ইসলামোফোবিয়া নিয়ে আলোচনা!

Sun, May 17, 2020 6:17 PM

ইসলামোফোবিয়া নিয়ে আলোচনা!

স্নেহাশীষ রয়: দুই হাজার পনের সালের ঘটনা। সিরিয়ার তিন মিলিয়ন রিফুজি, ইউরোপে ঢুকছে। গ্রীসের লিসবস দ্বীপপুঞ্জের মানুষেরা জল থেকে তুলে প্রাণ রক্ষা করছে মুসলিমদের । লিসবস বাসীদের এজন্য নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য নমিনেট করা হয়েছিল । ইয়োরোপ যখন স্বাদরে রিফুজি গ্রহণ করেছে, পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন নির্বিকার। যে ইসলাম,মুসলিমকে অন্য মুসলিমের ভাই বলে উল্লেখ করেছে, তাঁরা নিরব।

 

অন্যদিকে , সহস্র বছরের বৈরিতা ভুলে, নাসারারা মুসলিম রিফুজিদের বুকে তুলে নিয়েছে। খাদ্য , বাসস্থান, চিকিৎসা কোন কিছুরই অভাব রাখে নি।

ইয়োরোপ যখন বিশ্ব মানব হয়ে উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্য তখন সেই আদিম যুগের গোত্রভূক্ত মানুষ।

আচ্ছা কোন কারণে, ইয়োরোপ যদি পরিত্যাক্ত হতো, তবে ক'জন নাসারার জায়গা হতো মধ্যপ্রাচ্যে? যে মধ্যপ্রাচ্য মুসলিম ভাতৃত্বের ন্যুনতম সম্মান দেখায় নি, সেই মধ্যপ্রাচ্যের কাছে, কতটুকু বৈশ্বিক মানবতা আশা করা যায়?

 

পাঁচ বছর পর, এবছর মার্চ মাসের ঘটনা, তুর্কী সীমান্ত দিয়ে গ্রীসে ঢুকছে রিফুজি। জনগণ লাঠিসোঁটা নিয়ে রিফুজিদের তাড়াচ্ছে। ইয়োরোপ আর রিফুজি নিতে চায় না। ইয়োরোপ আর মহান হতে চায় না। খুব সম্ভবত: ইয়োরোপের বিশ্বমানবতার প্রতি মোহভঙ্গ ঘটেছে। মোটামুটি এটা পরিষ্কার যে, ইয়োরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যের রিফুজি চায় না তাঁদের দেশে।

 

বিষয়টি মানবতার জন্য দু:সংবাদ। পৃথিবীর মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশী বিভক্ত। বিভক্তি শুধু ইয়োরোপে নয়, পৃথিবীর সর্বত্র। কেন?

 

প্রধান কারণটি হলো, ইসলামোফোবিয়া। ইসলামের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে, পৃথিবীর মানুষ এখন বিভক্ত।

 

এবং এই অবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার হলো, মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা।

 

তাই ইসলামোফোবিয়া নিয়ে আলাপ করাটা সম্ভবত: পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা।

 

আমি মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সাথে আলাপ করে দেখেছি, প্রায় প্রত্যেকেই বিশ্বাস করে, এটি ইহুদী-মার্কিন ষড়যন্ত্র। আপনি যদি বলেন, ইসলামোফোবিয়া সৃষ্টি হবার অন্য কারণও থাকতে পারে, তবে আপনাকে মুসলিম বিদ্বেষী বলে ট্যাগ দেবে। কখনো মনে মনে , কখনো প্রকাশ্যে গালি দেবে। ব্যাপারটি এমন যে ইসলামোফিবিয়া নিয়ে মুসলিমরা যা ভাবছে, তার বাইরে কথা বলা যাবে না। আলোচনার কোন সুযোগ নেই।

 

গতবছর ইমরান খান জাতিসংঘে ইসলামোফোবিয়া নিয়ে কথা বলেছে। ইমরান খানের এই ভাষণটি, বাংলাদেশেও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ইমরান ইসলামোফোবিয়া সৃষ্টির কারণ সমূহ তাঁর মতো করে ব্যাখ্যা করেছে। তিনি বলেছেন, ইসলামোফোবিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, আশির দশকের শেষের দিকে, যখন সালমান রুশদি ' দ্যা স্যাটানেক ভার্সেস ' লিখেন। মহানবীকে কটাক্ষ করায়, পৃথিবীর সকল মুসলিম , বিভৎসভাবে ক্ষিপ্ত হয়। যার ফলে, ইসলামের একটা ভায়োলেন্ট ইমেজ তৈরী হয় পাশ্চাত্যে। ইমরান খান, পুরো ব্যাপারটির জন্য সালমান রুশদিদের দায়ী করেন।

 

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঘটনাটির দু'টি অংশ। এক, সালমান রুশদি, মহানবীকে নিয়ে বই লিখেছেন। বর্তমান পৃথিবীর সাতশ' কোটি মানুষের একজন একটা বই লিখেছেন। টরোন্টোর লাইব্রেরীতে, আমি দেখেছি, স্যাটানিক ভার্সেস নির্বিঘ্নে পড়ে আছে। শুধু মাত্র আরেকটি বই, কারো এই বই নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু আপনি যদি , এই বইটিকে কেন্দ্র করে, কারো মাথার দাম ঘোষণা করেন, বইটির অনুবাদের জন্য জাপানে গিয়ে খুন করে আসেন, আপনি যদি বাংলাদেশ-পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি করেন, তব সেই প্রতিক্রিয়াটি আসলে কতটা প্রকৃতস্থ। সালমান রুশদি বই লিখে যতটা ইসলামকে অবমাননা করেছে, তার চেয়ে নিযুত গুণ বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, ইসলামী বিশ্বের তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ইমরান খান একটি শব্দও ব্যয় করে নি, সেই অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতিকে অসঠিক বলতে।

 

ইমরান খানের নিজ দেশে, সংখ্যা লঘু ২৩ ভাগ থেকে কমে এক শতাংশে নেমে এসেছে। পাকিস্তানে ব্লাসফেমীর জন্য ফাঁসির বিধান আছে। ইমরান খানের একবারের জন্য মনে হয় নি, যে আইনব্যবস্থায় চুরির জন্য হাত কেটে রাখার বিধান আছে, যে আইনব্যবস্থায় সমকামীতার জন্য পাথর ছুঁড়ে হত্যার বিধান বলবৎ আছে, সেই সংস্কৃতিকে আসলেই পাশ্চাত্য বিশ্ব ভয় পেতে পারে?

 

আমি বলছি না যে, সাম্রাজ্যবাদ ইসলামোফোবিয়ার কারণ নয়। আমি বলছি, এ নিয়ে খোলা মেলা আলোচনা প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন রয়েছে, আত্মজিজ্ঞাসার। কেন মধ্যপ্রাচ্য গত পনেরশ' বছর ধরে, নিজস্ব ডগম্যাটিক বিশ্বাস নিয়ে পরষ্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। যুক্তরাষ্ট্র তো সেদিন মধ্যপ্রাচ্যে এলো, তার আগে কেন মধ্যপ্রাচ্যে রক্তপাত বন্ধ হয় নি? অথবা কেনই শুধুমাত্র ইসলামোফোবিয়ার সৃষ্টি হয়ছে? অন্য ধর্ম নিয়ে কোন ফোবিয়ার অস্তিত্ব নেই? কেন, পাশ্চাত্যে মুসলিম অধিবাসীরা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একধরণের সাংস্কৃতিক কোকোন তৈরী করে বসবাস করার প্রয়োজন বোধ করে, কেনই বা সাংস্কৃতিক ভাবে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায়? এই সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ ইসলামোফোবিয়ার একটি কারণ হতে পারে কিনা, সেটি গবেষণা করে দেখতে হবে। ইসলামী বিশ্বের কোন দেশে, আলোচনার করতে গেলেই, জেলে পুরে দেয়া হয়। কেন লেখনীর জন্য একাডেমিকসদের পালিয়ে বেড়াতে হবে? এই অসহিষ্ণুতাই কি ইসলামফোবিয়ার কারণ কিনা, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

 

সবকিছুর জন্য তেল , ইহুদী-খ্রীষ্টান আর সাম্রাজ্যবাদ দায়ী। এটি আসলে একধরণের প্যারোকিয়াল, কনভেনিয়েন্ট চিন্তা। এই করে, ইসলামোফোবিয়ার মতো জটিল সমস্যার সমাধান হবে না। আমার বন্ধুরা আসলে যেভাবে ভাবে, আমার মনে হয় না, ইসলামোফোবিয়ার সমস্যাটি আদও কমার সম্ভাবনা আছে।

 

কোন ঘৃণা নয়, ব্যক্তিগত ভাল লাগা নয়, নিজস্ব জাতীয়তাবাদ নয়, ইথনোসেন্ট্রিক ভাবনা নয়, ইসলামোফোবিয়াকে দূর করতে হলে, অবজেক্টিভলি ভাবতে হবে, আলোচনার পথটি খোলা রাখতে হবে। কিন্তু আসলেই কি আলোচনার পথটি খোলা আছে?


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান