রুয়ান্ডায় তিন বছর ! যা দেখেছি, যা দেখি নাই !  

Tue, Sep 17, 2019 11:53 PM

রুয়ান্ডায় তিন বছর ! যা দেখেছি, যা দেখি নাই !  

জামিলুর রহমান চৌধুরী : পুর্ব আফ্রিকার একটি ছোট্র দেশ রুয়ান্ডা । ইকুয়েটরের সামান্য দক্ষিনে অবস্থিত । সীমান্তবর্তী দেশ হিসাবে আছে উগান্ডা, তান্জানিয়া, বুরুন্ডী এবং গনতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কংগো । দেশটির আয়তন ২৬,৩৩৮ বর্গকিলোমিটার যা মাইলের হিসাবে ১০,১৬৯ বর্গমাইল দাঁড়ায় । প্রতি বর্গকিলোমিটারে আছে ৪৪৫ জন লোকের বাস, যার কারনে রুয়ান্ডাকে আফ্রিকার ঘনবসতিপুর্ণ দেশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। বর্তমান জনসংখ্যা হবে সম্ভবত  ১৩ মিলিয়নের (১ কোটি ৩০ লক্ষ) প্রায় কাছাকাছি ।

অতীতকালে আফ্রিকা নাম শূনলেই একটা অন্যরকম ভাবনা কাজ করতো, যা এখনো আমার মতো অনেকেরই হয়ে থাকে, যেমন কেমন হবে, জংগলে ভরা, জংলী মানুষ ইত্যাদি ইত্যাদি । তবে ২০০৭ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানাতে প্রায় বছর তিনেক অবস্থানের কারনে এ ভাবনা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছিল । কারন মানুষদের মধ্যে জংলীপনার তেমন কিছূ চোখে পড়ে নাই সে সময় ।

তিন বছরের বেশী সময় ধরে একটা আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সংস্থার ’দেশ প্রধান’ নিযুক্ত হয়ে কাজ করে যাচ্ছি এই দেশে । যেহেতু কাজের ধরনের কারনেই প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত যেতে হয় তাই দেশটির অতি সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে অনেক কিছুর সম্পর্কেই বেশ ভালো ধারনা পাওয়া যায় এবং পাশাপাশি নিজের ভালোবাসার বাংলাদেশকেও এ দেশের প্রত্যন্ত অন্চলের মানুষের কাছে পরিচিতি করানো যায় অতি সহজেই ।

রুয়ান্ডা বেলজিয়ামের কাছ থেকে ১৯৬২ সালের ১লা জানুয়ারী স্বাধীনতা লাভ করে এবং তারপর থেকেই ভালোই চলছিলো কিন্তু ১৯৯৪ সালের জাতিগত দাংগায় প্রায় মিলিয়নের (দশ লক্ষের) উপরে মানুষের মৃত্য হয় । এ কঠিন অবস্থা কাঠিয়ে সারা বিশ্বের জন্য দেশটি আজ বলা যায় একটা মডেলে রুপান্তরিত হয়েছে এবং এমনকি অনেকেই দেশটিকে ”আফ্রিকার ‍সুইজারল্যান্ড” বলতেও ছাড়ছেন না ।

অর্থনীতির মুল কৃষি হলেও চা এবং কপিই একমাত্র রপ্তানীযোগ্য পন্য । তবে আজকাল পর্যটন একটা বিশেষ স্থান দখল করে আছে এবং বলতে গেলে এটা অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম হিসাবে আবির্ভুত হয়েছে ।

আমার এ সময়কালে কি দেখেছি আর কি দেখি নাই:

চলতি বছরের শূরুর দিকে বাংলাদেশ থেকে বেশ ক’জন স্বনামধন্য সাংবাদিক এদেশে বেড়াতে এসেছিলেন এবং  ফেরত যাবারকালে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে রাস্তাঘাটে কেমন ময়লা আবর্জনা দেখেছেন বা  দৈনিক কতটা গাড়ীর হরন তাঁদের কানে বেজেছে । এক কথায় তাঁদের উত্তর ছিল, কৈ দেখিনি তো বা তেমন করে শুনিনি তো ! উল্লেখ্য যে, তাঁদের মধ্যে জনাব মন্জুরুল আহসান বুলবুল, নইম নিজাম, শ্যামল দত্ত, জ, ই মামুন, মুন্নী সাহা ছিলেন ।

  • যা দেখেছি এর ফর্দ যদি এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করি তাহলে প্রথমেই তাদের ইমিগ্রেশনের প্রশংসা করতেই হবে যেখানে নিমিষেই কাজটি হয়ে যায় এবং লাগেজ এলাকায় এসেই আমার লাগেজটি দেখতে পাই। সব মিলিয়ে যেখানে ১৫ মিনিটের বেশী সময় দিতে হয় না।
  • দেশটিকে পলিথিনমুক্ত রাখতে তাদের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং এর শুরু হয় মুলত এয়ারপোর্ট থেকেই । কাউকেই কোন ধরনের পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে শহরে ঢুকতে দেয়া হয় না এবং এ থেকে দেশের ভিতরের অবস্থা মোটামুঠি অনুধাবন করা যায়।
  • কিগালী এমনকি সারা দেশের রাস্তায় কখনোই কোন আবর্জনা এমনকি একটা ছোট কাগজের টুকরোও খুব কমই পড়ে থাকতে দেখা যায়, গন্ধযুক্ত ময়লা-আবর্জনার কথা তো চিন্তাই করা যায় না।  
  • আমার তিন বৎসরের বেশী সময় এদেশে অবস্থানকালে গাড়ীর হরন কদাচিৎ শুনে থাকি এবং কাউকেই হরন মেশিনে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখিনি । মাঝে মাঝে নিজে নিজেই আক্ষেপ করে বলতে ইচ্ছে করে “ এমন এক দেশ থেকে এলাম যেখানে শত কান্নায়ও হরন যন্ত্র থেকে চালকের হাত সরানো যায় না আর এমন এক দেশে এলাম যেখানে শত অনুরোধেও চালকের হাত হরন যন্ত্রে বসানো যায় না । রাস্তায় ছাত্র-ছাত্রী হাঁটছে বা মনে হচ্ছে চালকের সামনে দিয়ে ঐ ছাত্র-ছাত্রীটি রাস্তা পার হবে, ব্যস কোন কথা নাই । আগে তাদের পার করে তারপর চালক তার রাস্তা দিয়ে আগাবে।
  • এ সময়কালে কোন অফিসেই কখনোই স্পীডমানি বলুন বা ঘুষই বলুন কোন হিসাবেই একটি কয়েনও পরিশোধ করতে হয়নি এবং কাজ চলছে কাজের গতিতেই । কোন ফাইলকেই কোথাও কখনোই স্পীডমানির জন্য আটকে থাকতে হয়নি বা চোখে দেখিনি।
  • হেলমেটবিহীন কোন মোটর সাইকেল চালক বা আরোহীকে কখনোই দেখা যাবে না এবং এ লক্ষ্যে প্রতিটি চালক একটি করে অতিরিক্ত হেলমেট নিয়েই বাড়ী থেকে বের হবেন । উল্লেখ্য যে, এদেশে মোটর সাইকেলে যাত্রী পরিবহন করা হয়ে থাকে এবং দেশটির উল্ল্যেখযোগ্য অংশ মানুষের বাহনও মোটর সাইকেলই।
  • ঝগড়াজাটি বলুন, মারামারি বলুন খুব কমই চোখে পড়েছে, এমনকি উচ্চবাচ্যও । সর্বত্রই সহনশীলতা, সৌহার্দ্যপুর্ন সম্পর্ক বিদ্যমান।
  • রাস্তা সংস্কার হয় এবং আমাদের মতো কন্ট্রাক্টর দিয়েই তা করা হয়ে থাকে তবে প্রতিটি কাজের পাশে যে তারিখে সংস্কার কাজটি হলো সে তারিখটি লিখে রাখতে হয়, যাতে পুন:সংস্কারের প্রয়োজন হলে তাদেরকে দিয়েই তাদের দায়িত্বে কোন খরচ ব্যতিরেকে আবারো কাজটি করানো যায়। সুতরাং কাজটি ভালোভাবেই হয়ে থাকে।

ভাবছেন এখানে সবাই ফেরেস্তা ! মোটেই নয় বরং এদেশেও অন্যায়-অনিয়ম হয়ে থাকে এবং যেহেতু তারাও মানুষ অসামন্জস্য এখানেও থাকবেই, তবে চোখে পড়ার মতো বিষয়গুলো তারা খুবই সযতনে সম্পাদন করে থাকে । এদেশের মানুষের কি কোন সুপার কোয়ালিটি আছে ? না, তারাও অতি সাধারন মানুষ তবে ভালো কিছু তারা ধারন করেছে যা এমনকি পার্শবর্তী অনেক দেশও ধারন করতে পারে নাই । তারা বুঝেছে যে এসব কাজ তাদেরকে করতে হবে এবং এসব বুঝার মেসেজ তারা পেয়েছে তাদের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব থেকে ।

আমরাও কি এমন মেসেজ পাই না, নাকি ধারনে অক্ষম ??

কিগালী, রুয়ান্ডা থেকে  

   


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান