিত্রতায় অপরূপ কাকলি,  স্নিগ্ধ লাবন্যে, সুন্দর সাজে চোখ জুড়ানো মেরী রাশেদিন, কবিতা সম্ভারে উজ্জ্বল, ধীর স্থির ব্যক্তিত্ব বেলায়েত হোসেন, তবলা খ্যাত শিল্পী সৌম্য দর্শন সজীব চৌধুরী, কি বোর্ডে দক্ষ ও বিচক্ষন মাহবুব এবং পারকাসনে নিবেদিত প্রাণ বিনম্র দীপ-এই সব মিলিয়ে উৎসব আমেজমাখা দৃষ্টিনন্দিত এক মঞ্চ পরিবেশ! ‘আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে’ রবীন্দ্রনাথের এই গানের সাথে নতুন প্রজন্ম সুকন্যা নৃতাঙ্গনের মাহিয়া হাবীবের নাচ দিয়েই অনুষ্ঠান উদ্বোধন হয়। অভিব্যক্তির বাঙময় কারুকাজ, ভঙ্গিমায়, মুদ্রায়, ছন্দে মুক্ত ঝর্ণার হিল্লোল তুলে শুরুতেই মাহিয়া এক ঝলক মুগ্ধতায় প্রস্তুত করে দেয় দর্শকদের। সর্বজন শ্রদ্ধেয় অমিত চাকমার প্রধান অতিথির সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর অনুষ্ঠানের মুল আয়োজন শুরু হয়। রবীন্দ্র প্রতিভার অসাধারণ ছটায় আলোকিত দর্শক একের পর এক গান ও কবিতা একাগ্র নিমগ্নতায় উপভোগ করেন । পুজা, প্রেম, প্রকৃতি ও স্বদেশ পর্যায়ের সংমিশ্রণে নির্বাচিত গান ও কবিতায় ছিল সুবিবেচনা এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনা। কণ্ঠস্বরের ভরাট মাদকতা, আবেগিক ওঠানামার পরিমিতিবোধে বেলায়েত হোসেন কবিতায় দর্শক মন ছুঁয়ে গেছেন। কণ্ঠের সুর যখন সঙ্গীতের মাধুর্য ও কথার ভাবকে অতিক্রম করে সেই লগ্নেই একজন শিল্পীর পরম সার্থকতা। সুরের ঐশ্বর্যে শক্তিমান কাকলীর সার্থকতাও বুঝি সেখানেই। ‘এখনো গেলনা আঁধার’-শেষের এই গান অবিস্মরণীয় এক আকুতিতে অন্তর ছুঁয়েছে।  তবলায় চমকপ্রদ বোল, ছন্দ, গানের কথা ও সুরের মেজাজ বুঝে তার পেছন ছোটার কাজটিতে সজীব অসাধারণ পারঙ্গমতার প্রমান রেখেছেন। সুচারু গ্রন্থনা, উচ্চারণের শুদ্ধতা ও সচ্ছন্দ উপস্থাপনায় মেরী বরাবরের মতই অনন্যা। শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং  কি বোর্ডে ‘ফিলার’ তৈরি সহ সব ক্ষেত্রেই মাহবুব মুন্সিয়ানার পরিচয় রেখেছেন। পারকাসনে দীপের সাবলীল নিমগ্নতা অনুষ্ঠানের মান বাড়িয়ে তৈরি করেছে এক ভিন্ন মাত্রা ।

 

প্রবাসে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বা আয়োজনের কাজটা যে কোনভাবেই সহজ নয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কেবলমাত্র ‘মনের ক্ষুধা’ মেটানোর অদম্য তাগিদেই যেন সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা এর রুপায়নের কাজটি নির্দ্বিধায় কাঁধে তুলে নিতে পারে। সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে ’বিমল আনন্দে জাগো’ র আয়োজন সেই অদম্য তাগিদেরই এক প্রকাশ। অশুদ্ধ এবং অপসংস্কৃতির ডামাডোলে সময় এখন উত্তাল । অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং বাণিজ্যিক প্রবণতা ‘ভোক্তার’ বিদগ্ধ মননশীল বোধের মাত্রাটা ছোঁয়ার বদলে কিছু চোখ ঝলসানো চমক তৈরিতেই যেন মহাব্যস্ত। সংস্কৃতির এই সঙ্কট সময়ে সুস্থ ধারার এমন অনুষ্ঠান আমাদের জন্য ‘মাইলফলক’ হতে পারে। প্রবেশ মূল্য বিহীন এই আয়োজনের সকল শুভাকাঙ্ক্ষী ও পৃষ্ঠপোষকদের অন্তরের সাধুবাদ জানাই। ‘বিমল আনন্দে জাগো‘ র সাফল্য ব্যর্থতার বিচারে ‘সবটাই ভাল’ এই বোধে মনটা একপ্রকার হেলেই আছে। শুধু বলার জন্যই বলা নয়- একজন শুভাকাঙ্ক্ষী দর্শক হিসেবে নিজ স্বার্থেই এই আয়োজনের অনিচ্ছাকৃত, ছোটখাটো , চোখ এড়ানো অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করি।  শুরুর দিকে মাইক্রোফোনে অতিরিক্ত ‘ইকো’ গান এবং কবিতার কথা বুঝতে অসুবিধা তৈরি করেছে। মঞ্চে ‘মনিটর’ এবং সেইসাথে তাৎক্ষনিক ‘ফীডব্যাক’ পাওয়ার বিষয়টা শিল্পীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই জানি। এক্ষেত্রে ‘ইকো‘ র আধিক্যে শব্দে ‘খেই’ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা খুব জরুরী ছিল। ‘লাইভ’ প্রোগ্রামে  শিল্পী এবং দর্শকের মাঝে সহজ সরল সংযোগ তৈরি এক ধরণের সূক্ষ্ম শৈল্পিক কৌশল। মঞ্চে পরিমিত প্রাসঙ্গিক কথোপকথন, দৃষ্টি বিনিময়, আসন ভঙ্গি, নড়া, চড়া সবকিছুই দর্শক মনোযোগ ধরে রাখায় বিশাল ভুমিকা রাখে। গোছানো, পরিমার্জিত বক্তব্যে বেলায়েত হোসেন এবং কাকলী প্রায় পুরো সময় ধরেই দর্শক মনোযোগের কেন্দ্রে ছিলেন। কণ্ঠ আরামদায়ক অবস্থানে না থাকায় কিছুটা ঘাবড়ে যাওয়া কাকলীকে শুরুর দিকে অভিব্যক্তির অনাবশ্যক দৃঢ়তায় কিছুটা ঋজু কঠিন মনে হয়েছে। দর্শকের সাথে যথাযথ দৃষ্টি বিনিময়ের মাহেন্দ্রক্ষণ ‘হাতছাড়া’ করা-এইসবই কিন্তু দর্শক অনুভুতিতে একধরণের ‘বিছিন্নতা’ বা ‘আইসোলেসন’ তৈরির বিপদজনক অবস্থা তৈরি করতে পারে। এছাড়াও বেলায়েত হোসেনের কখনো কখনো অতিরিক্ত বুজে যাওয়া, কিছুটা ভেসে যাওয়া কণ্ঠে আবৃত্তি কবিতার ভাব এবং ছন্দে ছন্দপতন ঘটিয়েছে। মিলনায়তন এবং মঞ্চের অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো ধ্যান নিমগ্ন আলোছায়ার পরিবেশ তৈরিতে বাঁধা হয়েছে । সবশেষে, রবীন্দ্রনাথের গান ও কাব্যে আত্মার নিগুরতম অভিব্যক্তির প্রকাশটা চিরন্তন। পৃথিবীর অনিবার্য সব দুঃখ কষ্টের স্রোতে ডুবে যেতে যেতে বেঁচে থাকাটা যখন মাঝে মাঝেই অর্থহীন বলে মনে হয় কবি গুরুর অমর বানী যেন অসীম শক্তি হয়ে অন্তরকে মহিমান্বিত করে, একজন বিশুদ্ধ মানুষ হিসেবে বাঁচার ব্যাপ্তিটাকে বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। মানুষে মানুষে অনাকাঙ্খিত বিভেদ, সম্পর্কের বন্ধনে অবিশ্বাসের এই দুঃসময়ে  ‘বিমল আনন্দে জাগো’ মঙ্গলবার্তা হয়ে হৃদয়কে আলোড়িত করেছে বলেই আমার বিশ্বাস। শুদ্ধ সংস্কৃতির জয় হোক !

 

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration