প্রকল্প বাজেটে বৈদেশিক প্রশিক্ষণঃ কিছু জিজ্ঞাসা

Thu, Sep 24, 2020 12:23 PM

 প্রকল্প বাজেটে বৈদেশিক প্রশিক্ষণঃ কিছু জিজ্ঞাসা

মোঃ মাহমুদ হাসান : শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ যে কোন জাতির উন্নয়নে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ খাতের একটি, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর এই প্রাধিকার খাতে অব্যাহত বাজেট বৃদ্ধি, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অবশ্য ই আনন্দের। নান্দনিক ভবনে ডিজিটাল মাধ্যমে ডিসপ্লে বোর্ডের ব্যবহার, এ যে বড়ই উপভোগ্য শিক্ষা পদ্ধতি, তাতে অমত করার অবকাশই বা কোথায়? যে বিদ্যালয়ে আমার শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি, সেখানে মাত্র দু'জন শিক্ষক ছিলেন। একজন অবসরে গেলে, উনার শুন্যস্থান পূরণ করতে কয়েক বছর লেগে যায়।আর আজ প্রতি বছর হাজারে হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের নিয়োগ, এতো বড়ই আত্নতুষ্টির বিষয়! একই রুমে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্ররা পাঠ গ্রহণ করতাম, মাত্র উঁচু দুই ক্লাসের বড় ভাইয়েরা কাঠের বেঞ্চে বসার সুযোগ পেলেও বাকিরা বসতে হতো পাটিপাতা মাটিতেই। বাদলের দিনে পুরনো টিনের ছাউনি ভেদ করে, যখন মুষলধারে বৃষ্টি আসতো, সবাই ঘরের কোনে জড়সড় হয়ে বসে থাকার কোন বিকল্প ছিলো না। এমন স্থানে আজ দৃষ্টি নন্দন ত্রিতল অট্টালিকা, সৃষ্টির এমন আনন্দে ও কেন শান্তি খুজে পাই না? তবে এ কি " যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা " এমন পংক্তির ই সত্যতা!!

যুগের সাথে শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন, এতো সময়ের দাবী। এ দাবি পূরণে ব্যর্থ হলে, উন্নয়ন এর স্বপ্ন, মাটি থেকে আকাশ ছোঁয়ার মতো কল্পনাই থেকে যাবে, বাস্তবের দেখা মেলা ভার। তাই শিক্ষক আর শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কোন ভাবেই জনগন তথা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়। তাহলে, অতি সাম্প্রতিক কালে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের জন্য মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্তের অালোকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমাকৃত একটি প্রশিক্ষণ প্রস্তাবের বাজেট নিয়ে এতো হৈচৈ কেন? তাহলে কি কিছু ইলেকট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়ার অতি বাড়াবাড়ি একটি সুন্দর পরিকল্পনাকে ও ধুলিস্যাত করে দেবে?

প্রাথমিক শিক্ষা, জীবনের ভিত্তি। ঘরের ফাউন্ডেশন দূর্বল হলে একটু আঘাতে যেমন তা ধসে পড়তে পারে, তেমনি প্রাথমিক শিক্ষার গুনগত মান নিশ্চিত করতে না পারলে সনদধারী শিক্ষা দিয়ে শতকরা হার বাড়লে ও জাতির মেরুদণ্ড ও একদিন ভেঙে পড়তে পারে। এ নিয়ে বহু গুনীজন লিখতে লিখতে আজ ক্লান্ত। অবসন্ন বুদ্ধিজীবিরা আজ ক্ষমতাবানদের  তীব্র বাক্যবানে জর্জরিত, মসনদে বসা মহোদয়দের সামনে যেতে ও নাকি আজ অনেক প্রগতিশীল শিক্ষাবিদ সুশীলরা লজ্জাবোধ করেন, এমন অক্টোপাসে সুশীল নামক শব্দটি যেন নিষিদ্ধ কোন প্রতিশব্দ। তৃনমূল থেকে রাজধানী সবার ই আজ প্রশিক্ষন দরকার, দক্ষতা তৈরীতে এর যে কোন বিকল্প নাই। তাই তো প্রাথমিকের  সচিব মহোদয় সোজাসাপটাই বলে দিলেন, অভিজ্ঞতা নিতে বিদেশ যেতে প্রতি প্রকল্পেই বাজেট থাকে, মিড ডে মিলের মতো এমন মেগা প্রকল্পে এক হাজার লোক প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে যাবেন তাতে দোষের কি? মন্ত্রী গেলেন, অতিরিক্ত সচিব গেলেন, তিনি যেতে না পারলেও পাড়া গা থেকে সচিবালয়, সদলবলে হাজার জনের বহর যাবেন। প্রশিক্ষণলব্ধ দক্ষতা প্রয়োগে জাতি সমৃদ্ধ হবে তা নিয়ে আমাদের খুশির বদলে বেদনা কেন?

প্রাথমিকে ঝরে পড়া বন্ধে "স্কুল খাদ্য কর্মসূচি " ফলদায়ক ভূমিকা রাখছে বলেই প্রচার আছে। সকাল ৯টা থেকে চারটা, এই দীর্ঘ সময়ে মধ্যাহ্ন বিরতিতে সরকারি অর্থায়নে স্কুল কর্তৃক্ষের ব্যবস্থাপনায় কোমলমতি শিশুদের জন্য একবেলা পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার এর  আয়োজন - নিঃসন্দেহে এক মহান প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সচিব মহোদয়ের ভাষায় ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি- বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী "মিড ডে মিল " কর্মসূচী টি বাংলাদেশের জন্য মোটেও নতুন নয়, কয়েক বছর আগে চালু হওয়া ১০৪ টি উপজেলায় প্রকল্পের প্রথম ধাপের মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, যেখানে শিশুদের শুধুমাত্র শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়, অন্যদিকে ১৬টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে পুষ্টি সমৃদ্ধ রান্না করা খাবার "মিড ডে মিল" হিসেবে চালু আছে, যা সচিব মহোদয়ের ভাষায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রকল্প হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। আর এই ১৬ টি উপজেলায় চলমান পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ৪০ লাখ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত মিড ডে মিল সরবরাহের শুভ উদ্যেশ্যে ১৯২৯৬ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প, পরিকল্পনা কমিশন উপস্থাপন করা হয়েছে যার লক্ষ্য হবে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের ৬৫৬২০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের নিয়মিত যোগান।

আমাদের অর্থনীতির সক্ষমতা আছে বলেই এতো ব্যয়বহুল একটি মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা হতে পারে, এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেমন মতান্তরের অবকাশ না থাকলেও, প্রশ্ন উঠেছে এর বৈদেশিক প্রশিক্ষনের প্রয়োজনীয়তা ও বাজেট নিয়ে, এমন প্রকল্পে ২% প্রশিক্ষণ ব্যয় বরাদ্দ নিয়মিত স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্তাপিত তথ্য থেকে জানা যায়। যে প্রকল্প টি মোটেই নতুন নয়, পাইলট প্রকল্প হিসেবে যার সফলতা ইতিমধ্যেই প্রমানিত, এ ধরনের একটি প্রকল্পে বৈদেশিক প্রশিক্ষনের পরিকল্পনা সরকার তথা জনগণের অর্থ নিয়ে বিলাসী তামাশা বললে, খুবই অত্যুক্তি হবে কি? একি আবারও কোন পুকুর খনন দেখতে বিদেশ ভ্রমণের মতো পরিকল্পনা নয়তো? কি এমন অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি এই প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে, যে দক্ষতা  অর্জনের জন্য  হাজারো মানুষ কে বিদেশে যেতে হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানসহ অনেক খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উন্নয়ন সংস্থা শিশুখাদ্য ও পুষ্টি নিয়ে কাজ করে, মিড ডে মিলের গুনগত মান আর এর তৈরী প্রনালী নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত ও প্রশিক্ষণের জন্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কোন বিবেচনায় এসব অগ্রগামী নয় অথবা শিশু পুষ্টির ব্যবস্থাপনায় বিদেশী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চাদমূখী, তার কোন যৌক্তিক ব্যাখা আছে কি? যদি নাই থাকে, তবে সুদৃঢ় নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন, আদর্শ ও দক্ষতায় উত্তম, একটি সুন্দর ভবিষ্যত প্রজন্ম গঠনের জন্য বিকল্প অনুসন্ধান করে, এসব প্রকল্পের প্রশিক্ষণ বাজেটের ব্যবহার কি সর্বোত্তম পন্থা হতে পারে না?

আমাদের দেশে সরকারি /বেসরকারি পর্যায়ে নানা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান আছে, ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দক্ষতায় এসব প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট সুনামও আছে, কত দক্ষ ব্যবস্থাপক আর প্রশাসক এসব প্রতিষ্ঠান তৈরী করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়  সত্যি কি এতটা টা দৈন্য যে, ব্যবস্থাপনা শিখতে তাদের প্রবাসে যেতেই হবে? এসব হরিলুট বন্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার সতর্ক করার পরও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে এমন অযাচিত ব্যয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়েরই প্রতিচ্ছবি নয় কি?

"মিড ডে মিল প্রকল্প" উন্নয়নের পথে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে তখনি, যখন এর ব্যবস্তাপনার কারনে শিক্ষার গুনগত মান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আর এক্ষেত্রে শ্রেণীকক্ষের পাঠদান  ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্টদের এই প্রকল্পের কর্মকান্ডে সংযুক্ত না করে যুতসই ব্যবস্তাপনা গড়ে তোলা যায়। উন্নত বিশ্বে, বিদ্যালয় শিশুদের জন্য এতই আকর্ষণীয় যে, কোন কারণে কেউ যদি একদিন বিদ্যালয়ে যেতে না পারে, তবে সেই শিশুর মানসিক যন্ত্রণা পিতা-মাতার পীড়নের কারণ হয়ে উঠে। শিক্ষকরা যেন  ছাত্রদের বন্ধু, পিতা- মাতার চেয়েও আপনজন। দেশপ্রেম, সততা, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এ যেন তাদের নিয়ত অনুশীলন। শিক্ষায় মুখস্থ প্রথা, এতো স্বাপ্নিক কাব্য, অনিয়ম-অনাচার,  পরীক্ষায় নকল - শিশুমনে এ যেন এক মহাপ্রলয়, এমন ভাবনা শিক্ষালয়ে খুঁজে পাওয়া নিতান্তই দুষ্কর। বিপরীতে সৃষ্টিশীলতার আনন্দে, জীবনের শুরু থেকেই শিক্ষালয়ই যেন হয়ে উঠে মানবিকতা, সততা, মূল্যবোধ, জ্ঞান আর দক্ষতা অর্জনের এক আনন্দমেলা। আমাদের দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য এমন কাংখিত পরিবেশ ও ব্যবস্তাপনা তৈরীতে ব্যাপক পরিসরে প্রশিক্ষণের  প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনে জড়িতদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নত দেশসমূহের প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে, অর্জিত দক্ষতার ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুগোপযোগি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির বিকল্প কি আছে?

একটি উন্নত অর্থনীতির সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মানের পথে গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মেধা-মননের পাশাপাশি তারুণ্যে উদ্দীপ্ত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর ব্যবস্থাপনায় দক্ষ শিক্ষাবিদ নেতৃত্বের কোন বিকল্প নেই, সে সাথে থাকা চাই জাতীয় চেতনা ও আদর্শের অনুসারী কিছু নির্ভীক, সত্যের বলে বলীয়ান একঝাক প্রাণবন্ত তরুন পথ প্রদর্শক। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি প্রাথমিক শিক্ষা কে শীর্ষ প্রাধিকার দিয়ে, এ খাতে ববরাদ্দকৃত অর্থের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার করতে পারলেই টেকসই সামাজিক উন্নয়নের সাথে সাথে  গ্লোবাল চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়ে ২০৪১ সালের আগেই আমার প্রিয় মাতৃভূমি হবে সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ। 

লেখক: মোঃ মাহমুদ হাসান  উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক, ক্যালগেরি, আলবার্টা, কানাডা

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান