গ্রস্ত প্রকাশনী

Sun, Nov 29, 2020 4:20 PM

গ্রস্ত প্রকাশনী

দেবার্ঘ্য মুখার্জী: আরে রাখুন মশাই, এমন লেখা রোজ রোজ কত মানুষ যে নিয়ে আসে আমাদের কাছে, তার মনে তো এটা নয় লেখা আনলেই সেটা ছেপে বের করতে হবে, আরে বাবা বাজার খাবে তবে না, মোদ্দা কথা হলো বাজারে  বই এর কাটতি  কেমন সেটাই বড়ো কথা । আর আজকাল তেমন ইন্টেলেক্টওলা লেখাটেখা মানুষ এতো পড়ে না মশাই,  এই তো ধরুন না সেদিন সাইফুল হকের এত বড়ো একটা আর্টিকেল আমরা বের করলাম আমাদের মাসিক পত্রিকাতে তা লেখাটা কটা মানুষ পড়েছে শুনি? হাঃ? ওনার নাম আছে তাই ছাপতে হয়, তাই বলে সব্বারটা নাকি? প্রকাশকের ঘরের পুরোনো পাখাটা খটাস খটাস শব্দ করে ঘুরছিলো, সামনের মানুষটার কথা গুলো নাকি ওই পাখার শব্দ কোনটা কানে বেশি লাগছিলো, তাই রবীন্দ্রনাথ বাবু বুঝতে পারছিলেননা,  শেষের কথাটা যেন, একটু বেশিই কানে লাগলো, শুরুর দিকে লেখক কবিদের কপালে  সম্মান-তোম্মান বিশেষ যে জোটেনা সেটা তিনি জানেন, তাবলে এভাবে পত্রপাঠ অপমান করে বের করাটা মেনে নিতে পারলেন না, একটা তীব্র অভিমান আর চোখ ফেটে বেরিয়ে আসা কান্নাটা চেপে অস্ফুট হাসি দিলেন, চ্যানেল ফাইলে বাংলা হরফে কাল রাতে ডিটিপি করা লেখাটা হাতে তুলে শুকনো নমস্কার জানালেন.

প্রকাশক মশাই সরু সোনালী ফ্রেমের চশমার ওপর থেকে তাকিয়ে দেখে বললেন, “ও মশাই, এই দেখো, আপনি তো আবার রাগ করে ফেললেন দেখছি”, আর এই কথাটাতে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না রবীন্দ্রবাবু, বললেন, “কি করবো বলুন আমার নাম রবীন্দ্রনাথ সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো নয়, তাই এত ভালো প্রবন্ধটা শুধু প্রথম অংশটুকু পড়েই আপনি রিজেক্ট-এর খাতায় ফেলে দিলেন”, 

এবার মুচকি হাসলেন প্রকাশক, আরে না না, ব্যাপারটা তেমন নয়, রবি ঠাকুর হতে হবে না, আমি বলি কি সামান্য কিছু খরচাপাতি করুন, একটা দুটো বই আমরাই বের করে দেব, একটু এ ষ্টল ও ষ্টল বলে শোকেসের সামনের দিকে সাজিয়ে রাখলেই কেল্লা ফতে, তখন দেখবেন আপনার ঘরে আমার মতো কত প্রকাশক লাইন দিয়েছে এমন সব লেখার বায়না নিয়ে. হেহে করে হেসে উঠলেন তিনি |

“ও বুঝলাম”, উত্তর দিলেন রবীন্দ্রনাথ, আচ্ছা দেখি |

আরে দেখা-টেখার দিন শেষ, সামনের বইমেলার জন্য কিছু লিখে ফেলুন না, আমরা তো ৪-টে ষ্টল দি ফি বছর, কোনো একটার সাইড এ আপনার লেখার ফেস্টুন ঝুলিয়ে দেবখনে | আসলে ব্যাপার খানা হলো, বই আজকাল কেও তেমন পড়ে না, বুঝলেন না, বই কেও পড়েনা, সবাই সাইজ মতো খাপে খাপ বসিয়ে রাখে |

এমা ছিহঃ কিসব কথা বার্তা, বলে ওঠে রবীন্দ্রনাথ ;

মুখ থেকে কেমন একটা চুক চুক শব্দ বের করে প্রকাশক মশাই বলেন, ধুস, ওসব না, শুনুন বুঝিয়ে বলি ব্যাপারটা | ধরুন বালিগঞ্জ প্লেসের ওপর ১২০০স্কোয়ার ফুট এর ফ্লাট, সাইড এ রাখা আছে বুকশেলফ , অল্প জায়গা | সেখানটা  বই দিয়ে সাজাতে হবে | তো কি বই কিনবো, কি বই কিনবো, ভাবনা নেই, মাপ দেখে নিয়ে, বুক ষ্টল গিয়ে, মনের মতো কালার ম্যাচ করে কিছু কিনে নাও | তবে এসব ক্ষেত্রে বিদেশী বই বেশি জায়গা করেছে | কারণটা বুঝতে পারছেন তো, বাঙালি তো, তাই সব সময় নিজের সাহিত্য বাদ দিয়ে অন্যের সাহিত্য পড়েছি এটা যদি বন্ধু বান্ধবদের দেখাতে পারে, অনেক বেশি মান-ইজ্জত বাড়বে, এই আরকি |

মুখের হা টা আরো বড়ো হলো রবীন্দ্রনাথের | বললেন, এমন হয় নাকি আবার?

আলবাত হয়, হচ্ছে তো এটাই, ওই যে বলে, "যো দিখতা হয় ও বিকতা হায়" তাই তো আমাদের প্রতিটা বইয়ের প্রচ্ছদটা ঝাঁ চকচকে করা থাকে, খদ্দের দেখলেই কিনে সাজিয়ে রাখবে | আমি তো আলাদা করে গ্রাফিক্স সাইকোলজিস্ট দিয়ে কালার সিলেকশন করাই মশাই, এখন কম্পিউটার এ সব কালার পাওয়া যায়, এটার পাশে ওটা বসিয়ে দারুন ডিসাইন করে দেয় ওরা |

আর কথা না বাড়িয়ে প্রকাশক এর অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লেন রবিবাবু, বাইরে লেখা আছে রেবতী প্রকাশনী সাইড এ আবার ক্যাপশন আছে "মানে গুনে সবার সেরা ", মনে মনে ভাবলেন, হা সেরাই বটে, গুনে গুনে পয়সা নিতে সেরা, মান গুন্ চুলোয় গেছে, যত্তসব |

যতীন আরো ৩-৪ টা প্রকাশকের ঠিকানা দিয়েছে বটে, এই আসে পাশেই হবে কোথাও | এগিয়ে যাচ্ছিলেন হঠাৎ চোখে পড়লো, "বর্ণহীন প্রকাশনী ", মনে মনে ভাবলেন, নামেই যারা বর্ণহীন, হয়তো বা তার মতো সাদা কালো নতুন লেখককে পাত্তা দিলেও দিতে পারে , ঠাকুর নাম করে ঢুকে পড়লেন, কাঁচের দরজা ঠেলে |

সামনের চেয়ার এ বসে আছে একটি কম বয়েসের ছেলে, এগিয়ে গিয়ে রবি বাবু নিজের আসার হেতু জানাতেই, ছেলেটি বললেন, ওই সোফাতে বসুন, একটু পরেই স্যার একজন একজন করে ডাকবেন | সোফায় বসে এদিক ওদিক দেখে বুঝলেন, এই আশপাশের ছেলে ছোকরা তার মতোই প্রকাশকমশাই এর কাছে এসেছে,

তা ভালো দশটা মানুষ আসছে যখন এদের  কাজ কর্মও হয় ভালো নিশ্চই |

বসে থেকে থেকে কিছু ঢুলুনি এসে গেছিলো রবি বাবুর, ছেলেটি বললো, এবার আপনি যেতে পারেন | বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে ঘুম ভাবটা তাড়িয়ে নিলেন তিনি, তারপর সোজা পাশের চেম্বারে এসে ঢুকলেন |

সামনের চেয়ার অলংকৃত করে বসে আছেন, বিশাল বপু পঞ্চাশ উর্ধ প্রকাশক মশাই | পাশেই একটি সুন্দরী মেয়ে, হয় তো ওনার সেক্রেটারি | অফিসের দেওয়াল সু-সজ্জিত, এদের বিক্রিবাটা ভালোই হয় বেশ বোঝা যাচ্ছে |

ভদ্রলোক কোনো কথা বলছেন না, মেয়েটি সব কথা বলছে, ছোট ছোট চোখ করে রবি বাবু কে শুধু ওয়াচ করছেন ভদ্রলোক | একটু অস্বস্তি হচ্ছিলো বটে ওনার, কিন্তু মানিয়ে নিচ্ছিলেন |

সব লেখা মেয়েটি খাপছাড়া ভাবে পড়লো | তারপর বললো আপনি কি আমাদের প্রকাশনীর আগের কিছু লেখা পড়েছেন বা শুনেছেন?

না সেভাবে পড়া হয়নি, বললেন রবি বাবু |

মেয়েটি সাইড ড্রয়ারের থেকে বের করে দিলো ৪-৫ টা বই |

আর বললো, এগুলো আমাদের লেটেস্ট এডিশন, আমাদের বইমেলার ষ্টল এর সামনে পুলিশ রেখে ভিড় কন্ট্রোল করতে হয়, মেলা শেষ হবার আগেই, বই শেষ হয়ে যায়, তবে আমরা এখন তো অনলাইন অর্ডার নিচ্ছি, তাই আমাদের ক্রেতা দের তেমন অসুবিধা হয় না, আপনি একটু পড়ে দেখুন, যদি এমন লেখা কিছু থাকে, আমরা কিনে নেবো।

প্রথম বই এর মলাটে অতি স্বল্প পোশাক পরা একটি মেয়ে শুয়ে আছে, আর টাইটেল আছে "নিষিদ্ধি রজনীর সুবাস"| এই একটা বই দেখেই রবি বাবু বুঝে গেলেন, এ জায়গা তার জন্য না।

বই গুলি মেয়েটির দিকে সামান্য এগিয়ে দিয়ে বললেন, না থাক ম্যাডাম, আমি এরম লেখা তো ঠিক লিখি না।

ঠোঁটের কোনে ফিক করে হেসে মেয়েটি বললো চেষ্টা করেই দেখুন না, আপনার মতো বয়েসের কত মানুষ আমাদের সাথে রেগুলার কাজ করেন, শুরুতে একটু অসুবিধা হলেও ধীরে ধীরে দেখবেন, লেখার ফ্লো এসে যাবে।

এবার মুখ খুললেন প্রকাশক ভদ্রলোক, আপনারা হলেন, গুণী মানুষ, এসব লেখা তো জলভাত আপনাদের কাছে, বাংলাদেশে খুব ডিমান্ড এসব লেখার, জানেন তো। আর কাঁচা পয়সা আছে, ভেবে দেখুন। আমাদের সাথে কাজ করলেন, টাকা এল, পরে না হয়, আমার বন্ধুকে দিয়ে কিছু কবিতা গল্প যা বলবেন তেমন বই ছাপিয়ে দেব। প্রেস মিটিং করবেন, সভাঘরে লোক হাততালি দেবে, আপনিও খুশি আমরাও খুশি।

মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছিলো রবিবাবুর।

মেয়েটা চামড়ার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ওনার দিকে তাকিয়ে হাসছিলো মিটি মিটি, রবিবাবুর শরীরে অস্বস্তি লাগছিলো, উঠে পড়তে পারলে বাঁচেন। নমস্কার জানিয়ে উঠে বললেন, একটু ভেবে দেখি।

বাইরে বেরিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। বাপরে বাপ্

বাড়ি এসে শান্তি করে এক কাপ চা খেয়ে নিজের ছোট্ট সাজানো বাগানটাতে বসে থাকলেন বেশ কিছুক্ষন। নিজের মনকে  প্রশ্ন করতে লাগলেন, এই যে সবাই বলে গেছে "চেষ্টা করে যাও ফলের আসা না করে, ফল ঠিক আসবেই" কথাটা কতটা সত্যি? শালা, চেষ্টার কোনো ত্রুটি রেখেছি? হাঁটুর বয়েসী ছোকরা প্রকাশককে স্যার স্যার করে তেল দেওয়া থেকে লিটল ম্যাগাজিনের ইন্টেলেক্চুয়াল প্রকাশক এর সস্তা বুর্জোয়া সমাজ শত্রুর আসরে গল্প শোনা, চা খাওয়ানো সবই তো করলেন, ফল কি মিললো? আর আজকের অভিজ্ঞতা তো কহতব্য না। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে তার টেনিদার ভাষাতে বলতেই পারতেন তোমার কেসটা পুড়িছেরী.

ভালো সরকারি অফিসার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, স্ত্রীর অসুস্থতাতে ভি.র.স. নিয়ে নিলেন, যা ছিল সবটাই ডাক্তার আর হাসপাতালে চলে গেল, তাও বাঁচাতে পারলেন না স্ত্রী মাধবীকে, সন্তানাদিও নেই, তাই একদম একা হয়ে গেলেন, আর সঙ্গী হলো সাহিত্য, কিন্তু তাতেই আর সাফল্য কোথায়! রোজই প্রকাশক এর দোরে দোরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, আরে বাবা নিজের টাকাতে বই ছাপাবার সামর্থ থাকলে তোদের আমি তেল দিতাম!!, কবে বের হয়ে যেত আমার বই।

লেখা লেখির অভ্ভাসটা ছোটবেলাতে ছিল। স্কুল কলেজের নানা পাত্র-পত্রিকাতে ওনার লেখা বেরোতো, তারপর যা হয়, সংসার সামলে কটা বাঙালি আর লাইফ এ যা হতে চেয়েছিলো সেটা হতে পারে। সেইদিক থেকে বাপু সাহেবগুলো আমাদের থেকে এগিয়ে, এই তো সেদিন কোন এক সাহেবের কথা পড়ছিলেন যেন কাগজে, ৯০ বছর বয়েসে কি এক নাটক না নভেল লিখে খুব বিখ্যাত হয়েছেন, আগে নাকি কেও তাকে চিনতো না , তারপর যতীন বলছিলো, কি এক KFC না কি আছে, তার মালিক নাকি অনেক বুড়ো বয়েসে এসে কোটিপতি হয়েছে। তা সে কোটিপতি হবার শখ ওনার নেই। বিধু চৌধুরী লেনের এই পৈতৃক বাড়িতে তিনি সুখেই আছেন, অত টাকার শখ ওনার কোনো কালেই ছিল না, নাহলে কত কোটি টাকার টেন্ডার পাস হয়েছে যার হাত থেকে, একটা পয়সা ঘুষ নিতেন না বলে আজ সামান্য বই ছাপাবেন সেই সামর্থ হচ্ছে না। রবিবাবুর ছোটবেলাটা কেটেছে, গ্রামের বাড়িতে। বাবা ছিলেন প্রাইমারি স্কুল এর হেড মাস্টার। সংসারে অভাব ছিল না কোনো কালেই, বাবার কাছেই বাংলাটা পড়েছেন ছোটবেলাতে । ছোটবেলার কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে ওনার । বাবা বলতেন, নিজের ভাষাটা না শিখতে পারলে, নিজের শিকড়কে চেনা যায় না। কতই না সুন্দর ছিল সে সব দিন গুলো, তারপর বড় হলেন, চাকরি নিয়ে চলে এলেন কলকাতা শহরে, ধীরে ধীরে এই শহরের কত রূপ এর রং পাল্টাতে নিজের চোখে দেখলেন। বাবা নিজেই আর থাকতে চাইতেন না গ্রামের বাড়িতে, নিজের টাকাতে, এই বাড়িটা করলেন। আসে পাশে কত ফাঁকা জায়গা ছিল তখন। বাড়ির সামনের এই বাগানটা তো বাবার উৎসাহেই করা। বিয়ের পর মাধবী অনেকটা সামলে দিয়েছে। স্ত্রী মাধবীর অভাবটা কেমন যেন তাড়িয়ে বেড়ায় ওনাকে। কথা বলার মানুষটা নেই । তাই ভেবেছিলেন, মনের কথা গুলো কাগজের পাতায় লিখে লোকের সাথে মনের ভাবের আদান প্রদান করবেন। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, এসব না করে, ধর্ম চর্চাতে মন দিলেই হতো । সেদিনও মিত্তির মশাই বলছিলো, রবি, আসতে পারো তো আমাদের ধর্ম পাঠের আসরে । যাবো ভেবেও গেলেন না। আসলে ধর্ম নিয়ে কোনো দিন ও সেভাবে মাথা ঘামাননি উনি, ধর্মের পরিবর্তে কর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

এমন সময় কলিং বেল বাজলো,

শ্রীমান যতীন উপস্থিত

যতীন হলো রবিবাবুর শালা, নানান ধরণের ব্যবসা আছে, আর হালফিলে ধরেছে কনসাল্টেন্সি ব্যবসা। কোনোটাতেই তেমন সুবিধা করতে না পারলেও, উৎসাহের খামতি নেই কিছুতে, এক কথায় যতীনই তাকে এই লেখালেখিতে উৎসাহ দিয়ে শুরু করিয়েছে।

"দেখুন জামাই বাবু, সময় কিছুর জন্য থেমে থাকে না, দিদি নেই, আমাদের সব্বারই খুব কষ্ট, কিন্তু এভাবে একা একা কি করে বাঁচবেন! কিছু একটা করুন, কিছু শিখতেও পারেন" বলেছিলো যতীন

"শিখবো? এই বুড়ো বয়েসে কি শিখবো? না না বাবা, ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ভিড়ে শিখতে গেলেই বলবে, বুড়োটা শিঙ ভেঙে বাছুরের দলে নাম লিখিয়েছে রে " উত্তর দিয়েছিলেন রবিবাবু

তখন অনেক ভেবে চিনতে এই লেখা লেখির পালা শুরু হয়।

তবে মন্দ তিনি লেখেন না | ওনাদের পাড়ায় বেশ কয়েক বার কবি সংবর্ধনাতে কবির জন্য সম্মান পত্র লিখে দিয়েছেন, একবার ওনারই লেখা ছোটদের নাটক নিয়ে কত হইহই হলো বিজয়া সম্মিলনীতে। কিন্তু সব লেখকের ইচ্ছা থাকে, তার বই বের হোক, দশটা লোক পড়ুক, চিঠি দিক, মুখোমুখি হলে বলুক, আপনার অমুক লেখাটা পড়লাম, বা আমি আপনার ফ্যান। তাই সেই চেষ্টাটাই চালাচ্ছেন কটা দিন ধরে।

"তুই কি চা খাবি?" যতীনকে বলেন রবি বাবু। তবে করে নিয়ে আয়, আমি এই ফিরে এসে বসলাম।

না না, খাবো না, এই তো ঝুলঝুনওয়ালার অফিস থেকে এক পেট খেয়ে এলাম, শোনো না রবিদা, এই প্রজেক্টটা যদি পেয়ে যাই, তোমার বই আমি ছাপাবো, কোনো প্রকাশককে আর তেলাতে হবে না। আমি তো ভাবছিলাম ছোট করে একটা পাবলিকেশন বিসনেস খুললে কেমন হয়, এই যেমন ধরো, কলেজ স্ট্রিট চত্বরে, ৪০০ স্কোয়ার ফুট ...

“থাক”, থামালেন রবিবাবু। তোর এই গাছে কাঁঠাল আর গোফে তেল স্বভাব গেলো না। আগে টাকাটা পা, আগে থেকেই এত কিছু না ভাবলেও চলবে, কোথায় কিছু নেই পাবলিকেশনের ব্যবসা করবে, কি বুঝিস তুই এই ব্যাবসার!

আর পাবলিকেশনের যা অবস্থা দেখে এলাম আজ।

আরে ওসব নিয়ে কিছু ভেবো না, "Be positive " সব ব্যাবসার টাল-মাটাল আছে, হয় তো তুমি যাদের পাবলিকেশন দেখে এসেছো, ওদের খারাপ সময় চলছে, টা বলে তো আর সবার এমন হাল না - বললো যতীন

খারাপ হাল? না না মোটেও না, বেশ ফুলে ফেঁপে উঠছে ওদের ব্যবসা, তবে কি জানিস সাহিত্যটাই হারিয়ে যাচ্ছে, একজন বললো চকমকে কভারের মাপ মতো বই লিখুন, আর একজন তো বাংলা পর্নোগ্রাফির বই লিখতে বললো রে।

ছ্যাছ্যা, কি বলবো তোকে, বছর ২২ বয়সের একটা মেয়ে, আমার হাঁটুর বয়েস, সে আমাকে চিবিয়ে চিবিয়ে ওসব কথা বললো, মুখে বাধলোনা এত টুকু।

যতীন ফিক করে হেসে বললো, রবিদা, টাকা আর শরীর দুটোই এখন ট্রেডিং ট্রেন্ড।

ক্ষমা কর ভাই, ওসব উত্পটাং কিছু লিখে আমি বই ছাপাতে পারবো না। বিরক্ত স্বরে বলেন রবিবাবু।

আচ্ছা শোনো না, আমি আজ আরও কয়েকটা ঠিকানা পেয়েছি, দেখো একটু কথা বলে।

হুম, কাল যাবো নাহয়,

আমি উঠলাম দাদা, গুড নাইট, যতীন উঠে পড়লো

পরদিন সকালে আবারও নিজের ব্যাগ পত্তর নিয়ে বেরোলেন, যাবার আগে স্ত্রী মাধবীকে ছবির মধ্যে থেকে বলে গেলেন, তুমি মনে হয়তো ঐপারে বসে আমার পাগলামো দেখে হাসছো বলো! কিন্তু মনে প্রাণে বড়ো একা লাগে গো, তাই বেরিয়ে পড়ি,

ওনার কাজের মাসি লক্ষিদি এসে গেছে ততক্ষনে, ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে বললেন, রাতে বাড়ির ফেরার সময় একটিবার এস দিদি, তোমার এই মাসের টাকা টা নিয়ে যেও , আর তালাটা দেখে লাগিও, ডুপ্লিকেট চাবি আমার কাছে আছে , বলেই বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।|

যতীনের দেওয়া ঠিকানা গুলি দেখে দেখে সব কটায় ভিসিট হয়ে গেলো তার| শেষ জনের থেকে বেরিয়ে ঘড়িতে দেখলেন, ১২টা ০৫ বাজে। মনে মনে ভাবলেন, হা আজকের মতো তার বারোটা বেজেছে, এবার বাড়ি ফিরলেই হয়।

কলেজ স্কয়ার থেকে একটু এগিয়ে বাম দিকে যে চা এর দোকানটা আছে, ওখানে বসে চিনি ছাড়া চা এর অর্ডার দিয়ে, লোকের যাওয়া আসা দেখছিলেন তিনি। এই এক স্বভাব তার, লোক দেখা, অনেক ছোট বেলাতে, কেও তাকে বলেছিলো, প্রতিটা মানুষের জীবন একটা করে আলাদা আলাদা গল্প। তাই লোক দেখেন তিনি, বুঝতে চান, হাসি মুখে যে মানুষটা হাটছে, সে হয়তো অফিসে বসের থেকে গালি খেয়ে বাড়ি ফিরছে, কিমবা বউটার অসুখ, কারো বা শরীরে মরণ রোগ বাসা বেঁধেছে, সে জানে বা জেনেও না জানার ভান করে হাটছে।

“বাবু চা”, দোকানের ছেলেটা কাঠের টেবিলে চায়ের কাপটা রেখে বললো। ভাবনায় বাধা পড়ে তার।

গরম চাতে চুমুক দিতে দিতে লক্ষ করলেন, হালকা শ্যাম বরণ রোগা পাতলা একজন মানুষ ওনার দিকেই তাকিয়ে আছে, চোখে চোখ পড়তেই হেসে উঠলেন,

ভদ্রতার খাতিরে রবি বাবুও হাসলেন, মনে মনে ভাবছিলেন, এর আবার কি মতলব কে জানে, কলকাতা মানেই তো মতলববাজদের আড্ডাখানা, হয় ইন্সুরেন্সের দালাল আর নাহলে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং করতে বলবে,

লোকটি উঠে এসে বললেন, একটু বসি আপনার পাশে?

ঈষৎ সরে এলেন, রবিবাবু, বুঝিয়ে দিলেন, বসলেও তার আপত্তি নেই।

কিছু সময়, চুপচাপ

লোকটি নিজেই তারপর বললেন "যাক বাঙালি তাহলে আজ কাল ইন্টেলেক্চুয়াল নিবন্ধ লিখতে পারে," পাশের ওই লোকটির কেমন একটা মেয়েলি টাইপ পুরুষ কণ্ঠ, চা এর দোকান এর বেঞ্চ এ তার ফেলে রাখা লেখাটার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলছিলো । "আমাকে কিছু বললেন?" প্রশ্ন করলেন রবীন্দ্রনাথ, উত্তর এল হা, বেশকিছুটা চুপ থেকে ব্যাক্তিটি আবার ও প্রশ্ন করলেন " ছাপছে না বুঝি? ", বিরক্ত স্বরে রবীন্দ্রনাথ এর জবাব এল, না.

ছাপবে কি করে, এসব লেখা এর মর্ম বোঝে যারা তাদের কাছে পৌঁছতো হবে, তবে না।| ঘাড়টা ঘুরিয়ে রবীন্দ্রনাথ লোকটিকে একটা শ্লেষ জড়িয়ে বললেন “তারা কারা শুনি? ইহো জগৎ না অন্য জগৎ এর কোনো কেও?” মুচকি হেসে এবার আগুন্তুক বললেন, “১৩ নম্বর বনমালী এভিনিউ এ যান একবার, গিয়ে বলবেন দিগন্ত সান্যাল পাঠিয়েছে,"

প্রকাশনীর নাম "গ্রস্ত"

গ্রস্ত? এটা তো শুনিনি, কেমন লেখা নেন ওনারা? আগের দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতার স্মৃতি এখনো ভোলেননি রবিবাবু তাই আজ আর রিস্ক নিতে পারছেন না।

লোকটি জানায়, নতুন পুরানো সব লেখাই ছাপায় ওনারা, পয়সাওয়ালা মানুষ মশাই, বইয়ের কাটতি নিয়ে মাথা ঘামান না, প্রকাশকের কথা হলো সাহিত্য সৃষ্টিটাই মূল, পয়সা দিয়ে তার বিচার হয়না। আমি বলি কি যান একবার।

কথাটা মনে ধরলো রবিবাবুর। ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে ঠিকানাটা আরো একবার ভালো করে জেনে নিয়ে চলে এলেন প্রকাশকের ঠিকানাতে।

হা ১৩ন তো এটাই, কিন্তু এটা তো বাড়ি মনে হচ্ছে, ঠিক তখনই খেয়াল করলেন, পাশেই "গ্রস্ত প্রকাশনী" লেখা সাইনবোর্ড। গেট খুলে ভিতরে এসে, ডান দিকের অফিস রুমের দিকে চললেন।কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখলেন একজন বসে আছেন, রবিবাবুকে দেখেই নমস্কার জানিয়ে সামনের চেয়ারে বসতে বললেন।

আমাকে দিগন্ত সান্যাল আপনার ঠিকানা দিয়েছে। ওই কলেজ স্ট্রিট এ ওনার সাথে দেখা হয়েছিল, বললেন, আপনি নতুন লেখকদেরকেও সুযোগ দেন,

হা নিশ্চই, লেখার আবার নতুন পুরানো কি, আমি শুধু দেখি লেখার মান । আর সেটা যদি ঠিক থাকে, আমার তা ছাপার কোনো আপত্তি নেই। দেখি আপনি কি লিখেছেন।

বর্তমান যুব সমাজ আর চাকুরিমুখী শিক্ষার ওপর রবিবাবুর লেখা প্রবন্ধটি, প্রকাশককে বাড়িয়ে দিলেন উনি।

বেশ বেশ, বলে মন দিয়ে লেখাটি শুরু থেকে পড়তে লাগলেন প্রকাশক মশাই , ডান হাত টি চেয়ারের হাতলে রেখে, কপালের একদিকে চাপ দিয়ে পড়ছিলেন, আর মাঝে মাঝে সম্মতি মুলুক কিমবা প্রশংসা মূলক মাথা নাড়ছিলেন, এটা দেখে রবিবাবুর বুকে যেন একটু ভরসা এল। ছাপা হোক বা না হোক, মন দিয়ে লেখাটা পড়েছেন তো অন্তত।

মিনিট ২০ পরে বললেন, লেখার মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই কিন্তু আমাদের সিলেকশন কমিটিকে একবার দেখিয়ে নিতে চাই আমি লেখাটা।

“অবশ্যই” রবিবাবু সম্মতি মুলুক মাথা নেড়ে জানালেন।

তবে আপনি এটার জেরক্স কপি রেখে যান, বললেন প্রকাশক

আপনি এটাই রেখেদিন, আর কপি নেই, আপনাকে দেখে ভরসা আছে আমার, বলে উঠে পড়লেন রবিবাবু।

আজ বাড়ি ফিরে বেশ একটা স্বস্তি অনুভব করছেন তিনি। দিনের পর দিন যে অবহেলা নিয়ে বাড়িতে ফেরেন, সেটার অভাব আজ, বরং কিছুটা হলেও আশার আলো লেগে আছে মনে।

যতীন আজ এসেছিলো সন্ধেবেলা, সব কিছু শুনে বললো, হয়ে যাবে সিলেকশন, কি দাদা আপনাকে বলেছিলামনা, একদিন মূল্য পাবেনই আপনি, দেখুন মিললো তো!

বেশ একটা হাসি মুখে বললেন, রোসো ভায়া ওদের কমিটি কি বলে দেখা যাক।

কিছু ভাববেন না বলে যতীন।

পর পর ৩-৪ তে দিন বেশ ভালোই কাটলো, শুধু সামান্য অপেক্ষার উদ্দীপনা লেগেছিলো ওনার মনেতে, তবে যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন মনে মনে তিনি নিজেও।

গতরবিবার ফোন করেছিলেন প্রকাশক, বললেন, লেখাটা কমিটি সিলেকশন করেছে, আর ওনারা চান যে রবিবাবু নিজে একবার আসুন আজ সন্ধে বেলা, প্রতি রবিবার কমিটি মেম্বার ছাড়াও অনেক প্রকাশক আর বাঙালি সাহিত্যের দিকপালরা আসেন ওনার ওখানে, সবার ইচ্ছা একবার লেখাটা পড়ে শোনান রবিবাবু নিজে, এ লেখা সেখানে খুবই সমাদর পাবে প্রকাশক নিজে মনে করেন ”. কথাটা শেষ করে, ভদ্রলোক বললেন “এবার তাহলে রাখি?”, 

“আপনার নাম টা জানা হলো না!! বললেন রবিবাবু

“আমার নাম পরিতোষ পাঠক, আমারই বাড়িতে সভাটা বসে, আপনি ওই  সন্ধে ৭ টা নাগাদ আসুন, আমরা অপেক্ষা করবো”. বলেই ফোনটা রেখে দিলেন ভদ্রলোক।

উফফ সে যে কি আনন্দ , একবার ভাবলেন যতীনের মোবাইলে ফোন করে জানাবেন, তারপর ভাবলেন না, দেখা হলেই বলবেন।

সকালটা যেন কিছুতেই আর কাটছে না তার, ঠিক বিকাল ৬ টা নাগাদ এক কাপ চা আর দুটো বিসকুট খেয়ে রবীন্দ্রনাথ বেরিয়ে পড়লেন, ঠিক সন্ধে ৭ টা  ১০ এ প্রকাশকের বাড়ি পৌঁছে গেলেন, অফিস বন্ধ দেখে সোজা এগিয়ে এসে বাড়ির কলিং বেল বাজাতেই একজন কম বয়েসী ছোকরা চাকর দরজা খুলে দিলো, আর নিয়ে গেল এক প্রকান্ড হল ঘরে, ইতিমধ্যে অনেক মানুষ বসে আছেন, কারোর মুখ ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না, আলো আর অন্ধকারে শুধু অবয়বটি বোঝা যাচ্ছে, তাদের কেউকেই তেমন চেনা লাগছে না তাঁর। একজন মানুষ এর মুখটা একটু শুধু চেনাচেনা লাগছে, তরুণ বয়েস, কবি কবি চেহারা, একজন বেশ লম্বা হালকা দাড়ি আছে সুপুরুষ, আর একজন এর বেশ বলিষ্ট চেহারা সরু গোফ, ঘরের  আলো খুব কম, একটি করে চেয়ার তার পাশে একটি করে ছোট টেবিল. তারই ওপর রাখা টেবিল ল্যাম্প,  কাগজ পেন রাখা, রবিন্দ্রনাথকে চাকরটি একটি টেবিল দেখিয়ে দিলো, কয়েক মিনিটে বসে থাকার পরেই ওই পাশের বড়ো দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন, পরিতোষ বাবু। সকলকে নমস্কার করে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় দিলেন, সভা শুরু হলো, সভার শুরুতে, আগামী মাসের পত্রিকাতে কি কি প্রকাশ পাবে, পাঠকরা কি চিঠি দিয়েছে, কোনো অভিযোগ এসেছে কিনা, এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো। তারপরে শুরু হলো আলোচনা সভা, সেই সভার নিয়ম সহজ, সকলে একটি মাত্র নিজ রচনা পাঠ করতে পারবেন, লেখা পাঠ শেষ হলে অন্যরা সমালোচনা করতে পারবেন. কেও কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন, কেও বা প্রবন্ধ, কেও বা গল্প, পাঠের শেষে, সকলেই মন্তব্য রাখছেন. রবীন্দ্রনাথ বাবু তার নিবন্ধ টি পাঠ করলেন আর ভূয়সী প্রশংসা পেলেন সকল এর থেকে, একজন তো জানালেন সভা শেষে তিনি যেন তার সাথে কথা বলেন, তিনি তার প্রত্রিকাতে এমনই কিছু সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখা বের করবেন।

সবই ঠিক চলছিল কিন্তু হঠাৎ সেই তরুণ কবিটি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর কবিতা পড়ে শোনাতে লাগলেন, অবাক হলেন রবীন্দ্রনাথ, এত পুরো টুকে দিয়েছে, তার পাঠ  শেষ হলে সকলে মন্তব্য করলো প্রশংসাও করলো , আরো অবাক হলেন এরপরের জন এর লেখাটা শুনে "হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে" এইটুকু বলতেই রবীন্দ্রনাথ আর থাকতে না পেরে বললেন, থামুন মশাই, এ কেমন সভা, বিখ্যাত লেখকদের লেখা নিজের নাম দিয়ে পাঠ করছেন, আর আপনারা কেমন সাহিত্যিক মশাই, কেও কোনো প্রতিবাদ জানাচ্ছেনতো নাই, উল্টে আবার প্রশংসা।

সভার সকলে সবাই` চুপ,

রবীন্দ্রনাথ বলে চললেন আর পরিতোষ বাবু, আপনি আমাকে বললেন এটা নাকি স্বরচিত লেখা পাঠ এর আসর এ তো পুরোটাই টোকা, আমার এখন খেয়াল হচ্ছে, ওই যে উনি যে কবিতা পড়লেন ওটা তো রবি ঠাকুর এর লেখা, ওনারটা সুকান্ত ভট্টাচার্য্য আর উনি পাঠ করছেন জীবনানন্দ এর বনলতা সেন, মশাই টোকাটুকির একটা লিমিট থাকে, হাত তুলে থামতে বললেন পরিতোষ পাঠক আর তার পাশের দেওয়ালে  ইলেকট্রিকের  সুইচ বোর্ড এর আলোটা জ্বেলে দিলেন, সাথে সাথে ভীষণ চমকে গেলেন রবীন্দ্রনাথ, এ তিনি কাদের কে দেখছেন? কারা বসে আছে সামনে?, প্রতিটা টেবিলের সামনে চেয়ার আলো করে বসে আছেন তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যী, তরুণ বয়েসের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ আরো কত কত নামি মানুষ, মাথাটা বন বন করছে, এ তিনি কোথায় এসেছেন, ছুটে বেরিয়ে আসতে গেলেন ঘর থেকে, বাইরের দরজা ঠেলে খোলার চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না, কিছুতেই সামনে পিছনে টেনে ঠেলে খোলা যাচ্ছে না, তবে কি দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে রাখা !

“আমি চলে যেতে চাই, খুলে দিন দরজাটা”, চিৎকার করে বললেন রবিবাবু,

আমাদের সভায় যিনি একবার আসেন, আর কোনোদিন চলে যেতে পারেনা রবিবাবু, বলেন পরিতোষ পাঠক, আপনি হয়ে গেলেন আজীবনের সদস্য।

না না আমার বই আপনাকে ছাপাতে হবে না শুধু আমাকে যেতে দিন।

শান্ত গলাতে পরিতোষবাবু উত্তর দিলেন কাদের কাছে ফিরতে চাইছেন আপনি? যারা আপনার কাজের মর্যাদা কোনোদিনও দেয়নি? দিনের পর দিন রাত জেগে, কত ভেবে, কত অভিজ্ঞতা দিয়ে লিখেছেন আপনি, কোনো মর্যাদা তো দেয়নি আপনাকে, পরিবর্তে কতকগুলো অপদার্থ মানুষ, নিজেদের নিম্ন রুচির পরিচয় দিয়ে অপমান করে বের করে দিয়েছে । তাহলে কিসের জন্যই বা ফিরতে চান, আসুন না, আমাদের সাথে সাহিত্য করবেন, যেখানে একজন গুণীকে তার কাজের জন্য তার সৃষ্টিশীলতার যোগ্য সম্মান দেওয়া হবে। একবার তাকিয়ে দেখুন, আপনি বসে আছেন আপনারই চেয়ারে। রবিবাবু ঘাড়টা ঘুরিয়ে নিজের চেয়ারের দিকে তাকালেন, আর অবাক হয়ে দেখলেন, তিনি বসে আছেন, শুধু ঘাড়টা ইষৎ বাম দিকে হেলানো।

ঘরের অন্য সদস্যরা যেন বলে উঠলো, সুস্বাগতম।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান