কে কতটা দায়ী

Wed, Apr 29, 2020 5:51 PM

কে কতটা দায়ী

চৌধুরী জহুরুল ইসলাম: কেউ কেউ বলছেন- করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি ও বিস্তারের কারনে চায়নাকে এক হাত দেখাক যুক্তরাষ্ট্র। কারণ এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক দিন আগে জার্মানির পক্ষ থেকে চায়নার কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৬৫ বিলিয়ন ডলার দাবি করার পর ট্রাম্প বলছেন- তিনিও এমন ক্ষতিপূরণ দাবির কথা ভাবছেন। গতকাল মঙ্গলবার তিনি এমনটা বলেছেন।

গত ২৪শে এপ্রিল পলিটিকো ম্যাগাজিন আসন্ন নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে রিপাবলিকান দলের ৫৭ পৃষ্ঠা কৌশলের কিছু অংশ প্রকাশ করেছে। যার সঙ্গে প্রেসিডন্ট ট্রাম্পের দাবি মিলে যায়। তারউপর যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ‘ফেউ কান্ট্রি’ আছে। এরা যেমন- যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া। ইরাক আক্রমনের সময়ও এই ফেউ কান্ট্রিগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যায়ভাবে প্ররোচিত করেছিল। এরাও চায়নাকে অভিযুক্ত করার মালমশল্লা তৈরি করছে।

পলিটিকো’র মতে রিপাবলিকানরা চায়নাকে অভিযুক্ত করার তিনটি কৌশল ঠিক করেছে। এগুলো যেমন- এক. ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের চীনা সরকারের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে হবে। বলতে হবে ডেমোক্রেটরা চীনের প্রতি দূর্বল। এবং চীনকে বর্ণবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হবে। দুই. চায়না ইচ্ছাকৃতভাবে প্রথম দিকে মহামারির খবরটি লুকিয়েছে। এমন অভিযোগ তোলা হবে। তিন. এই মহামারী ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে চীনকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা।

 

প্রেসিডন্ট ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন- আমরা অনেকভাবেই চায়নাকে অভিযুক্ত করবো। জার্মানি যে টাকা দাবি করেছে, আমরা তার থেকে অনেক বেশি দাবি করব। চায়নার উপর আমরা খুশি না। কারণ করোনাভাইরাসকে শুরুতেই কূপোকাত করা গেলে এটি বিশ্বকে এতটা বিপদে ফেলতে পারত না। প্রেসিডেন্টের এসব কথাবার্তার জবাবে বেইজিং বলেছে- “রাজনৈতিক চালবাজী বন্ধ করো”!

 

কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে চায়নাকে দায়ী করা আদৌ উচিত কি-না, আমি বলবো অবশ্যই উচিত। তবে সেটি ভীন্ন একটি কারনে। আর কারনটা হলো- ভাইরাস গবেষণা কার্যক্রমে চায়নার বিরুদ্ধে যথাযথ নিরাপত্তা বিধি না মানার অভিযোগ। অমন অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বহু আগে উচ্চারিত হলেও চায়না সেটা অনুসরণ করেনি।

 

গত ৩০শে মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে (সারা বিশ্বে) ইয়াহু নিউজ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এর শিরোনাম ছিল- Suspected SARS virus and flu samples found in luggage: FBI report describes China's 'biosecurity risk'!

 

স্মরণ করুন- চায়না গত ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৯ প্রথম করোনা ভাইরাসের কথা (কভিড-১৯) বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশ করে। যদিও ভাইরাসটির প্রথম আক্রমন শুরু হয় নভেম্বর মাসের শুরুতেই। এর ঠিক এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট মেট্রো বিমানবন্দরে মার্কিন কাস্টমস এবং বর্ডার প্রোটেকশন এজেন্টরা একজন চীনা বায়োলজিস্টকে থামিয়েছিল। তার কাছে এন্টিবডি লেবেলযুক্ত তিনটি শিশি পাওয়া যায়।

 

ঐ জীববিজ্ঞানী এজেন্টদের বলেছিলেন যে চীনের এক সহকর্মী তাকে এই শিশিগুলো দিয়েছেন। এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি ইনস্টিটিউটের একজন গবেষকের কাছে পৌঁছে দিতে বলেছিলেন তার বন্ধু। শিশিগুলি পরীক্ষার পরে শুল্ক এজেন্টরা একটি উদ্বেগজনক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে।

 

তারা বলেন যে, শিশির মধ্যে যে অনুজীব পাওয়া গেছে, সেগুলো মার্স এবং সার্স ভাইরাসের অনুরূপ। মার্স- Middle East Respiratory Syndrome (MERS) এবং সার্স- Severe Acute Respiratory Syndrome (SARS)। এফবিআই-এর কিছু প্রকাশযোগ্য কৌশলগত গোয়েন্দা রিপোর্ট এ তথ্য ছিল।

 

এফবিআই এর ওয়েপন অব মাস ডিস্ট্রাকশন ডাইরেক্টরেটের (WMDD) অধীন কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল গোয়েন্দা ইউনিট এ রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে। কিন্তু তাতে চায়নার গবেষক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে উল্লেখিত ঘটনাসহ আরো দু’টি ঘটনাকে এফবিআই-এর ঐ মেমোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

 

তাতে বলা হয়েছিল- ভাইরাসের এমন অনিরাপদ বহনে বিদেশী গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রকে “বায়ো ঝুঁকি”র মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন! উহানে করোনা প্রাদুর্ভাবের মাত্র দুই মাস আগে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে রিপোর্টটি এফবিআই প্রকাশ করে। যে তিনজন বিদেশীর কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, তারা সবাই চীনা নাগরিক!

 

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছেন- জীবানু যে কেবল যুক্তরাষ্ট্র এসেছে, তা নয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাইরেও গেছে। কারণ জীবানু গবেষনার সর্বাধুনিক গবেষণাগারগুলো যুক্তরাষ্ট্রেই। এমন কি বিশ্বের বহু দেশে চিকিৎসার প্রয়োজনে এর গবেষণায় তহবিল যোগায় যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেছেন- জীবানু র এমন অনিরাপদ বহনের মাধ্যমে তারা হয়ত যাচাই করছে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা মজবুত!

অনিরাপদ জীবানু বহনে চায়নার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আগেও উচ্চারিত হয়েছে। ২০০৩ সালে SARS ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চায়নীজ জীবানু গবেষনাগারের গাফিলতির প্রমাণ আছে। চায়নিজ ইন্সটিউট অব ভাইরোলজি, বেইজিং-এর বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ নথিবদ্ধ আছে। অবশ্য এমন অভিযোগ অন্যান্য দেশের গবেষকদের বিরুদ্ধেও আছে।

ওবামা প্রশাসনের সময়ও চীনকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল। পারমাণবিক, রাসায়নিক ও জৈবিক প্রতিরক্ষা কর্মসূচির প্রতিরক্ষা বিভাগের তৎকালীন সহকারী সচিব অ্যান্ড্রু ওয়েবার বলেছেন- জৈব গবেষণা নিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আরও খারাপ হয়েছে।

মি ওয়েবার জানান- “২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস বেইজিং এর গবেষণাগার থেকে পালানোর ব্যাপারে চায়না কিছু লুকানোর সাহস পায়নি। কারণ তখন যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি (Centers for Disease Control and Prevention)-এর সঙ্গে তাদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র সে সময় তাদেরকে সাধ্যানুযায়ী সাহায্যও করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে সবকিছু লুকোবার যে কৌশল নিচ্ছে, তাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রটি খুবই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।”

 

নিউইয়র্ক, ২৯শে এপ্রিল ২০২০


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান