সীমাহীন এক স্বাধীনতার দেশে বসবাস

Fri, Nov 27, 2020 4:24 PM

সীমাহীন এক স্বাধীনতার দেশে বসবাস

আর আই সরকার : সময়টা ২০১৮ বা ২০১৯ ইং সময়ে হতে পারে। একদিন, পল্টন থানার ওসি সাহেব আমাকে ফোন দিয়ে বলেন আপনি একটু থানায় আসেন। কখন? এখনি আসেন। পুলিশের ফোন পেয়ে থানায় যাওয়ার দুটি ব্যাখ্যা ছিল আমার কাছে। প্রথমত আলাপ আলোচনা আর ভালো আপ্যায়ন করা, দ্বিতীয়টি ছিল ডেকে নিয়ে গ্রেফতার করা। নানা শঙ্কা নিয়ে ওসি সাহেবের কাছে গিয়েছিলাম। আমার শঙ্কা দূর করে দিয়ে অত্যান্ত আন্তরিকতার সাথে ওসি সাহেব বললেন কি খাবেন, ‘চা’ না কফি? ‘চা’ কফির মাঝেই বললেন, সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ফুটপাত থেকে কিছু হকার গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে একজন আপনার পরিচিত বলে অনেক অনুরোধ করছে, আপনি কি তাকে চিনেন বা জানেন। আমি ছেলেটাকে চিনতে পারলাম না কিন্ত সে আমাকে চিনে জানে বলাতে আমিও ওসি সাহেব জানালাম হুম আমার পরিচিত, একটু সুপারিশও করেছি যেন মুছলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয়। জেনে শুনে অন্যায় আমিও করলাম। অথচ ফুটপাত দখল মুক্ত করতে আমি বা আমরা কলম ধরেছি, লেখালেখি করেছি। পৃথিবীতে এমন কোনো সিটি নেই, যেখানে ফুটপাতে হকার নেই। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে খেয়ালখুশিমতো নয়। এখানে হকাদের রয়েছে বড় ভাই ও সীমাহীন এক স্বাধীনতা, নেই কোন সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি। অথচ উন্নত দেশে সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি সাপেক্ষে ফুটপাতের পাশে  বেচা-কেনা হয়। মানুষ হাঁটতে চলতে কোন সমস্যা হয়না।

আমাদের দেশের হকারদের মধ্যে অনেকেই আছেন গ্রামের ভূমিহীন কৃষক, নিঃস্ব মানুষ, অল্পশিক্ষিত যারা কিছু মূলধন নিয়ে ফুটপাতে ব্যবসায় নেমেছেন। তাদের উচ্ছেদ করা মানেই হল সংবিধানবিরোধী কাজ করা। তাদের পুনর্বাসন নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করা উচিত। পিটিয়ে হকারদের উচ্ছেদ করা যেমন অসাংবিধানিক তেমনি অমানবিকও। পুনর্বাসন নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের অনেক মিটিং, অনেক পরিকল্পনা করা হয়েছে কিন্ত বাস্তবায়ন হচ্ছেনা। এটা রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া ফুটপাতে যারা ক্রয় করছেন তাঁদের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ, সাধারণ পথচারী। সূতরাং তাদের কথাও চিন্তা করা উচিত। তাছাড়া ফুটপাত থেকে শতশত কোটি টাকা স্বাধীনভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেনীর মানুষ যারা রাজনীতি, সরকার ও জনপ্রতিনিধির একটা অংশ।

 আমার লেখার উদ্দেশ্য ফুটপাত নিয়ে নয়। মানুষ নিয়ে। মানুষের অধিক স্বাধীনতা নিয়ে। এই দেশ সীমাহীন এক স্বাধীনতার দেশ। যেখানে যাহা খুশি বলা বা লেখা যায়, ইচ্ছেমত বিকৃত ও বিদ্বেষমূলক বাক্য তুলে ধরা যায়। যখন ইচ্ছা রাস্থায় নেমে গাড়ি বন্ধ করে দেওয়ারমত স্বাধীনতার সুযোগ রয়েছে। ইচ্ছো হলেই সাধারন জনগনকে ভুক্তভুগি করা যায়। একটি বিশেষ মহল রয়েছে যারা সবসময় বিশেষভাবে প্ররোচিত হয়ে নানা বিদ্বেষমূলক বাক্য ব্যবহার করেন। অনেক বক্তা তাদের বক্তিতায় বলেন ১৯৭১ সালে ভাষার জন্য যুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহিদ হয়েছে!  তারাই আবার মূর্তি  থিউরি নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য নেমেছে। তারা সৌদি আরব, ইরাক, মধ্যপ্রাচ্য গিয়ে যেটাকে ভাস্কর্য বলে সালাম করে এই দেশে এসে দেশের সীমাহীন স্বাধীনতা নিয়ে সেটাকে মূর্তি  বলে বিভেদ সৃষ্টি করে আলোচনায় আসতে চান, এটাই রাজনীতি। আসলে সবকিছুর প্রভু হয়েছে এখন রাজনীতি। রাজনীতিকে ব্যবহার করে লাইসেন্স ছাড়াই চলছে ২ হাজার ৯১৬টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকদের প্রায় সবাই রাজনীতির প্রভু। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে অনেকে ওএসডি থেকে শুরু করে অনেক কিছুই হতে পারেন। এটা সরকারের দোষ না! এটা সীমাহীন স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

সীমাহীন স্বাধীনতায় এক মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৮ শতাংশের বেশি। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যদন্ড করা হলেও ধর্ষণের ঘটনা কমেনি। ধর্ষণের কারন হতে পারে মাদকের অঘোষিত স্বাধীনতা আর রাজনৈতিক আশ্রয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আমাদেরকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। আমাদের সীমাহীন স্বাধীনতায় কিছুটা লাগাম টেনে আইনের আওয়তায় এনে তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। কারন এই স্বাধীনতায় দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং কালচার। কিশোররা পরিবারিক স্বাধিনতা থেকে শুরু করে বড় ভাইয়ের হাত ধরে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পেয়ে কিশোর হয়ে উঠছে নতুন আতঙ্ক, যারা ধর্ষণ ছুরি ছিনতাই থেকে খুনসহ করছে নানা অপরাধ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে উঠতি বয়সের ছেলেরা একত্রিত হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে নানা ধরনের অসামাজিক তৎপরতা। বিভিন্ন নামে এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে তুলেছে কিশোর গ্যাং। পাড়া-মহল্লায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত হয় ভয়ংকর সব কিশোর গ্যাং। যে বয়সে বই নিয়ে কিশোরদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে ছুরি-চাকু হাতে কিশোররা অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঘটিয়ে তৈরি করছে এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন  গ্রুপ যারা কিশোর গ্যাং নামেই পরিচিত। কিশোর অপরাধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গোটা সমাজে। শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজেও করতেছে  কিশোরা। সাম্প্রতিক  সময়ে  দেখা যায় রাজধানীতে ৬২টি কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে ৪২টি সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা থাকে ১০ থেকে ১৫ এবং এদের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। কিশোর গ্যাং কালচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত। এজন্য অধিকারবঞ্চিত কিশোরদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে সহায়তা প্রদান করা। সর্বস্তরের শিশুর জন্য সুশিক্ষার ব্যবস্থা নিতে  সরকারের টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কারন দেশের সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যরা ছিন্নমূল পরিবারের কিশোরদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তাদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অপরাধ জগতের বাসিন্দা করে নেয়। তাই ছিন্নমূল কিশোরদের পুনর্বাসন করা এবং কিশোর আইন সংশোধন করে আইনের সঠিক ব্যবহার প্রয়োগ করা।

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা যেন কঠিন না হয়ে উঠে। সেজন্য দেশের প্রতিটি অংশই যেন জবাবদিহিতার স্থানে আসে। দেশে যেন গোল্ডেন মনির, সাহেদ, সাবরিনা, পাপিয়া সাম্রাজ্য কালচার স্থায়ী না হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য মতে কানাডার বেগম পাড়ায় যেন আমলা বা ম্যাডাম পাড়ায় পরিনত না হয়। স্বাধীনতা যেন আমাদেরকে বিকৃতি মস্তিষ্কের মানুষে  পরিনত না করে ন্যায় ও সুচিন্তার স্বাধীন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে, সেই লক্ষে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে কিছু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হওয়া উচিত।

লেখক : আর আই সরকার, এমফিল গবেষক


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান