সৌদি আরবের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ কেন নেবে?

Fri, Sep 25, 2020 5:58 PM

সৌদি আরবের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ কেন নেবে?

রাহমান নাসির উদ্দিন : 'সৌদি আরব আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চাপাচাপি করছে' মর্মে একটি খবর সম্প্রতি দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও মিডিয়াতে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তার ভাষ্যমতে, সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক চ্যানেলে কিছু না জানালেও কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা খানিকটা হুমকির সুরে বলেছেন, 'বাংলাদেশ যদি আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত না নেয়, তাহলে বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেবে এবং সৌদি আরবে বসবাসরত প্রায় ২২ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে পাঠিয়ে দেবে।' এই যখন অবস্থা তখন প্রশ্ন- সৌদি আরব কেন বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য? রোহিঙ্গারা যেহেতু বাংলাদেশের নাগরিক নয় এবং বাংলাদেশের মানুষ নয়, তখন বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের কেন ফেরত নেবে? বাংলাদেশ মানবতার খাতিরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে কী এমন অপরাধ করেছে যে, পৃথিবীর সব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে হবে? মালয়েশিয়া তাদের দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায়। ভারত তাদের ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায়। থাইল্যান্ড যখন তাদের রাষ্ট্রীয় সীমানায় রোহিঙ্গাদের ভিড়তে দেয় না, তখন সাগরে তিন মাস ভেসে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ফিরে আসে। পৃথিবীর সব রোহিঙ্গাকে কেন বাংলাদেশকেই গ্রহণ করতে হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। সৌদি আরবের এই অবৈধ চাপাচাপি এবং 'মামার বাড়ির আবদার' দিয়ে অন্য ভাগ্নেদের আবদারও উপলব্ধি করা যায়।

১৯৭৭ সালে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজ রোহিঙ্গাদের দুর্দশা এবং অমানবিক পরিস্থিতি দেখে ৫৪ হাজার রোহিঙ্গাকে সৌদি আরবে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন। তখন সেটাকে মুসলিম উম্মার প্রতি কর্তব্য হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এ ৫৪ লাখ রোহিঙ্গাকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সৌদি আরবে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৫৪ হাজার রোহিঙ্গা বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে আজকে প্রায় আড়াই লাখ। সৌদি আরব এ ৫৪ হাজার রোহিঙ্গাকেই মূলত বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রদানের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। আর ৫৪ হাজার রোহিঙ্গা যখন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে যাবে (যদি দেওয়া হয়!), তখন আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ফিরে আসার বৈধতা পেয়ে যায়। এখানে ঘাপলা আরও আছে। এ আড়াই লাখ পাসপোর্টবিহীন রোহিঙ্গার বাইরে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গা আছে ৪২ হাজার, যাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি সরকার বাংলাদেশ সরকারের ওপর প্রবল চাপ প্রয়োগ করে। ২০১৯ সালের শেষের দিকে সৌদি সরকার বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে এ ৪২ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানায়। ধরে নেওয়া হয়, এ ৪২ হাজার রোহিঙ্গা নানান অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশের পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমায়। সূত্র অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে তারা সৌদি আরবে পাড়ি জমায়। তবে, ২০০৭ থেকে ২০১০ সালেও বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য সৌদি সরকার বাংলাদেশকে অনুরোধ করে। এরই মধ্যে সৌদি সরকার প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাকে আকামা বা বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি বা সম্মতিপত্র দিয়েছে। তাহলে সংখ্যার হিসাবে বরাবর মিলে যায়। অর্থাৎ পাসপোর্টবিহীন রোহিঙ্গার সংখ্যা আড়াই লাখ এবং বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। সব মিলিয়ে সৌদিতে বসবাসকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। ২০০৭ সাল থেকে সৌদি সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে মিনমিন শুরু করে, যা ২০২০ সালে হুমকির সুরের রূপ ধারণ করেছে। কেননা, এবার ৫৪ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার জন্য চাপাচাপি করা, সঙ্গে আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করা এবং ফেরত না নিলে নানা রকম হুমকি দেওয়া অভূতপূর্ব; যা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবিরোধী।

 

 

কেন এসব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ ফেরত নেবে- এর সপক্ষে সৌদি সরকার কোনো বৈধ কাগজপত্র কখনও দেখাতে পারেনি। কেবল একটাই যুক্তি- যেহেতু এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব গেছে, সেহেতু বাংলাদেশকেই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে। এটি আরেকটি অন্যায় আবদার। কেননা, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর সেই ১৯৬২ সালের পর থেকে যে নির্মম নির্যাতন, নিষ্ঠুর অত্যাচার এবং অমানবিক আচরণ করছে, তার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশকে নিতে হবে কেন? রোহিঙ্গারা জানের মায়া এবং প্রাণের ভয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আর বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়- এটা কি বাংলাদেশের অপরাধ? গোটা দুনিয়া জানে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বাসিন্দা। হাজার বছরের আরাকানের ইতিহাসে রোহিঙ্গারা আরাকানি মুসলমান হিসেবে সেখানকার আদি বাসিন্দা। আরাকানের হাজার বছরের ইতিহাসে বার্মা ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত বার্মিজরা আরাকান দখল করে শাসন করেছে মাত্র ৬৪ বছর। ১৪০৬ থেকে ১৪৩০ পর্যন্ত ২৪ বছর এবং ১৮৮৪ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ৪০ বছর। সুতরাং ইতিহাসের সাক্ষ্য হচ্ছে, রোহিঙ্গারা বার্মার আরাকানের স্থায়ী বাসিন্দা। পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন করায় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত। তাই সৌদি আরব যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে চায়, তাহলে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাক; বাংলাদেশে কেন? এ ধরনের চাপাচাপি, অনুরোধ বা আবদার একেবারেই অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ এমনিতেই ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে, তাদের ভরণপোষণ, লালনপালন ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনা নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। ২০১৭ সালের পর সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং পুরোনো রোহিঙ্গাসহ সর্বমোট ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় বৈদেশিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিগত তিন বছরে খরচ করতে হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। নিজেদের অর্থায়নে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে বাংলাদেশ সরকারকে খরচ করতে হয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপজেলা উখিয়া- টেকনাফের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প প্রায় ধ্বংসের মুখে। এ রকম একটি অবস্থায় সৌদি আরবের এ প্রেশার বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। সবচেয়ে বড় কথা, সৌদি আরব একটি ধনী রাষ্ট্র এবং ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অত্যন্ত প্রভাবশালী দেশ। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার যে নজিরবিহীন নির্যাতন, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং জেনোসাইড সংঘটিত করেছে, তার প্রতিবাদে সৌদি আরব সক্রিয়, কার্যকর ও উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা পালন করেনি। মুসলিম উম্মার তীর্থভূমি বলা হয় সৌদি আরবকে। কিন্তু সৌদি আরব রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশা দূরীকরণে কোনো ভূমিকাই পালন করেনি। উপরন্তু যেসব রোহিঙ্গাকে মানবিক বিবেচনায় নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছিল চার দশক আগে, তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার চিন্তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং অমানবিক। আর যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতেই হয়, তাহলে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাক।

পরিশেষে বলব, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বন্ধুভাবাপন্ন। সৌদির নেতৃত্বে আইএসবিরোধী জোটে বাংলাদেশের যোগদান, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানে বাংলাদেশের সমর্থন এবং দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর প্রভৃতি বন্ধুসুলভ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তা ছাড়া সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। তাই অত্যন্ত ইন্টেলিজেন্টলি কূটনৈতিক দক্ষতার সঙ্গে বিষয়টি বাংলাদেশকে 'ডিল' করতে হবে। এ কথা অনস্বীকার্য, রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ সব সময় সংবেদনশীল। কিন্তু রোহিঙ্গারা কোনোভাবেই বাংলাদেশের নাগরিক নয়, বাংলাদেশের বাসিন্দাও নয়। তাই সৌদি আরব বাংলাদেশকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে যে ফেরত নিতে বলছে, তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ অত্যন্ত শক্তভাবে এবং জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতায় সৌদি আরবের এসব আবদারের যথাযথ জবাব দেবে।

অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সমকাল


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান