মানুষ অনুসন্ধানে গভীর উপলব্ধি প্রয়োজন

Wed, Mar 3, 2021 11:03 AM

মানুষ অনুসন্ধানে গভীর উপলব্ধি প্রয়োজন

জুলফিকার বকুল :একটা ভাল মনের সান্নিধ্য পেতে চাইলে নিজের মাঝে একটা ভাল মন তৈরী করা প্রয়োজন। কারণ, মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গি ও গভীর উপলব্ধি দিয়েই কেবল মানুষ চেনা যায়।তাছাড়া আপাত দৃষ্টিতে সবাই তো মানুষ!কেউ সত্যকে সত্যই জানে, কেউবা মিথ্যেকে সত্য জানে। আবার কেউ কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা কোনটাই জানেনা।হয়তো কেউ জেনেও জানেনা।

একবার এক লোক নদীতে বঁড়শি ফেলে মাছ ধরছিল। পাশের ঘাটেই আরেক জন লোক গোসল করছিল। হঠাৎ একটা মাছ বড়শিতে আটকে গেলে ঐ ব্যক্তি আগ্রহের সহিত দেখছিল মাছটি কিভাবে উঠায়। যাইহোক, সে বাড়ী ফেরার পথে একজনকে বলল, নদীতে দুই কেজি ওজনের একটা রুই মাছ ধরা পড়েছে।ঐ একজন বাজারে চা স্টলে বসে বলল, নদীতে নাকি পাঁচ কেজি ওজনের একটা রুই মাছ ধরা পড়েছে। ক্রমান্বয়ে মাছটির ওজন বেড়েই চলছিল।প্রকৃতপক্ষে এরা কেউই মাছটির প্রকৃত ওজন জানেনা।এমনকি যে মাছটি শিকার করেছে সে নিজেও সঠিক ওজনটি জানেনা যতক্ষণ মাছটির পরিমাপ করা না হয়।অনুমান নির্ভর পরিমাপ কখনও সঠিক হয় না। মানুষকে কোন মাপকাঠিতে পরিমাপ করা হয় তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। কথায় আছে সত্য আজ অথবা কাল বিজয়ী হবেই।কিন্তু এই কাল বলতে আসলে কবে,কখন? সত্য সন্ধানীরা আজ আত্ম মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার্থে বঞ্চিত মানুষের ভীড়ে চাপা দীর্ঘশ্বাসে নিজের কাছে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।কোথায় সততার পুরস্কার? যাকে দিয়ে মানুষ সুবিধা আদায় করতে পারেনা তাঁর সততার কি মূল্য আছে?যার আদর্শের কাছে বেশিরভাগ মানুষ সীমানা অতিক্রম করার দুঃসাহস দেখাতে পারেনা, পারেনা অন্তরালের স্পৃহাকে পূরণ করতে, সে সত্তাটির মূল্যায়ন নিয়ে চিন্তা করা আর না করা একই কথা।

'বইপড়া' প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ' যাঁরা হাজারখানা ল-রিপোর্ট কেনেন, তারা একখানা কাব্যগ্রন্থও কিনতে প্রস্তুত নন,কেননা,তাতে ব্যবসার কোন সুসার নেই।'

উক্তিটি যে মানুষ মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও কার্যকরী ভূমিকা রাখবে তা কখনও বোধগম্যতায় আসেনি।সামাজিক ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই দেশ তথা জাতি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন-যাপনের মাধ্যমে উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত হয়।কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের ধারক ও বাহক কারা?যে সমাজে শিক্ষিত, জ্ঞানী, চিন্তাশীল, সৃজনশীল মানুষকে অবমূল্যায়িত করে ভবিষ্যতে সুদিন প্রাপ্তির প্রত্যাশায় প্রহর গুনতে হয়,আদৌও সে সুদিন আসবে কি না মনে প্রশ্ন থেকে যায়।

নানা বৈচিত্র্যের মানুষ নিয়ে গড়ে উঠেছে পৃথিবী। তাই ভিন্ন ভিন্ন সত্তা ও গঠন নিয়ে মানুষ একে অপরের থেকে আলাদা।জাতি,গোষ্ঠী, ধর্ম, সংস্কৃতিতেও মানুষের ভিন্নতা প্রাচীনকাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে চলমান রয়েছে। তবে জীব হিসেবে মূল যে সত্তা তা হলো 'মানুষ '। যুগে যুগে মানুষের প্রয়োজনেই ধর্ম,গোত্র, বর্ণ, জাতির সৃষ্টি হয়েছে।এসবের প্রয়োজনে মানুষ সৃষ্টি হয় নাই।আদিমকালে মানুষ গাছের ছাল,পাতা দিয়ে লজ্জা নিবারণ করত,পাহাড়ের গুহায় বসবাস করত,কাঁচা ফলমূল, মাংস খেত। তারপর আস্তে আস্তে মানুষ যখন সভ্য জাতিতে পরিণত হলো, তখনই প্রয়োজনীয়তা উদ্ভাবনের দিকে ধাপিত করল।অর্থাৎ, জ্ঞানের বিকাশ শুরু হলো। আর জ্ঞান তো জ্ঞানীর কাছেই থাকে, তাই আজকের যে অত্যাধুনিক জ্ঞান বিকাশ তা কেবল মানুষের কাছ থেকেই এসেছে।কাজেই বলা যায় যে জীব হিসেবে মানুষ হলেও এর মাঝে আদিম মানুষও আছে।যারা এখনও মানবিক মূল্যবোধের মানুষ হতে পারেনি।জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে নিজেকে প্রকৃত মানুষ তৈরি করতে পারেনি। এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে মানুষ চেনা সম্ভব? যেখানে সবাই দেখতে মানুষের মত।খাওয়া,ঘুম, জন্ম,মৃত্যু ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেও এক। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?এই পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণতার সহিত উপলব্ধি। একজন মানুষ একসাথে একই বিষয়ের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচারক এবং দয়াবান হতে পারে না। কারণ, যদি সে ন্যায়বিচার করে তাহলে দয়া দেখানো যায় না,আবার যদি দয়া দেখায় তাহলে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হয় না। ঐ মানুষটিকে যদি এই দুটি গুণের দ্বারা উপলব্ধি করা হয় তাহলে তাকে কি বলা যায়? ভাল না খারাপ। তিনি যদি ন্যায় বিচার করেন তাহলে কারো না কারো কাছে খারাপ হয়ে যাবে,অপরদিকে যদি দয়া দেখায় তাহলেও কেউ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে,ফলে কারো কাছে খারাপ হয়ে যাবে।বিষয়টি একটা জটিল সমীকরণের মত।

তবুও জটিল জীবনবোধের চেতনা থেকে আমাদের মানুষ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।যে মানুষের দ্বারাই গড়ে উঠবে আগামির শান্তিময় পৃথিবী।

লেখক:জুলফিকার বকুল,শিক্ষক, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, গাজীপুর


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান