৭৫ এর ১৫ আগষ্ট খুনীরা যেভাবে বেতারকেন্দ্র দখল করেছিলো

Thu, Aug 13, 2020 10:40 PM

৭৫ এর ১৫ আগষ্ট খুনীরা যেভাবে বেতারকেন্দ্র দখল করেছিলো

প্রণব রায়:  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট রাত ১০টা থেকে পরদিন ১৫ আগষ্ট ভোর আটটা পর্যন্ত আমি শাহবাগ বেতার কেন্দ্রের ইন - চার্জ হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আমর সাথে আরও ৩ জন ছিলেন । ঐ দিন রাত আড়াই টায় এক্সটারনেল সার্ভিসের অনুষ্ঠাণ শেষ হওয়ার পর ষ্টুডিওর সমস্ত যন্ত্রপাতি বন্ধের কাজ তদারকি করে আমার কক্ষে গিয়ে স্লিপিং ড্রেস পরে শুয়ে পড়ি। রাত আনুমানিক সাড়ে চারটা থেকে পৌনে পাঁচটার মধ্যে প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়।

পাশের কক্ষে আমার সহকর্মী মোহাম্মদ আলী ঘুমিয়েছিল। গোলাগুলির বিকট আওয়াজের ভয়াবহতা ও কারন সম্পর্কে শেয়ার করার জন্য তাকে ডেকে ঘুম থেকে তুললাম । আলোচনা করে মোটামুটি দুজন একমত হলাম যে বঙ্গবন্ধুকে আগামীকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্বর্ধনা দিচ্ছে বোধকরি আইন শৃঙ্খলার যেন বিঘ্ন না ঘটে এরই অংশ হিসেবে পুলিশ বাহিনী গোলাগুলি করে মহড়া দিচ্ছে । অতঃপর আমরা যার যার কক্ষে শুয়ে পড়লাম । কিন্তু আমার ঘুম আসছিলোনা। এপাশ ওপাশ করছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে গোলাগুলির আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল।পরে আমি জানতে পেরেছি কাছের বিকট শব্দগুলো আসছিলো রমনা পার্কের পূর্ব দিকে অবস্থিত বংগবন্ধুর ভগ্নীপতি তৎকালীন কৃষিমন্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাদের বাসা থেকে এবং দূরের শব্দগুলো আসছিলো ধানমন্ডির বংগবন্ধুর এবং শেখ ফজলুল হক মনির বাসা থেকে ।

যাহোক এভাবে প্রায় ঘন্টা খানেক চলে যাওয়ার পর আনুমানিক পৌনে ছয় টায় শিফট -ইন -চার্জ এর কক্ষের দখিন পাশের জানালার দিক থেকে আর্মির বুটের শব্দ শুনতে পাই।আরো দেখতে পাই যে আর্মিরা রাইফেল উঁচিয়ে পূর্ব পাশে পুলিশ ব্যারাকের দিকে দৌঁড়ে যাচ্ছে এবং দুই জন আকাশের দিকে তাক করে ফাঁকা গুলি করতে করতে ' হ্যান্ডস আপ' বলে চিৎকার করে এগোচ্ছে। ভোর হয়ে যাওয়াতে পুলিশরা ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ ও মুখ ধুচ্ছিল।আর্মির হাক ডাকানো হ্যান্ডস আপ শব্দে পুলিশ সদস্যরা হতচকিত হয়ে আর্মির নিকট সারেন্ডার করে । জানালা দিয়ে এই দৃশ্য দেখে আমি অশনি সংকেতের আঁচ করলাম এবং আসন্ন মহাবিপদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম।তৎখ্নাৎ স্লিপিং ড্রেস খুলে সার্ট পেন্ট পড়ে পাশের কক্ষে গভীর ঘুমে নিমগ্ন মোহাম্মদ আলীকে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য তাকে সজোরে ধাক্কা দিলাম ।কিন্তু সে ঘুম থেকে উঠলোনা। তখন আমি মনোবল অটুট রেখে আমার কক্ষে পায়চারি করছি এবং অত্যাসন্ন মহাবিপদের মুখোমুখি হওয়ার  জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি।

আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে কোন একটা অঘটন ঘটে গেছে ।কিন্তু তখনও আমি কল্পনা করতে পারিনি এত বড় নৃশংস পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে ।আমি যখন আমার কক্ষে পায়চারি করছি এর তিন চার মিনিটের মধ্যে চার পাঁচ জন খাকি ড্রেস পরা আর্মি অফিসার কয়েকজন জওয়ান সহ এফ. এম. ট্রেন্সমিটারের কক্ষের দরজা সজোরে ধাক্কা দিয়ে পিস্তল উচিয়ে শিফট - ইন- চার্জ এর কক্ষের দিকে এগোতে থাকে এবং মেজর ডালিম উচ্চ স্বরে চিৎকার করে বলতে থাকে , 'শিফট - ইন - চার্জ কে? শিফট - ইন - চার্জ কে? ' আমি তখন মনোবল দৃঢ় রেখে আমার কক্ষ থেকে এফ. এম. ট্রেন্সমিটারের কক্ষের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাই।দেখতে পাই মেজর ডালিম সহ কয়েকজন এর পোশাকে রক্তের বিন্দু বিন্দু দাগ।অনেক বছর আগে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আমি ও মেজর ডালিম সমসাময়িক ছাত্র ছিলাম বিধায় তাকে আমি চিনতে পারি। সে তখন ভিক্টোরিয়া কলেজে এন. এস. এফ (আয়ূব মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন) এর ক্যাডার ও পান্ডা ছিল ! আমার সামনে তখন সাক্ষাৎ যমদূতেরা আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে দাঁড়ানো!

 ঘটনার নৃশংসতা ও পৈশাচিকতা বুঝতে আমার আর বাকি রইলনা! আমার বিন্দু মাত্র ভুল সিদ্ধান্ত জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিতে একটি বুলেটই যথেষ্ট ! মেজর ডালিমের, 'শিফট - ইন - চার্জ কে? ' এর উওরে আমি নিজেকে শিফট - ইন - চার্জ বলে পরিচয় দিলাম । তখন সে রিভলভার উঁচানো অবস্থায় রিভলভার বুকে ধরে বলে , 'Sheikh Mujib & all his gang has been killed . Army has taken power.' আমি এখন বেতারে ঘোষণা দেব; আপনি সমস্ত যন্ত্রপাতি অন করে দেন।আমি হাঁ সূচক জবাব দিলে তারা সকলে আমাকে শিফট - ইন - চার্জ এর কক্ষে নিয়ে যায় এবং নানা অংগভংগি করে ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে ।এদের একজন মেজর শাহরিয়ার আমার শিফটের অন্যান্য ষ্টাফ কোথায় জানতে চায়।আমি তখন তাকে সহ অন্যান্য অফিসারদের ঘুমন্ত মোহাম্মদ আলীর কক্ষে নিয়ে যাই এবং মোঃ আলী কে সজোড়ে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগাতে চাই । ঘুমন্ত মোঃ আলী ঘুম থেকে না উঠে আমাকে বলে, "সার আমি কিছুক্ষণ পরে উঠছি।" সাথে সাথে একজন জুনিয়র অফিসার তার পিস্তলের বাট দিয়ে মোঃ আলীর কোমড়ের নীচে সজোড়ে আঘাত করে । সে তখন প্রচন্ড চিৎকার দিয়ে টেবিলে বসে পড়ে । অসহায় আমি অবস্থার ভয়াবহতা বুঝানোর জন্য তার হাত সজোড়ে চেপে ধরি।অতঃপর আমাদেরকে মাষ্টার কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। সেখানে গিয়ে দেখি আমার আরো দুইজন সহকর্মী ভয়ার্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।মাষ্টার কন্ট্রোল রুমে আসার পর মেজর ডালিম পুনঃরায় আমাকে ষ্টুডিওর যন্ত্রপাতি অন করে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে তাদের সাথে থাকা একটি রেডিও রিসিভার দেখিয়ে বলে , " আমি এখন ঘোষণা দেব;যদি এই ঘোষণা রেডিওতে শোনা না যায় তবে তোমাদেরকে শেষ করে দেব!"

অসমাপ্ত।

লেখক: ১৯৭৫ সালে  বাংলাদেশ বেতারের শিফট ইন চার্জ হিসেবে শাহবাগ কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান